উপ সম্পাদকীয়

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

আফতাব চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২৭-১০-২০২০ ইং ০৩:২৮:১৭ | সংবাদটি ১৩৫ বার পঠিত

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে গোটা বিশ্ব। যদি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বাইডেন জয়ী হন তাহলে নিঃসন্দেহে তা হবে এক ঐতিহাসিক ঘটনা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদী। কিছুটা জটিলও বটে। প্রত্যক্ষ নির্বাচন নয়। এ নির্বাচন প্রক্রিয়া চলে প্রায় বছর ধরে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সব সময় নভেম্বর মাসের প্রথম সোমবারের পরবর্তী প্রথম মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে মূলত এ নিবন্ধ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার জন্য প্রার্থীর তিনটি আবশ্যিক যোগ্যতা প্রয়োজন। বয়স হতে হবে কমপক্ষে পঁয়ত্রিশ বছর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্মসূত্রে নাগরিক হওয়ার পাশাপাশি কমপক্ষে চৌদ্দ বছরের বাসিন্দা হতে হবে। এছাড়া প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের চারটি ধাপ রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী নির্বাচন পদ্ধতির ইতিবাচক দিক হচ্ছে, এ সময়সীমায় একজন প্রার্থীর দুর্বল ও সবল দিকগুলো ফুটে ওঠে। কে সেরা, এ নিয়ে প্রচুর ভাবনা-চিন্তা করার সময় পান ভোটাররা। প্রার্থীর মনোবল পরীক্ষিত হয় প্রতি পদক্ষেপে। দেশের যে কোন ইস্যুতে প্রার্থীর দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ ব্যাপারটি অসম্ভব এ পদ্ধতিতে। সংবাদ মাধ্যমে এ নিয়ে বিস্তর আলোচনা হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে প্রার্থীর ইতিবাচক-নেতিবাচক দিক প্রকাশ পেয়ে যায়। এক কথায় বলা যায়, প্রার্থীর অগ্নি পরীক্ষা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম ধাপ হচ্ছে, প্রাইমারিজ ক’কাসেস। প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী এক দলে দু’জন বা এর বেশি হতে পারেন। যেমন, ডেমোক্র্যাট দলের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন প্রত্যাশী ২০০৮ সালে দু’জন হলেন-বারাক ওবামা ও হিলারী ক্লিনটন। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এসেছে প্রাইমারিজ-ক’ কাসেস। মূলত দলীয় সদস্যরা এতে ভোট প্রদান করেন। আগামী সাধারণ নির্বাচনে (পপুলার বা জেনারেল ইলেকশন) প্রতিনিধিত্ব বাছাইয়ের জন্য প্রথম ধাপে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এটি মূলত দলীয় ব্যাপার-স্যাপার। প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন প্রত্যাশীদের বাছাই করা হয় নিজ নিজ দলের সাংগঠনিক স্তরে।
প্রাইমারি ক’কাস-এর মধ্যে সামান্য পার্থক্য রয়েছে। ক’কাস পদ্ধতি পরিবর্তিত হয় সংশ্লিষ্ট মার্কিন রাজ্যের আইন অনুসারে, বেসরকারী বা সরকারী স্কুল-ভবন ইত্যাদিতে মিলিত হয়ে ভোটাররা প্রার্থী ও ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেন। কাউন্টি কনভেনশনের জন্য প্রতিনিধি বাছাই করা হয়। অর্থাৎ জেলাস্তরের প্রতিনিধি। জেলাস্তর থেকে রাজ্যস্তর এবং পরিশেষে কেন্দ্রীয় স্তরের প্রতিনিধি, পর্যায়ক্রমে বাছাই পর্ব চলে। ডেমোক্র্যাটিক ক’কাসে বিভিন্ন প্রার্থীর সমর্থনে প্রকাশ্যে এক রুমের মধ্যে আলাদা আলাদা গোষ্ঠীতে ভাগ হয়ে যান ভোটাররা। সে অনুযায়ী ডেলিগেট বরাদ্ধ হয়। রিপাবলিকান ক’কাসে সাধারণত গোপন ব্যালেটের সাহায্য নেয়া হয়। এর ফলের ভিত্তিতে ডেলিগেট সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় প্রার্থীদের অনুকূলে।
