উপ সম্পাদকীয়

বিবর্তন নাকি পরিবর্তন

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৫-১০-২০২০ ইং ০৭:৪১:০৯ | সংবাদটি ৮০ বার পঠিত

অখন্ড ভারতের অযোধ্যার নবাব ছিলেন ওয়াজিদ আলী শাহ। তিনি ছিলেন নবাব আসাফউদ্দোলার পুত্র। দান ধ্যানে নবাব আসাফউদ্দোলার জুড়ি মেলা ছিল ভার। নবাব ওয়াজিদ আলী ছিলেন একজন শিল্পরসিক ব্যক্তিত্ব। কবি মানস ছিল তার ধ্যান জ্ঞান। অসংখ্য গজল, গীতি কবিতা তিনি রচনা করেছেন। তার রচিত শের সমূহ এখনও আবেদন জাগায় বোদ্ধা মহলে। সর্বোপরি ওয়াজিদ আলী শাহ ছিলেন ইতিহাসখ্যাত একজন বিলাসি নবাব। তার বিলাসিতার বর্ণনা দিতে গেলে একটি উপাখ্যান রচনার প্রয়োজন। ওয়াজিদ আলী শাহর মননে যখন যে শিল্পটি স্থান পেতো সেটি নিয়ে মশগুল হয়ে যেতেন তাৎক্ষণিকভাবে। এক সময় ইংরেজদের কোষাগারে নির্দিষ্ট খাজনাটি পরিশোধ করার সময় এলো অযোধ্যা রাজ্যটির। নবাব ওয়াজিদ আলী তখন সখী পরিবৃত হয়ে কৃষ্ণনৃত্য শেখার তালিম নিচ্ছিলেন কয়েকদিন ধরে এবং তা ছিল অব্যাহত প্রক্রিয়ায়। নবাবের কর্মচারীরা সুযোগ পাচ্ছিলেন না নবাবকে সেটা জানানোর।
নবাবের কায়সারাবাগ প্রাসাদে চলছিল কৃষ্ণনৃত্য শেখার অব্যাহত তালিম। খাজনা পরিশোধের তারিখটি পিছিয়ে যাওয়ায় এবং খাজনা পরিশোধ না হওয়ায় চতুর ইংরেজরা তার রাজ্যটি জোরপূর্বক দখলে নেয়। জেনারেল আউটরামের নেতৃত্বে নবাবের প্রাসাদ অভ্যন্তরে তারা প্রবেশ করে। ইংরেজ কর্তৃক রাজ্যটি দখলে নেওয়ার সংবাদটি নবাবকে জ্ঞাত করা হয়। নির্বিকার নবাব উত্তরে বলেন তিনি কিছু একটা হৈ হুল্লোড়ের শব্দ শুনছিলেন কিন্তু তার খেদমতগাররা সেখানে অনুপস্থিত ছিলো বিধায় তার পায়ে জুতো পরানোর মতো কেউ না থাকায় তিনি নিজে উঠে গিয়ে ব্যাপারটি জানার চেষ্টা করতে পারেন নাই। তখন জেনারেল আউটরাম তাকে স্যালুট করে নিজ হাতে জুতো জোড়াটি নবাব এর পায়ে পরিয়ে দেন। সেটি ছিলো ১৮৬১ সাল।
নবাবকে জানানো হয় তাকে কলকাতার অদূরে ভাগীরথীর ওপারে মেটিয়াবুরুজে স্থানান্তরিত করা হবে। তার জন্য নির্ধারিত ভাতা বার্ষিক ছাব্বিশ লক্ষ টাকা সেটিও জানিয়ে দেয়া হয়। ভাতার কথাটি শুনে নবাব মুচকি হেসে জবাব দিয়েছিলেন বার্ষিক ছাব্বিশ লক্ষ টাকা তার পানদান এর ব্যয় নির্বাহের জন্য পর্যন্ত অপ্রতুল। তাকে লক্ষেèৗ থেকে রেলযোগে স্থানান্তরের কথা জানালে তিনি তীব্রভাবে এটির বিরোধীতা করে বলেন হাতির বহর ছাড়া তিনি চলাফেরা করতে অভ্যস্ত নন। চতুর ইংরেজ কর্তৃপক্ষ তার অভিপ্রায়টি পূরণ করে এবং শিল্পীমনা, কিছু আত্মভোলা নবাব ওয়াজেদ আলীকে মেটিয়াবুরুজ দুর্গে স্থানান্তর করে। অন্যদিকে বহাল রাখা হয় তার বাৎসরিক ভাতা ছাব্বিশ লক্ষ টাকার অংকটি। পরবর্তীকালে কি হয়েছিলো সেটি বর্ণনা করবো অন্য আরেকটি নিবন্ধে সময় ও সুযোগ মতো।
