উপ সম্পাদকীয়

নবীর তিন শত্রুর কথা

রফিকুর রহমান লজু প্রকাশিত হয়েছে: ২৬-১০-২০২০ ইং ০৪:২৭:৪২ | সংবাদটি ২২৬ বার পঠিত

আরব বিশ্বের সিরিয়া প্রান্তের এক বিশাল শ্যামল ভূখণ্ডের নাম ছিলো খায়বার। ছোট বড় বহু দুর্গ দ্বারা স্থানটি সুরক্ষিত ছিলো। অনেক আগে থেকেই এই সুরক্ষিত অঞ্চলে ইহুদীদের বসবাস ছিলো। পরবর্তীতে মদীনা থেকে বনি কাইনুকা ও বনি নাজির গোত্রের ইহুদীরা এখানে এসে আশ্রয় নেয়। ইহুদীরা ইসলামের ঘোর শত্রু। তারা এখানে এসে নতুন নতুন ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে। এই সব চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের খবর নবী (দ:) এর কানে যায়। তিনি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে খায়বার আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে হজরত আবুবকর (রা:) এর পরিচালনায় যুদ্ধ শুরু হয়। দ্বিতীয় দিন নেতৃত্ব দেন হজরত ওমর (রা:)। তৃতীয় দিন শেরে খোদা আলী (রা:) এর নেতৃত্বে পরিচালিত যুদ্ধে ইহুদীদের শক্তিশালী দুর্গ কামুস-এর পতন ঘটে। পরবর্তীতে দূরদর্শী নবী (দ:) মুসলমানদের চিরশত্রু ইহুদীদের সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি সম্পন্ন করেন।
এই চুক্তির শর্ত সমূহের মধ্যে একটি শর্ত ছিলো ইহুদীদের বাড়ি-ঘর, ধন-সম্পত্তি ও ইহুদীদের নিজ নিজ অধিকারে থাকবে কিন্তু এই সব সম্পত্তির ষোলআনা মদীনার মুসলমান সরকারের অন্তর্ভুক্ত হবে। শান্তিচুক্তি সত্ত্বেও তারা নবী (:) করিম (দ:) কে শান্তিতে থাকতে দেয়নি। জীবিত অবস্থায় তাকে নানাভাবে কষ্ট দিয়েছে অশান্তিতে রেখেছে। এমনকি মৃত্যুর পরও তাঁর লাশ সরিয়ে নিতে চেষ্টা করেছে।
যে ইহুদী রমনী জয়নবের দেয়া বিষক্রিয়ায় জীবনের শেষ মুহূর্তে শারীরিক কষ্টে ভোগেছেন আল্লাহর নবী (দ:) মৃত্যুর পরে দেখা গেলো সেই তারাই নবী করীম (দ:) এর কবরের জীবনটাও অশান্তিতে ভরে তুলতে উঠে পড়ে লেগেছে। এই কুচক্রীদের নবী (দ:) একবার মদীনা থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। এই বহিষ্কার আদেশকে পবিত্র কোরআন শরীফে বলা হয়ছে হাশরে আউয়াল। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা:) দ্বিতীয় বার এদেরকে বিতাড়িত করে সিরিয়ার দিকে পাঠিয়ে ছিলেন। এই সম্প্রদায়কে কখনও বিশ্বাস না করতে কোরআন শরীফে উল্লেখ আছে। এদের প্রবল আক্রোশের শিকার হয়েছিলো নবী করিম (দ:) এর পবিত্র মরদেহ। এদের কবল থেকে নবীর (দ:) মৃত দেহ রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিলেন বাগদাদের বাদশা ওলীয়ে কামেল নূরুদ্দীন। নবীর (দ:) ইন্তেকালের বহুপরে (৫৫৫ হি: সাল) তিনি এক রাতে স্বপ্ন