প্রাইমারী নির্বাচনে একটি রাজ্যের সব পুঞ্জিকৃত ভোটাররা সরাসরি তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন। প্রতি নির্বাচনী বছরে একই সময়ে ক’কাসের প্রাইমারিজ অনুষ্ঠিত হবে, এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে এ প্রক্রিয়া সাধারণত জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হয়। যখন বেশ কয়েকটি রাজ্যে একসঙ্গে কোন মঙ্গলবার প্রাইমারিজ অনুষ্ঠিত হবে, এমন কোন বাধ্যবাধকতা অবশ্য নেই। তবে এ প্রক্রিয়া সাধারণত জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হয়। যখন বেশ কয়েকটি রাজ্যে একসঙ্গে কোন মঙ্গলবার প্রাইমারিজ বা ক’কাসেস অনুষ্ঠিত হয় তখন ‘সুপার মঙ্গলবার’ বলা হয়।
২০০৮ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি এক সঙ্গে চব্বিশটি রাজ্যে প্রাইমারিজ ক’কাসের অনুষ্ঠিত হয়। একে তখন সুপার-ডুপার মঙ্গলবার বলা হয়েছিল। ২০০৪ সালে সুপার মঙ্গলবার দু’টিতে ভাগ ছিল। ৩ ফেব্রুয়ারী সুপার মঙ্গলবার (এক) এবং ২ মার্চ সুপার মঙ্গলবার (দুই)। জুন মাসে রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী নির্বাচিত হন।
প্রাইমারি ক’কাসেস বাছাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রেসিডেন্ট পদ নির্বাচনে ইচ্ছুক দলীয় প্রতিদ্বন্দ¦ীর ভাগ্য নির্ধারিত হয় এর মাধ্যমে। প্রত্যেকটি রাজ্যে একই সংখ্যক দলীয় প্রতিনিধি (ডেলিগেট) থাকেন না। ২০০৮ সালে রিপাবলিকান দলের ডেলিগেটের সংখ্যার তুলনায় ডেমোক্র্যাট ডেলিগেট সংখ্যা প্রায় দ্বিগুন ছিল। তবে উভয় দলের ক্ষেত্রেই প্রেসিডেন্ট পদে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য (৫০%+১) ভোট প্রয়োজন। সব প্রার্থীর লক্ষ্য থাকে, যত বেশি সম্ভব প্রাইমারিতে ডেলিগেটের সমর্থন আদায় করা। প্রাইমারিতে কেউ হয়তো বেশি ভোট পেতে পারেন কিন্তু ডেলিগেটদের সমর্থন সমহারে না-ও পেতে পারেন। ২০০৮ সালে বারাক ওবামা থেকে নেভাদা এবং টেক্সাসে বেশি ভোট পেয়েছেন হিলারি ক্লিনটন কিন্তু ভেলিগেটদের বেশি সমর্থন পান বারাক ওবাম।
ডেলিগেট নির্বাচনের ক্ষেত্রে একেক দল নিজস্ব নীতি নির্ধারণ করে। আগের নির্বাচনে যদি কোন রাজ্যে কোন দল ভাল ফল করে তা হলে ঐ রাজ্যে ডেলিগেটদের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে পারে সংশ্লিষ্ট সে দল। ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান উভয় দলের নির্দিষ্ট সংখ্যক নির্বাচিত ডেলিগেট থাকেন। সংশ্লিষ্ট রাজ্যে প্রাইমারি বা ক’সাসের ফলের মাধ্যমে নির্বাচিত ডেলিগেটদের ভোট নির্ণয় করা হয়। অনির্বাচিত ডেলিগেটও থাকেন। ডেমোক্র্যাট দলে অনির্বাচিত ডেলিগেটদের সুপার ডেলিগেট বলা হয়। অনির্বাচিত ডেলিগেটরা প্রেসিডেন্ট পদে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে কাকে সমর্থন করবেন, সে বিষয়ে স্বাধীন। প্রাইমারি-ক’কাসে অবশ্য তাদের কোন জায়গা নেই। তারা শুধু নিজ নিজ দলের কেন্দ্রীয় সম্মেলনে অংশ নেন। তারা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকেন। গভর্ণর, কংগ্রেস সদস্যরা মূলত অনির্বাচিত ডেলিগেট। তাদের সমর্থন আদায় নিয়ে কোন প্রার্থী ভাবেন না। নির্বাচনী ফলে যদি ব্যবধান খুব কমে যায় তখন তাদের গুরুত্ব বেড়ে যায়।
প্রাইমারিজ ক’কাস পর্ব শেষে নিজ নিজ দলের কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে দলের প্রার্থী চুড়ান্ত হয়। ২০০৮ সাললে বারাক ওবামা ও হিলারি ক্লিনটন ডেমোক্র্যাট দলের প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন প্রত্যাশী ছিলেন কিন্তু হিলারি হেরে যান। এবার ডেমোক্র্যাট দলের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হলেন বাইডেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট পদে কমলা হ্যারিস। এ সময়ে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীকে বেছে নিতে হয় রানিং-মেট অর্থাৎ ভাইস প্রেসিডেন্ট। রানিং-মেট হবার জন্য কমলা হ্যারিস আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দিয়েছেন বাইডেন। দলীয় স্তরে ঘরোয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষ। এখন বাইরের প্রতিপক্ষের পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
