উপ সম্পাদকীয়

দেশে দেশে ধর্ষণের শাস্তি

এম এ মালেক চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৪-১০-২০২০ ইং ০৪:১৫:০৭ | সংবাদটি ১০৩ বার পঠিত

সরকার শেষ পর্যন্ত জনদাবীর প্রেক্ষিতে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান সংযোজন করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০২ সংশোধন করেছে। এ আইনের ৯(১) উপধারায় ধর্ষণের অপরাধের জন্য মৃত্যুদন্ড অথবা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডের বিধান সংযোজন একটি ভালো উদ্যোগ এবং সে জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে মোবারকবাদ জানাতেই হয়। এজন্য ধর্ষণ বাড়–ক অথবা কমুক তা আপাতত: ধর্তব্য না হলেও আইনটিতো থাকলো। ধর্ষক অন্তত জানতে পারবে কোন সময়ে তার বিচার হলে এ দু’য়ের একটি সাজা তাকে ভোগ করতেই হবে। তবে বিধানে যাবজ্জীবন শব্দটি উঠিয়ে দিয়ে আমৃত্যু তথা আমরণ শব্দদ্বয়ের যে কোনটি বসালে জনগণের ধোঁয়াশা কেটে যেতো। অবশ্য এ মর্মে মাননীয় উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগের একটি রায়ের ব্যাখ্যায় যাবজ্জীবন বলতে আমৃত্যু বলা হয়েছে। মাননীয় বিচারকগণ রায়কালীন সময়ে এ বিষয়টি মাথায় রাখবেন বলে প্রত্যাশা।
চলমান করোনা মহামারীতে পৃথিবীর সব মানুষ যখন গত সাত-আট মাস থেকে আতঙ্কে আছে তখন আমাদের দেশে এক শ্রেণীর মানুষরূপী নিকৃষ্ট জানোয়ার ধর্ষণে উন্মত্ত হয়ে সরকার তথা পুরো জাতির মান-ইজ্জত খুইয়ে চলেছে, তাদের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর আইনেও নেই। জাতিসংঘ সহ দেশ-বিদেশের বাঙালি-অবাঙালি বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, নিখাদ সুশীল সমাজের প্রতিনিধি বাংলাদেশে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়াতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছেন। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে বলতে হচ্ছে এমনিতে আমাদের সম্বন্ধে পৃথিবীবাসীর বিভিন্ন কারণে নেতিবাচক ধারণা পঁচাত্তর পরবর্তী থেকে জন্মেছে তা বিগত সাতচল্লিশ বছরে তা আরও বহুগুণ প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। দুর্নীতি, খুন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় বিদেশীদের কাছে ধর্না দেওয়া ইত্যাদি নানান কারণে বিশ্বে বাংলাদেশের নাম বেশ কয়েকবার লাগাতার শীর্ষে উঠেছে। এক দু’বার হ্য্যট্রিক করেছে বিশেষ করে দুর্নীতিতে, কোন সময়ে এক ধাপ নীচে নামছে। এই যখন সূচকের অবস্থান তখন হালের ধর্ষণ এবং ধর্ষিতাকে মেরে ফেলা ইত্যাদি অপরাধ পুনরায় বাংলাদেশকে শীর্ষে নিয়ে যাবে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। অনেকে বলে থাকেন ‘ধর্ষকরা কোন দলের নয়, এরা পশুতুল্য’-এ সব মন্তব্যের সাথে এ নিবন্ধকারের শতভাগ সহমত পোষণে খুবই কষ্ট হয়। অতীতে ধর্ষণের সেঞ্চুরী হয়েছে, কেউ কেউ অর্ধশতক হাকিয়েছে, নির্বাচনে বিজয়োত্তর শত শত নারী ধর্ষিতা হয়েছে তাদের তফশিল সবারই জানা। দেশের প্রখ্যাত রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মে: জে: মোহাম্মদ আলী শিকদার (অব:) বলেছেন, মানুষের পশুবৃত্তিকে লাগামহীন করার তিন উপাদান-মাসল, খানি আর মাস্টার রাজনীতি হাতে থাকলে যা মান চায় সেটাই করা যায়, পাওয়া যায়। তার সঙ্গে আইন ও বিচার প্রক্রিয়া যদি অকার্যকর হয় তাহলে তো কথাই নেই।’ (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৯ অক্টোবর ২০২০)।
