উপ সম্পাদকীয়

এবারের দুর্গাপূজায় প্রত্যাশা

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২২-১০-২০২০ ইং ১২:১৬:০৮ | সংবাদটি ৮৮ বার পঠিত

এ বছর এমন এক সময়ে শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যখন সারা পৃথিবী ব্যাপী মরণব্যাধি করোনা ভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত। ইতিমধ্যেই বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবী জুড়ে মহামারী করোনা ভাইরাসে কয়েক লক্ষ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছেন। এবং লক্ষ লক্ষ মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করছেন।
তাই এবারের দুর্গাপূজায় পুণ্যার্থী মানুষের মধ্যে ভয় ভীতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আবার অনেকের মাঝে ভয়-ভীতি নিয়ে একদম উদাসীন মনোভাব। এবারে সিলেটে যে সব পূজা অনুষ্ঠিত হবে, তার মধ্যে কিছু কিছু সর্বজনীন পূজা কমিটির কাছ থেকে জানতে পেরেছি যে পূজা হবে জাঁকজমক ছাড়া, সবাইকে মাস্ক পরে আসতে হবে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। অনেকের বাসা বাড়িতে পূজা হবে শুধু নিজেদের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে। এবার অনেকেই দেবী কাঠামো মূর্তি না করে কলা বৌ সাজিয়ে পূজা করবে।
এ বছর আশ্বিনের পূজা হচ্ছে কার্তিকে। তার কারণ হল এবারের আশ্বিন মাস হলো ‘মল মাস’। মল মাস হলো অশুভ মাস, এ মাসে কোন শুভ কাজ হয় না। তাই এবার কার্তিকে পূজা হচ্ছে। পূজা শুরু হবে বাংলা ৬ কার্তিকে আর ইংরেজি ২২ অক্টোবর থেকে। এবার মা আসছেন দোলায় চড়ে। হিন্দু শাস্ত্র মতে দোলায় আগমনের মানে হলো, মহামারী, রোগ, শোক, জরা, ব্যাধি পৃথিবী ব্যাপী দেখা দিবে। এবং দেখা দিয়েছে ইতিমধ্যেই মহামারী আকারে করোনা ভাইরাস। মা-দুর্গা স্বামীর ঘরে ফিরে যাবেন গজে চড়ে। গজে চড়ে যাওয়া মানে হলো-সমস্ত অশুভ মহামারী, অসুখ, রোগ, শোক, জরা, ব্যাধি মা সঙ্গে নিয়ে যাবেন। এটা হিন্দুশাস্ত্র মতে হিন্দু ধর্মের মানুষের বিশ্বাস।
এবার আসা যাক দুর্গাপূজা নিয়ে কিছু কথায়। দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হলো বাঙালি হিন্দুর প্রধান ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, ভুটান সহ বিশ্বের একাধিক দেশে দুর্গাপূজা পালিত হয়ে থাকে। আশ্বিন মাসের দুর্গাপূজা শারদীয়া দুর্গাপূজা এবং চৈত্র মাসের দুর্গাপূজা বাসন্তী দুর্গাপূজা। শারদীয়া দুর্গাপূজার জনপ্রিয়তা বেশি। এবার দুর্গা কাঠামোয় যাদের অবস্থান সংক্ষেপে তাদের পরিচিতি এখানে তুলে ধরব।
বাসন্তী দুর্গাপূজা মূলত কয়েকটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে দুর্গাষষ্ঠী, মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, মহানবমী ও বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষটিকে বলা হয় দেবী পক্ষ। দেবীপক্ষের সূচনায় অমাবস্যার নাম মহালয়া, এই দিনে হিন্দুরা তর্পন করে পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দেবীপক্ষের শেষ দিনটি হলো ‘কোজাগরি পূর্ণিমা’। এই দিনে দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। বাংলাদেশে বিজয়া দশমী সরকারী ছুটির দিন। পারিবারিকভাবে দুর্গাপূজা ধনী পরিবারগুলিতেই