এরপর ইলেক্টরাল কলেজ ব্যবস্থা। আমেরিকার ভোটাররা হাউস অব রিপ্রেজেনটিটিভের ৪৩৫ জন সদস্য, ১০০ সদস্য বিশিষ্ট সেনেটের এক তৃতীয়াংশ সদস্য এবং প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেন একসঙ্গে। ফেডারেল ন্যাশনাল নির্বাচন প্রতি দু’বছরে অনুষ্ঠিত হয়। কোন সঙ্কটে এমনকি গৃহযুদ্ধের সময়ও তা বাতিল হয় না।
হাউস অব রিপ্রেজেনটিটিভের সব কংগ্রেস সদস্য প্রতি দু’বছরে নির্বাচিত হন। ছয় বছর মেয়াদে নির্বাচিত হন সেনেটররা। তাই প্রতি দু’বছরে এক তৃতীয়াংশ সেনেটর নির্বাচিত হন। প্রেসিডেন্ট-ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন প্রতি চার বছরে। কংগ্রেস সদস্য এবং সেনেটর সরাসরি নির্বাচিত হন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা সরাসরি প্রেসিডেন্ট-ভাইস প্রেসিডেন্টকে নির্বাচিত করেন না। পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি।আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে জাতীয় সংসদের নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। তিনি হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এগজিকিউটিভ অথরিটি। বলা যেতে পারে, কার্যনির্বাহী কর্তৃপক্ষ। ইলেক্টরাল কলেজে থাকেন ৫৩৮ সদস্য। এর মধ্যে ডিস্ট্রিক্ট অব কলোম্বিয়ার ৩ জন ইলেক্টরও রয়েছেন। প্রেসিডেন্ট পদে জয়ী হবার জন্য ২৭০ ইলেক্টরের সমর্থন প্রয়োজন।
আমেরিকার সবক’টি রাজ্যে নির্দিষ্ট সংখ্যক ইলেক্টর নির্বাচিত হন। সব রাজ্যে সমসংখ্যক ইলেক্টর থাকেন না। প্রতিটি রাজ্যে অবশ্য দু’জন করে সেনেটর থাকেন কিন্তু জনসংখ্যার ভিত্তিতে হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভ এর সদস্য সংখ্যা রাজ্যে নির্ধারিত হয়। নির্বাচিত ইলেক্টররা নির্বাচন করেন প্রেসিডেন্ট-ভাইস প্রেসিডেন্ট জুটিকে। একে ইলেক্টরাল ভোট বলে। অনেক সময় একাংশ নির্বাচিত ইলেক্টর আগের রাজনৈতিক আনুগত্য ভুলে গিয়ে প্রতিপক্ষের দিকে ঝুকেন। প্রেসিডেন্ট পদে যিনি জয়ী হবেন তার রানিং-মেট ভাইস প্রেসিডেন্ট হবেন। এ রকম নানাবিধ জটিল নিয়মে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্টিত হয়। কারণ সব রাজ্যে এক নিয়ম নয়। রাজ্যওয়ারি ভোট গণনা পদ্ধতি এক নয়। কোন কোন রাজ্যে ভোট গণনায় আনুপাতিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।
দু’বার পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পদে অসীম হতে পারেন যে কেউ। ১৯৫১ সালে সংবিধানে সংশোধন ঘাটিয়ে এ নিয়ম করা হয়। উল্লেখ্য, ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট সর্বাধিক চারবার প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৪৫ সালে তিনি মারা যান। এর ছ’বছর পর এ সংশোধন আনা হয়। রুজভেল্ট ছাড়া আর কোন প্রেসিডেন্ট দু’বারের বেশি থাকেননি। এছাড়া, পপুলার ভোট যিনি বেশি পাবেন তিনিই যে ইলেক্টরাল কলেজ ভোটে জয়ী হবেন এমন কোন কথা নেই। ২০০০ সালের নির্বাচনে পপুলার ভোটে জয়ী আলগোর কিন্তু হেরে গিয়েছিলেন ইলেক্টরাল কলেজ ভোটে জর্জ ডব্লিউ বুশের কাছে। ২০২০ সালের মার্কিন নির্বাচন একটু স্বতন্ত্র ধরনের। কারণ ১৯৫২ সাল থেকে এ প্রথম কোন প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট এবার প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচনে নেই।
লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শীতের শাকের পুষ্টিগুণ
  • জেনে শুনে বিষ করেছি পান
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • Developed by: Sparkle IT