দ্বিতীয়ত: পশু সমাজ তো নিজস্ব ফিতরাতের কোন ব্যত্যয় মোটেও ঘটায় না। গৃহপালিত ও বন্য পশু সেগুলো সর্বদা মানুষের চোখের সামনে রয়েছে, যেমন-বিড়াল, ঘোড়া, গরু, ছাগল, মহিষ, কুকুর সহ চিড়িয়াখানায় বন্দী সিংহ, বাঘ, ভল্লুক, হরিণ ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের সাবালক পশুতো কোন বাচ্চা পশুকে (অপ্রাপ্ত বয়স্ক) জৈবিক নিপীড়ন করতে দেখা যায় না। তাহলে ধর্ষকরা পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট জানোয়ার। খামোখা ধর্ষকদের পশুর সমান আখ্যায়িত করে পশুদের অপমান করা সঙ্গত নয়। এরা দেশ ও মানবতার দুশমন। মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালাও ধর্ষণ, ব্যভিচারকারীদের কোন রকমের ছাড় দেননি। কোরআনিক শাস্তির কথা আমরা সবাই জানি। প্রকাশ্যে একশত বেত্রাঘাত, এক বছরের নির্বাসন (জেল), রজষ তথা পাথর নিক্ষেপে হত্যার শাস্তিদানে যেন কোন রকমের শৈথিল্য, দয়া দেখানো না হয় সে জন্য কঠোর নির্দেশ রয়েছে মহা গ্রন্থ আল-কোরআনে। কাজেই ধর্ষণের শাস্তি প্রদানের ক্ষমতাধারী যদি সুষ্ঠু বিচার না করেন ধর্ষকের বা কেহ পক্ষপাতিত্ব করে ধর্ষককে বাঁচিয়ে দেন বা তাকে বাঁচানোর পক্ষে ওকালতি করেন সে জন্য শেষ বিচারের দিনে কঠোর জবাবদিহি করতে হবে আল্লাহ জাল্লে শানুহুর দরবারে। যেহেতু তা মহান আল্লাহতায়ারার বিধানের প্রকাশ্যে বিরুদ্ধাচারণ। আর সে জন্য পেশাগত কোন পারিশ্রমিক গ্রহণ সম্পূর্ণ হারাম বলে বিজ্ঞজনদের অভিমত।
পৃথিবীর সব ধর্মেই ধর্ষণের কড়া শাস্তির কথা বলা হয়েছে। তাই বিশ্বের প্রতিটি দেশে ধর্ষণের কঠোর শাস্তির আইন রয়েছে। এমনকি পারস্পরিক সম্মতিতে ‘লিভ-টুগেদার’ রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈধ পশ্চিমা দেশসমূহেও ধর্ষণের শাস্তির বিধান আছে। সৌদি আরবে প্রকাশ্যে শিরচ্ছেদ, জিসিসিভুক্ত অন্যান্য মুসলিম দেশসমূহে ফাঁসি (সাতদিনের মধ্যে), চীনে মৃত্যুদন্ড (দ্রুত) বিশেষ ক্ষেত্রে পুরুষাঙ্গ কর্তন, আফগানিস্তানে চারদিনের মধ্যে গুলী বা ফাঁসি, উত্তর কোরিয়ায় ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলী, মিশরে ফাঁসি, ইরানে প্রকাশ্যে পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদন্ড বা ফাঁসি, যুক্তরাষ্ট্রে সর্বোচ্চ আমৃত্যু কারাদন্ড, ভারতে ১০-১৪ বছর কারাদন্ড বিশেষ ক্ষেত্রে ফাঁসি, মঙ্গোরিয়ায় ধর্ষিতার পরিবারের হাত দিয়ে মৃত্যুদন্ড, গ্রীসে আগুনে পুড়িয়ে মৃত্যুর বিধান রয়েছে এবং শাস্তি কার্যকর হয়। আর আমাদের দেশের নতুন সংশোধিত আইনের কথা তো সবার জানা হয়েছে। বাংলাদেশে নব্বই শতাংশ মানুষ মুসলমান এবং ধর্ষকদেরও নব্বই শতাংশও মুসলমান নামধারী জানোয়ার। কাজেই এই মুসলমান প্রধান দেশে প্রকাশ্যে শিরচ্ছেদ বা ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলী করে মারার বিদ্যমান আইনটি দ্রুত কার্যকর করলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা ইসলামী আইন বলবতের সওয়াবটুকু পেয়ে যেতেন এবং ইতিহাসে অমর থাকতেন। তাছাড়া এভাবে দু’চারটি রায় কার্যকর করা হলে ধর্ষণের মতো গর্হিত অপরাধে লিপ্ত হতে অনেকে ভয় পেতো। মিশরের মতো মডারেট মুসলমান দেশে পৃথিবীর সব দেশের চেয়ে ধর্ষণের হার সবচেয়ে কম মাত্র ০.১০ প্রতি এক লাখে। সবচেয়ে বেশি দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রতি এক লাখে ১৩২.৪ জন নারী ধর্ষিত হয়ে থাকে (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২০ অক্টোবর ’২০)।