আয়োজিত হয়। সিলেট শহরের পুরনো পরিবারগুলির দুর্গাপূজা বনেদি বাড়ির পূজা নামে পরিচিত। পারিবারিক পূজাগুলিতে শাস্ত্রাচার পালনের উপরেই জোর দেওয়া হয়। পূজা উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজন সমাগম হয়ে থাকে। অন্যদিকে আঞ্চলিক স্তরে এক অঞ্চলের বাসিন্দারা যৌথভাবে যে পূজার আয়োজন করে তা বারোয়ারি পূজা বা সর্বজনীন পূজা নামে পরিচিত। এখন সর্বজনীন পূজায় থিম বা নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক মন্ডপ, প্রতিমা ও আলোকসজ্জা করা হয়ে থাকে। থিমগুলির শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে ‘শারদ সম্মান’ নামে বিশেষ পুরস্কার দেওয়া হয়।
শারদীয় দুর্গাপূজাকে অকাল বোধন বলা হয়। কালিকা পুরান ও বৃহদ্ধম পুরান অনুসারে, রাম ও রাবনের সময় শরৎকালে দুর্গাপূজা করা হয়েছিল। হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই এই সময়টি তাদের পূজার যথাযথ সময় নয়। অকালের পূজা বলে এই পূজার নাম ‘অকাল বোধন’। এই দুই পুরান অনুসারে, রামকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। কৃত্তিবাস ওঝা তার রামায়নে লিখেছেন রাম স্বয়ং দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। এজন্য শরৎকালে স্মৃতিশাস্ত্রগুলিতে দুর্গা পূজার বিধান দেওয়া হয়।
আমরা অনেকেই দুর্গা নামের ব্যাখ্যা জানি, আবার অনেকেই জানিনা। তাই আজ এখানে দুর্গা নামের ব্যাখ্যা তুলে দিলাম। (দ-অক্ষর দৈত্য নাশক, উ-কার বিঘ্ননাশক, রেফ-রোগনাশক, গ-অক্ষর পাপনাশক, এবং আ-কার ভয় ও শত্রুনাশক। অর্থাৎ দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও ভয়-শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা)। অন্যদিকে শব্দকল্পক্রম অনুসারে, দুর্গা অসুরকে বধ করেন তাই তিনি নিত্যদুর্গা নামে অভিহিতা।
মহিষাসুর অসুর অর্থাৎ দেবদ্রোহী। তাই দেব প্রতিমায় দেবীর পদতলে দলিত এই অসুর ‘সু’ এবং ‘কু’-র মধ্যকার চিরকালীন দ্বন্দ্বে অশুভ শক্তির উপর শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। সাধারণ মানুষের জীবনে দুঃখ, কষ্ট, ভয়, ভীতি আপদ-বিপদ এ সকলই আসুরিক শক্তির কার্য। পরম করুণাময়ী মা নিরন্তর অসুর বিনাশ করে সন্তানদের কল্যাণ সাধন করেন।
তবে অসুর হলেও দুর্গোৎসবে মহিষাসুরের পূজার চল আছে। কালিকা পুরান অনুসারে মৃত্যুর কিছুকাল পূর্বে নিজের মৃত্যুদৃশ্য স্বপ্নে দেখে ভীত মহিষাসুর ভদ্র কালিকে তুষ্ট করেছিলেন। ভদ্রকালী তাকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি না দিলেও তার ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে বরদান করতে ইচ্ছুক হন। মহিষাসুর দেবতাদের যজ্ঞভাগ বর চাইলে দেবী সেই বর দিতে অস্বীকৃত হন কিন্তু মহিষাসুরকে এই বর দেন যে যেখানেই দেবী পূজিতা হবেন সেখানেই তার চরণতলে মহিষাসুরেরও স্থান হবে। সেই থেকে দেবীর চরণ তলে অসুরও পূজিত হচ্ছে।