বিলাস ব্যসন, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য এসব কিছুর বর্ণনা আর এখন থেকে ইতিহাসে খুঁজতে হবে না। আমাদের চারপাশে চোখ বুলালেই সেগুলির ভুরি ভুরি উদাহরণ আমরা পেয়ে যাবো। সংবাদ মাধ্যম থেকে জানলাম কয়েক লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে গেছে এরিমধ্যে। অনেক দায়িত্বশীল কর্তাব্যক্তিরা রয়েছেন, অনেক গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে সদাসতর্ক অবস্থায়; কিন্তু কেউই এ জাতীয় হরির লুট আর পাচার এর খবর নিশ্চয়ই তাদের জানা আর না হলে তাদের অদক্ষতা আর অযোগ্যতাই এমন কান্ডে মদদ জুগিয়েছে বলে মানতে হয়। একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে কয়েকজন সিটি কাউন্সিলরের সহায় সম্পদ এর হিসাবের তথ্য উপাত্ত চেয়েছে দুদক নামক সংস্থাটি। সিটি কাউন্সিলাররা সাধারণ বা তৃণমূল পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি। উনাদের কারবারই হলো নিজ নির্বাচনী এলাকাবাসির জন্য পৌর সুবিধাদি নিশ্চিত করা কিন্তু বিস্ময় মানতে হয় উনাদের অনেকেরই নাকি হাজার হাজার কোটি টাকার নগদ ও সম্পদের সন্ধান পেয়েছে দুদক। একটি ছোট্ট পরিসরের একজন নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে এতো সম্পদ জমা হয় কিভাবে। মুলুক সন্ধান বোধ হয় তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। আমরা জানি ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা গোপনীয়তা আর নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সুইস ব্যাংক সমূহের জুড়ি নাই। সুইজারল্যান্ডের এমন ব্যাংকগুলি পর্যন্ত জানিয়েছে তাদের কাছে রক্ষিত বাংলাদেশীদের অর্থ সম্পদ বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় নাম তোলার মতো পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে। জানিনা এ জাতীয় সংবাদ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কাড়তে পেরেছে কিনা। সরকার কোন বিহিত ব্যবস্থা নিয়েছেন কিনা।
আমাদের সিলেট সিটি কর্পোরেশন জনগণের পৌর সুবিধা নিশ্চিতকরণে প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। মাননীয় মেয়র সাহেব নানা জায়গা পরিভ্রমণ করছেন সংশ্লিষ্ট সিটি কাউন্সিলারদের নিয়ে। আপাত দৃষ্টিতে সকল কাজই ঠিকঠাকভাবে চলছে বলেই মনে হয়। এম.সি কলেজ ছাত্রাবাস এর অভ্যন্তরে ধর্ষণ ঘটনার ব্যাপারে গুটিকয়েক এর নাম এসেছে তারা আবার গডফাদারদের নাম বলেছেন। এ ব্যাপারেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ব্যবস্থা নিচ্ছেন বলে প্রতীয়মান হয়। এতোকিছুর পর সবকিছু গুড়েবালি হয়ে পড়ে যখন বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িতে সংঘটিত নরহত্যার ঘটনাটি প্রকাশিত হলো। কথিত পুলিশ কর্মচারীরা নাকি এখন গা ঢাকা দিয়েছেন। আমার মতে বন্দরবাজার পুলিশ ফাঁড়িটিকে নগর অভিযোগ কেন্দ্র হিসাবে পরিবর্তিত রূপ দেয়া যেতে পারে। টহল পুলিশের একটি দল সার্বক্ষণিক সেখানে নিয়োজিত থেকে অভিযোগ পাওয়া মাত্র ছুটে গিয়ে পরিস্থিতি যাতে মোকাবিলা করতে পারে তার ব্যবস্থা করা হবে বাঞ্চনীয়। জেলা পুলিশ সুপার এর কার্যালয়টি পাশেই অবস্থিত তারপরেও সারারাতভর একজন জলজ্যান্ত ব্যক্তিকে পিটিয়ে মারা হলো। টাকা দাবী করা হলো কেউ কিছু জানলো না বিস্ময় মানতে হয়। যাই হোক আদার বেপারীর জাহাজের খবর না রাখাই ভালো। শুটকির নৌকায় যেমন বেড়াল বা ইদুর কোনটারই জায়গা হওয়া উচিত নয় সেটাও মনে রাখা দরকার।