দেখলেন হজরত মুহম্মদ মোস্তফা (দ:) স্বপ্নে তাকে বলছেন, হে নূরুদ্দীন, তিনজন ইহুদী আমাকে কষ্ট দিচ্ছে। তুমি এদের গ্রেফতার করে বিচার করো। আল্লাহর নবী (দ:) সেই তিন ইহুদীকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েও দিলেন। এর মধ্যে বাদশা নূরুদ্দীনের ঘুম ভেঙ্গে যায়। ভীত সন্ত্রস্তভাবে আবার শুয়ে পড়লেন তিনি। একই স্বপ্ন দেখলেন আবার। নবী (দ:) তিনজন লোককে দেখিয়ে বলছেন, এই তিন বেয়াদবকে তুমি গ্রেফতার করো।
বাদশার ঘুম ভেঙ্গে গেলো। তিনি উঠে তাহাজুদের নামাজ পড়েন। জানালা খুলে সুবেহসাদেকে রঙীন আলোয় বাইরের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন তিনি। তার সামনে সেই তিন ব্যক্তি। পরহেজগার চেহারার তাসবি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন তারা। এক রাত্রে তিনি তিনবার একই স্বপ্ন দেখলেন। তিনি চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ফজরের নামাজ পড়ে তিনি উজির জালালুদ্দিনের কাছে গিয়ে স্বপ্নের কথা বললেন। তারা দু’জন পরামর্শ করে পরের দিনই ষোল হাজার সৈন্য নিয়ে মদীনায় উপস্থিত হলেন। সব শুনে মদীনার বাদশা জানালেন তিনি এক ভোজ সভার আয়োজন করবেন এবং প্রত্যেক মদীনাবাসীকে দাওয়াত করবেন। দাওয়াত দিয়ে তিনি আরো অনুরোধ করলেন কেউ যেনো বাদ না পড়েন। একাদিক্রমে পনের দিন ধরে চললো সেই ভোজের খানাপিনা। বাদশা নূরুদ্দীন সেই তিন ব্যক্তিকে খুঁজতে থাকেন। তাদের কোনো সন্ধান না পেয়ে তিনি মদীনায় গেলেন।
তিনি বললেন আমার মনে হচ্ছে সবাই আমার দাওয়াতে আসেননি। কেউ না কেউ বাদ পড়েছেন। এক ব্যক্তি উত্তর দিলো হুজুর আমার মনে হয় আপনার দাওয়াতে তিনজন বাদ পড়েছে। তারা কারুরই কোনো উপহার, হাদীয়া বা দাওয়াত গ্রহণ করেন না।
বাদশা নূরুদ্দীন সঙ্গে সঙ্গে সেই তিন ব্যক্তির বাড়িতে যান। দরজায় দাঁড়ানো প্রহরী বাধা দিলো। বললো ভিতরে তিন জন এবাদতে মগ্ন। ওলীয়ে কামেল নুরুদ্দীন বাধা ডিঙিয়ে ঘরে ঢুকলেন, দেখলেন স্বপ্নে যাদের দেখেছেন তাঁর সামনে সেই তিন ব্যক্তি। একজন নামাজ পড়ছেন, একজন কুরআন তেলাওয়াত করছেন, অন্যজনের হাতে তাসবি। বাদশা তাদের পরিচয় জানতে চাইলেন। তারা বললো তারা মোসাফির। তারা কারুর সাথে মেলামেশা করে না, কারুর দাওয়াতে অংশ নেয় না। বললো তারা ইউরোপের বাসিন্দা। হজ্ব পালনের জন্য তারা এখানে এসেছে। নবীর (দ:) রওজার কাছাকাছি থাকার বাসনা নিয়েই এখানে আছে দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু বাদশা অন্য কিছু তালাশ করছেন। অপরদিকে বাদশার ১৬ হাজার সৈন্য মদীনার চারদিকে বেষ্টন করে আছে। যেনো কেউ কোনোভাবে পালাতে না পারে।