দুর্গার বাহন সিংহ। শ্রীশ্রী চন্ডীতে সিংহকে ‘মহাসিংহ’ বাহন ‘কেশবী’ ধূতসট ইত্যাদি বিশ্লেষণে ভূষিত করা হয়েছে। দুর্গা পূজার সময় সিংহকেও বিশেষভাবে পূজা করা হয়। কালীবিলাস তন্ত্রে দুর্গার বাহন সিংহকে বলা হয়েছে বিষ্ণুরূপী সিংহ। কালিকাপুরান অনুসারে, দুর্গার বাহন হওয়ার জন্য শিব শবদেহ, ব্রহ্মা রক্তপদ্ম ও বিষ্ণু সিংহের মূর্তি ধারণ করেছিলেন। পুরানে বলা হয়েছে হিমালয় দুর্গাকে সিংহ দেন। পদ্মপুরানে বলা হয়েছে, দুর্গার ক্রোধ থেকে সিংহের জন্ম হয়। বিষ্ণু দুর্গার বাহন সিংহকে নির্মাণ এবং সেই সিংহ সকল দেবতার অধিষ্ঠান হয়েছিল। গণেশ কার্যসিদ্ধির দেবতা। হিন্দু পুরানের নিয়ম অনুযায়ী গণেশের পূজা আগে না করে কোন দেবতার পূজা করা শাস্ত্রে নিষিদ্ধ। গণেশের বাহন মৃষিক বা ইঁদুর। ইঁদুর মায়া বা অষ্ঠপাশ ছেদনের প্রতীক।
লক্ষ্মী-শ্রী সমৃদ্ধি, বিকাশ ও অভ্যুদ্বয়ের প্রতীক। লক্ষ্মী চরিত্র ধনের প্রতীক। লক্ষ্মীর বাহন পেচক বা প্যাঁচা। রূপে ও গুণে অতুলনীয় এই দেবীর এমন কিম্ভুত বাহন কেন, সে নিয়ে বেশ কয়েকটি মত প্রচলিত। প্রথমই স্মরণ রাখা কর্তব্য, হিন্দু শাস্ত্রে কোথাও পেচককে লক্ষ্মীর বাহনের মর্যাদা দান করা হয়নি। এই বিশ্বাস একান্তই বাঙালি লোক বিশ্বাস। প্যাঁচা দিবান্ধ। মনে করা হয়, যারা দিবান্ধ অর্থাৎ তত্ত্ব বিষয়ে অজ্ঞ তারাই পেচক ধর্মী। মানুষ যতকাল পেচকধর্মী থাকে, ততদিনই ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করে।
সরস্বতী বাণীরূপিনী বাগদেবী তিনি। জ্ঞান শক্তির প্রতীক। দেবীর হাতে পুস্তক ও বীনা। পুস্তক বেদ শব্দব্রহ্ম। বীনা সুর-ছন্দের প্রতীক নাদব্রহ্ম। শুদ্ধ সত্ত্বপ্রাণে পূর্তি, তাই সর্বশুল্কা। শ্বেত বর্ণটি প্রকাশাত্মক। সরস্বতী শুদ্ধ জ্ঞানময়ী প্রকাশস্বরূপা। জ্ঞানের সাধক হতে হলে, সাধককে হতে হবে দেহ-মন-প্রাণে শুচি-শুভ্র। সরস্বতীর বাহন হংস। হংস পবিত্রতার প্রতীক। সরস্বতী ব্রহ্মবিদ্যা। যে সাধক দিবারাত্র অজপামন্ত্রে সিদ্ধ তিনিই হংসধর্মী। মানুষ সুস্থ শরীরে দিনে-রাতে একুশ হাজার ছয়শো হংস এই অজপা মন্ত্রেরূপে শ্বাস-প্রশ্বাস নিয়ে থাকে। মানুষ যতদিন এই জপ উপলব্ধি করতে না পারে, ততদিন হংসধর্মী হতে পারেনা। আর ব্রহ্মবিদ্যারও সন্ধান পায়না। এ কারণেই দক্ষিণেশ্বরের রামকৃষ্ণ পরমহংস।
দেব সেনাপতি কার্তিক সৌন্দর্য ও শৌর্যবীর্যের প্রতীক। যুদ্ধে শৌর্য-বীর্য প্রদর্শন একান্ত প্রয়োজনীয়। তাই সাধক জীবনে এবং ব্যবহারিক জীবনে কার্তিককে প্রসন্ন করতে পারলে শৌর্য-বীর্য করতলগত হয়। কার্তিকের বাহন ময়ূর। সৌন্দর্য ও শৌর্য-কার্তিকের এই দুই বৈশিষ্ট্যই তার বাহন ময়ূরের মধ্যে বিদ্যমান।
এবারের এই দুর্যোগকালীন পূজায় মায়ের কাছে আমাদের নিবেদন, হে স্নিগ্ধরূপিনী জগদ্ধাত্রী তোমার অকাল বোধন হোক, আমাদের ঘর থেকে, এই পলিমাটির সোনার দেশ থেকে তুমি সকল জরা-জীর্ণতা, সকল ক্লীবতা-হীনতা, সকল হিংসা-বিদ্বেষ, সকল বাধা-বিঘ্ন দূর করে দাও। তোমার চিরপ্রসন্নতা ছড়িয়ে পড়ুক লোকায়ত বাংলার জনপদে-সবাই অভয় পাক। এবারের পূজা নির্বিঘ্নে কাটুক-আশংকার কালো মেঘ টুটে যাক, জগতের সবাই সুখী হোক, কল্যাণ ও মঙ্গল লাভ করুক। পরিশেষে-ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাতি নির্বিশেষে সবাইকে জানাই শারদীয়া দুর্গাপূজার প্রাণঢালা অভিনন্দন, শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা।
লেখক : প্রাবন্ধিক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শীতের শাকের পুষ্টিগুণ
  • জেনে শুনে বিষ করেছি পান
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • Developed by: Sparkle IT