ধর্ষণের সংশোধিত আইন মৃত্যুদন্ড নিয়ে দেশের বরেণ্য আইন বিশারদগণ এবং সুশীল সমাজের অধিকাংশ এ আইনকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে এর সাথে সাথে আইনটির প্রয়োগ নিয়ে অনেকটা সন্দিহান বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের ভাষায় যেখানে পূর্বেকার আইন যাবজ্জীবন জেলবাসের মাত্র দেড় শতাংশ মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে এবং তা কার্যকর করা হয়েছে, সেখানে মৃত্যুদন্ডের বিধান বিচারহীনতার সংস্কৃতির দেশে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করা হিমালয়ের চূড়ায় আরোহণের মতো অনেকটা দুঃসাধ্য হবে। এ লক্ষ্যে পৌঁছতে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন’ বিচারে আদালতের সংখ্য বাড়ানো একান্ত জরুরী। যৌক্তিক কারণ ছাড়া বিচার বিলম্বিত হলে বিচারকের প্রমোশন, ইনক্রিম্যান্ট স্থগিত থাকবে।
দ্বিতীয়ত: বিচারকার্য লাগাতার চলবে নিষ্পত্তি পর্যন্ত। আাসমীপক্ষের টাইম পিটিশনের অবকাশ থাকবে না এবং আদালত কর্তৃক গৃহিতও হবে না। তৃতীয়ত: স্বীকারোক্তিমূলক মামলার চার্জশীট পুলিশকে অতি দ্রুত আদালতে জমা দেয়ার নির্দেশ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের থাকবে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে সাক্ষী নিষ্প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া যাবে, যেহেতু গণধর্ষণ ছাড়া কেহ প্রকাশ্যে তো ধর্ষণ করে না। চতুর্থ: প্রতিটি ধর্ষণের মামলার ধর্ষিতার ও ধর্ষকের ডিএনএ টেস্ট করানা বাধ্যতামূলক করতে হবে। যাতে ধর্ষক স্বীকার করতে না পারে বা নির্দোষ ব্যক্তি যেন না ফাঁসে। টেস্টে সন্দেহ হলে অন্য হাসপাতালে টেস্ট করিয়ে পুলিশকে সন্দেহমুক্ত হতে হবে এবং পরীক্ষায় ভিন্ন নিরীক্ষণ উল্লেখ থাকলে পরীক্ষক ডাক্তারকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।
পঞ্চমত: পুলিশের কোন গাফিলতি হলে সে বা তাদেরকেও বরখাস্ত বা প্রমোশন-ইনক্রিম্যান্ট স্থগিত করণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। আসামী ধরা না পড়–ক বা পড়–ক পুলিশকে দ্রুত চার্জশীট দাখিল করতে হবে। ষষ্ঠত: ছাত্র রাজনীতির লাগাম টানতে হবে। প্রায়ই দেখা যায় রাজনীতির সঙ্গে জড়িতবা গড় ফাদারদের ছত্রচ্ছায় যারা থাকে তারা এ রকমের অপকর্ম বেশি করে এবং অভিযোগপত্র ও বিচার বিলম্বিতার অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। পুলিশকে এ ব্যাপারে নৈতিক বলে অটুট থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একান্ত অপারগ হলে তার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ক্ষমতাধরের নাম-ধাম জানিয়ে দিতে হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সরকারকে অবহিত করবেন। মোটকথা, পুলিশ এবং বিচারকের সদিচ্ছা থাকলে এক সপ্তাহেরও কম সময়ে বিচারকার্যে নিষ্পত্তি সম্ভব। উদাহরণ তো সামনেই আছে-মাত্র সাত কার্যদিবসে বাগরহাটের ধর্ষণ মামলার রায়।
পাদটীকা : এম.সি কলেজে গণধর্ষণ মামলায় সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির কোন সদস্য ধর্ষকদের পক্ষে না দাঁড়ানোর জন্য সমিতি ও সদস্যদেরকে আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই। হালালভাবে টাকা কামাইয়ের অনেক ধরনের মামলা আছে।
লেখক : সাংবাদিক, প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শীতের শাকের পুষ্টিগুণ
  • জেনে শুনে বিষ করেছি পান
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • Developed by: Sparkle IT