উপ সম্পাদকীয়

ইন্দো-প্যাসিফিক : কী ও কেন

অ্যাডভোকেট আনসার খান প্রকাশিত হয়েছে: ২৮-১০-২০২০ ইং ০৫:২৬:৫০ | সংবাদটি ১২৬ বার পঠিত

অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক শক্তিতে চীনের উত্থান বিশ্বশক্তি আমেরিকার জন্য ক্রমবর্ধমান হুমকি ও চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠেছে।
চীনের উত্থান এবং আমেরিকার প্রতি চীনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও ব্যর্থ করে দেওয়ার উদ্দেশ্যের অংশ হিসেবে আমেরিকা চীন বিরোধী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক জোট হিসেবেই- ‘ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত’ জোট গঠনের চেষ্টা করে চলেছে বলে বিশেষজ্ঞ অভিমত।
ইন্দো-প্যাসিফিক,বলতে পূর্ব আফ্রিকা ও পশ্চিম এশিয়ার উপকূলীয় দেশগুলো থেকে ভারত মহাসাগর এবং পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর জুড়ে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে প্রসারিত সমুদ্রস্থানকে বোঝায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে- ‘ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস)’ অঞ্চলটি ভারত মহাসাগর এবং প্রশান্ত মহাসাগরের দুটি অঞ্চল, আমেরিকার পশ্চিম উপকূল থেকে ভারতের পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত বিস্তৃত।
‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ শব্দটি অরিজিনালী একটি ভৌগোলিক ধারণা। বিশ্বব্যবস্থার কৌশলগত অবয়বে যে পরিবর্তন ঘটছে তার বাস্তবতায় নতুন কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে ভৌগোলিক ধারণায়ও নতুন দৃষ্টিভঙ্গীর প্রতিফলন ঘটছে। এরই নতুন কৌশলগত বাস্তবতায়, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক শব্দগুচ্ছ’র ব্যবহার করছে আমেরিকা।
যে অঞ্চলটিকে এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সে অঞ্চলটি মূলত,এশিয়া প্যাসিফিক হিসেবে বহুল পরিচিত। তবে ২০১১ সাল থেকে,-ইন্দো-প্যাসিফিক, শব্দগুচ্ছটি ভূ-কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক আলোচনায় ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে।
আমেরিকা কর্তৃক ইন্দো-প্যাসিফিক বক্তৃতার প্রথম সরকারী ব্যবহার হয়েছিলো বারাক ওবামার প্রথম প্রশাসনের সময়। ওবামার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারী ক্লিনটন ২০১২ সালে এশিয়ার দেশগুলোর সফরকালে ইন্দো-প্যাসিফিক শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে বলেছিলেন যে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলটি আমাদের (আমেরিকার) ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এশিয়া প্যাসিফিক নামের কোনো পরিবর্তন আসেনি তখন পর্যন্ত।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্বে ওই অঞ্চলে আমেরিকার কৌশলগত নীতিতে তেমন কোনো পরিবর্তন না এলেও ট্রাম্প প্রশাসনের সময় দীর্ঘ সময় ধরে পরিচিত, ‘এশিয়া প্যাসিফিক’ -অঞ্চলের নাম বদলে ফেলে নতুন নামকরণ করা হয়েছে,-ইন্দো-প্যাসিফিক।" সেসাথে, ওই অঞ্চলের কৌশলগত নীতিতেও পরিবর্তন এনেছে আমেরিকা।
ট্রাম্প প্রশাসন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল সম্পর্কে কী মনোভাব পোষণ করে সেটি তাঁর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসনের বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে। ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের অনুষ্ঠানে (২০১৭ সালে) বক্তব্যদানকালে ১৮ বার ইন্দো-প্যাসিফিক শব্দগুচ্ছ উল্লেখ করে তিনি বলেছিলেন, “বিশ্বের শক্তিকেন্দ্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের মধ্যস্থানে স্থানান্তরিত হবে এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল বলতে তিনি সমগ্র ভারত মহাসাগর,পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর এবং এর পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোকে চিহ্নিত করে মন্তব্য করেছিলেন, একুশ শতকের বিশ্বব্যবস্থায় এই অঞ্চল হবে মূল কেন্দ্র।