আমাদের সিলেট সিটি কর্পোরেশন এর এগারো নম্বর ওয়ার্ড এ আমার স্থায়ী নিবাস। আমার স্ত্রী বিয়োগের পর নানা জাতীয় কাগজপত্র সংগ্রহ ও জটিলতা নিরসনে আমাদের নির্বাচিত কাউন্সিলর রকীবুল ইসলাম ঝলক এর কার্যালয়ে বার কয়েক যেতে হয়েছিলো আমাকে। আমি মুগ্ধ হয়েছি ঝলক এর ব্যবহারে, আচরণ আর সহযোগিতার মনোভাব দেখে। আমার সব দুশ্চিন্তাকে নিজের কাধে নিয়ে সকল কর্মই উনি সমাধা করে দিতে শতভাগ আন্তরিক ছিলেন। তার সহকারী কর্মকর্তাটিও ছিলেন অনুরূপ কর্মনিষ্ঠ। এগারো নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার রকীবুল ইসলাম ঝলককে দেখলাম অত্যন্ত নিষ্ঠাবান ও কর্মনিষ্ঠ একজন জনপ্রতিনিধি হিসাবে। যে শ্রেণি বা পেশার মানুষই আসছে সদাহাস্য ঝলক সাথে সাথে সাহায্যের হাত বাড়াচ্ছেন। আমি যখন অন্যান্য কয়েকটি মহানগরীর কাউন্সিলারদের সম্বন্ধে কথিত দুর্নীতির অভিযোগ সম্বন্ধে আলোকপাত করেছিলাম তখন সবাই মন্তব্য করেছিলেন জনসেবা করার মানস নিয়ে যে বা যারা নির্বাচিত হবেন তারাই অনুরূপ আন্তরিকতা দেখাতে পারবেন। আমি ঝলক সাহেবের চেম্বারে লোকের ভিড় ভাড়াক্কা। নাই কেনো সেটা একজনকে জিজ্ঞাসা করায় উত্তর পেলাম এটাই যে রকীবুল ইসলাম ঝলক নিজ কার্যালয়েই অবস্থান করেন আপন এলাকার মানুষের নানা জাতীয় দাপ্তরিক কাজ সম্পাদন করার লক্ষ্যে। একটি নির্দিষ্ট সময়ে তিনিও বাইরে যান তার এলাকাবাসীর খোঁজখবর নিতে প্রয়োজনবোধে কোন কিছুর তাৎক্ষণিক সমাধান করতে। আমার অতি জটিল কর্মকান্ড তাৎক্ষণিকভাবে সমাধান করে দেয়ায় রকীবুল ইসলাম ঝলককে আন্তরিক মোবারকবাদ জানাই। সাথে সাথে কম্পিউটার নিয়ে বসা তার একান্ত সহকারীকেও ধন্যবাদ জানাতে চাই আমার মতো একজন অখ্যাত, গুরুত্বহীন ব্যক্তিকে নিষ্ঠার সাথে গ্রহণ করার মানসিকতা দেখানোর জন্য।
যাই হোক, শুরু করেছিলাম অযোধ্যার নবাব এর কাহিনী দিয়ে আর শেষ করতে চাইবো ঠিকানাবিহীন নবাবদের কথা স্মরণ করে দিয়ে। যারা অনেকেই একটি টাকার জন্য স্বচ্ছলদের টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতো আজ তারা হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক বনে গেছে। আজ তাদের জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অনেককেই। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিদেশে যখন প্রায় আশ্রয়হীন অবস্থায় ছিলেন তখন তিনিও কাজ করতেন মানুষের বাচ্চাদের বিদ্যালয়ে আনা নেয়ার দায়িত্বশীল হিসাবে। কারণটি ছিলো প্রতিটি বাচ্চা পিছু এই কাজটির জন্য তাকে অভিভাবকরা দিতো একটি করে পাউন্ড। মুখ খুললেই যেখানে তার জন্য অজস্র বৈদেশিক মুদ্রা এসে জমা হতো সেখানে সেটি তিনি না করে কর্ম সম্পাদন দ্বারা দিন গুজরান করেছেন। আপন সন্তানাদি মানুষ করেছেন আবার নিজের নীতিতে অটল থেকেছেন। জনসেবাকে ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছেন। ভুলত্রুটি সবারই থাকবে সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। ক্ষমতামদমত্ত হলে কিন্তু হিতে বিপরীত হতে পারে। খেদমতে খালক নিস্ত।
লেখক : নিবন্ধকার।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শীতের শাকের পুষ্টিগুণ
  • জেনে শুনে বিষ করেছি পান
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • Developed by: Sparkle IT