এক সময় তারা মুখ খুললো। ইউরোপের সুদক্ষ কিছু ইহুদী প্রশিক্ষকের নিকট থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে তারা এখানে এসেছে। প্রচুর টাকার বিনিময়ে তারা একটি কাজের দায়িত্ব নিয়ে এখানে এসেছে। তারা মরে বাঁচে যে কোনো উপায়ে নবীর (দ:) লাশ কবর থেকে তুলে ইউরোপের সেই ইহুদীদের হাতে তুলে দেবে। এই উদ্দেশ্যে গত তিন বছর যাবৎ তারা মসজিদে নববীর কাছে বসবাস করে আসছিলো। কারণ এখান থেকে নবীর রওজা মোবারক খুবই কাছে।
আর অপেক্ষা নয়, বিলম্ব নয়। গ্রেফতার করা হলো তাদের। তারা তাদের গোপন ষড়যন্ত্রের সব পরিকল্পনা সকলের সামনে বিবৃত করলো। দেখা গেলো তারা যেখানে অবস্থান করেছিলো তার পাশের কামরা পুরোটাই কার্পেট দিয়ে ঢাকা। কার্পেটের একঅংশ তোলা হলো তখন একটি পাথর নজরে পড়লো সবার। সন্দেহ হওয়ায় পাথরটি সরানো হলো। পাথরের নিচে দেখা গেলো একটি সুড়ঙ্গের মুখ। সেই তিন ইহুদী সুড়ঙ্গ তৈরি করেছে। সময় লেগেছে তিন বছর। এই সুড়ঙ্গ দিয়ে নবীর (দ:) কবরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিলো তাদের। নবীর (দ:) কবরের কাছে যাওয়ার পর তারা আর আগাতে পারে নাই। একটু আগালেই ভূমিকম্পের মতো প্রচন্ড কম্পন অনুভূত হয়। আল্লাহ তার নবীর (দ:) লাশের এভাবেই হেফাজত করেন। ঠিক এ সময়েই বাদশা নুরুদ্দীনের মদীনায় আগমন। বাদশা তাৎক্ষণিক বিচারে তাদের মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করেন। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য মসজিদে নববী থেকে অর্ধ মাইল পূর্বে বিরাট এক ময়দানে ২০ হাত উঁচু এক মঞ্চ তৈরি করা হয়। অতঃপর মদীনার উপকন্ঠে বসবাসরত সকল মুসলমানদের দাওয়াত দিয়ে জানানো হলো। তাঁদের উপরই দায়িত্ব দেয়া হলো কাঠ যোগাড় করার। পরে মঞ্চের উপরে তিন কুচক্রী ইহুদীকে বেধে রাখা হলো। নিচ দিকে আগুন ধরিয়ে দেয়া হলো। ১১ দিন ধরে জ্বলে পুড়ে ছাই হলো নবীর (দ:) মৃত্যুর আগের মৃত্যুর পরের চির শত্রুদের।
এভাবে বাগদাদের বাদশা নবীর (দ:) ইচ্ছানুযায়ী তাঁর পবিত্র মরদেহের পবিত্রতা বজায় রাখলেন। সেই সাথে ইসলামের ইতিহাসে বাগদাদের বাদশা ওলীয়ে কামেল নূরুদ্দীনও চিরস্মরণীয় হয়ে রইলেন।
বাদশা নূরুদ্দীন পুরো ছয় মাস মদীনায় অবস্থান করে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে নবী হজরত মুহম্মদের (দ:) রওজা মোবারকের চারিদিকে ১৩০ হাত গভীর দেয়াল নির্মাণ করে তা সুরক্ষিত রাখার উদ্যোগ সিল করে দেন।
লেখক : সিনিয়র কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শীতের শাকের পুষ্টিগুণ
  • জেনে শুনে বিষ করেছি পান
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • Developed by: Sparkle IT