চীনকে লক্ষ্য করে, টিলারসন জোর দিয়েছিলেন যে, আমেরিকা একটি, ‘মুক্ত ও উম্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক চায়।’
দ্বিপাক্ষিক অংশীদারিত্ব, শান্তি, সুরক্ষা এবং নেভিগেশনের স্বাধীনতা আমাদের লক্ষ্য,"-বলেছিলেন টিলারসন। এই নীতির আলোকেই ট্রাম্প প্রশাসনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল প্রণীত হয়েছে।
আমেরিকান ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলটি মূলত তিনটি প্রক্রিয়া প্রতিফলিত করে, যা একটি অপরটিকে অনুসরণ করে। প্রথমটি হলো,- চীনের উত্থান, যার দরুণ আমেরিকার বিশ্বশক্তির জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে। দ্বিতীয়টি হলো- ওই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য আমেরিকা তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ শক্তির নবায়ন ও শক্তিশালীকরণের ওপর জোর দেবে এবং পাশাপাশি জোট গঠন ও কৌশলগত অংশীদারিত্বকে (বাহ্যিক ভারসাম্য) জোরদার করার ক্ষেত্রে ভারসাম্য অনুসরণ করে ওই চ্যালেঞ্জের জবাব দেবে এবং তৃতীয়টি হলো-এই হুমকি শুধু আমেরিকার জন্যই নয়, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের জন্যও। আমেরিকান কৌশলগত ভারসাম্যের নীতিটি ওই দেশগুলোর পক্ষেও কার্যকর হতে পারে।
অর্থাৎ, চীনের বিরুদ্ধে, ‘পাল্টা কৌশল’ হলো, আমেরিকার নিজস্ব সামরিক (অভ্যন্তরীণ) শক্তি গঠন ও বৃদ্ধি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক জুড়ে মিত্র ও অংশীদারদের সন্ধান করা।
কৌশলগত ভাষায়, আমেরিকার কৌশলগত এই পরিবর্তনের পেছনে দু’টি কারণ রয়েছে বলে মনে করা হয়। একটি হলো, ভূ-অর্থনৈতিক এবং অন্যটি হলো, ভূ-রাজনৈতিক।
একদিকে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে চীনের উত্থান এবং ভারত মহাসাগরে চীনের একক কর্তৃত্ব স্থাপেেনর প্রচেষ্টা, অন্যদিকে, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি, দক্ষিণ চীন সাগরের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব ইত্যাদি কারণে ওই অঞ্চলের প্রতি আমেরিকার আগ্রহ বেড়ে গেছে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশী।
এই অঞ্চলের ওপর প্রভূত্ব করা নিয়ে চীন আমেরিকার দ্বন্দ্ব-বিরোধ অনেক পুরোনো। একদিকে, ভারত-আমেরিকা মৈত্রী, অন্যদিকে, চীন-পাকিস্তান মৈত্রী, চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড কর্মসূচি, এই অঞ্চলে নতুন করে এক ধরণের স্নায়ুযুদ্ধের জন্ম দিয়েছে। ফলে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়ছে।
কয়েকটি কারণে ইন্দো-প্যাসিফিকের কৌশলগত গুরুত্বের বিষয়টি বিবেচনা করা হয়।
এক. সমুদ্রপথ ও বাণিজ্যিক রুট।
দুই. এই অঞ্চলের দুটি মূল মহাসাগরজুড়ে এর প্রধান ট্রেডিং চ্যানেল, মালাক্কার সমুদ্র সৈকতে একত্রিত হয়েছে। এই সাগরের গুরুত্ব একারণে যে, প্রায় পঁয়ত্রিশ লাখ বর্গকিলোমিটার জুড়ে রয়েছে চীন সাগরের বিস্তৃতি। আর এই সাগরে প্রায় ১১.২০বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং ১৯.২০ ট্রিলিয়ন ঘনমিটার গ্যাস রয়েছে।
এই সাগরের সমুদ্রপথটি পৃথিবীর অন্যতম ব্যস্ত সমুদ্রপথ। সমুদ্রপথে পৃথিবীর যত বাণিজ্য হয়ে থাকে, তার এক-তৃতীয়াংশ এই সমুদ্রপথ দিয়ে সম্পন্ন হয়। কেবলমাত্র, জাপান দৈনিক দশ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে আমদানি করে থাকে। এছাড়া, দক্ষিণ এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ায় যাতায়াতের বাণিজ্যিক রুট হিসেবেও এই সমুদ্রপথ ব্যবহার করা হয়।
তিন. এই অঞ্চলের দৈর্ঘ্য ও প্রস্ত এবং সমস্ত অঞ্চলজুড়ে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি ও শক্তি বৃদ্ধি এবং আমেরিকান পুরোনো জোট ব্যবস্থার আপেক্ষিক পতন ও এর পূনরুত্থানের জন্য প্রচেষ্টা।
চার. বিশ্বের প্রায় ৫০ শতাংশ জনসংখ্যার আবাস এই অঞ্চল এবং বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল দেশগুলোর অবস্থানও এই দুটি সাগরপাড়ে। সাগরপাড়ের দেশগুলো হলো, অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ, কানাডা, চীন, ইন্দোনেশীয়া, ইসরাইল, ভারত, জাপান, সিসিলি, সিঙ্গাপুর, সাউথ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা,আমেরিকা প্রভৃতি।
আমেরিকার দিক থেকে, চীন সাগরসহ এই অঞ্চলের এতো গুরুত্বের কারণ একাধিক। ১. চীনকে ঘিরে ফেলা, চীনের বিরুদ্ধে এই অঞ্চলের আমেরিকান বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করা, ২. জাপানসহ বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ৩. উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক হুমকির মোকাবিলা করা, ৪. ওই সাগর দিয়ে আমেরিকান যুদ্ধ জাহাজের প্রশান্ত মহাসাগরে প্রবেশ করার স্বাধীনতা ও অধিকার নিশ্চিত করা। এছাড়াও, আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর ওই অঞ্চলের তেল ও গ্যাসের ওপর স্বার্থ নিশ্চিত করা।
চীন এই অঞ্চলের এবং একই সাথে বিশ্বরাজনীতির অন্যতম ফ্যাক্টর। অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে দেশটি অন্যতম বৃহৎ শক্তি। আমেরিকান সামরিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ‘নতুন শতাব্দীতে কেবল চীনই আমেরিকার সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জের প্রতিনিধিত্ব করে।’ ২০০৬ সালে পেন্টাগনও চীনকে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান প্রতিযোগী হিসেবে চিহ্নিত করেছিলো। তাই চীন হচ্ছে আমেরিকার টার্গেট।
চীনকে মোকাবিলার লক্ষ্যে তাই আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী ‘কনটেন্টমেন্ট তত্ত্ব’ অনুসরণ করছে। ওই তত্ত্ব অনুযায়ী, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘিরে ফেলা ও সমাজতন্ত্রের পতন ও কর্তৃত্ব বিশ্বরাজনীতি থেকে মুছে ফেলে দেওয়ার তত্ত্ব ছিলো এই তত্ত্বের মূলকথা। চার দশকের মধ্যেই আমেরিকার এই তত্ত্ব ফল দিয়েছিলো, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটেছিলো।
ওই একই তত্ত্ব এখন চীনের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করতে চলেছে আমেরিকা। কারণ, চীনের উত্থান ও পতন চায় আমেরিকা। ১৯৪৫ সালের পর থেকে আমেরিকা প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এবং ১৯৮০ সালের পর থেকে ভারত মহাসাগরে কর্তৃত্ব করে আসছে। এখন আমেরিকা ও তার মিত্রদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের দ্বারা বাধার সম্মুখীন, অন্যদিকে ভারত মহাসাগরে আমেরিকা ও মিত্র ভারত ক্রমবর্ধমান চীনা উপস্থিতির সম্মুখীন। অর্থাৎ চীন এখন আমেরিকার কর্তৃত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য চীনের নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে চীনকে কোণঠাসা করার কৌশল ও চীনকে ঘিরে ফেলার কৌশলের অংশ হচ্ছে ‘ইন্দো-প্যাসিফিক জোট।’
এই জোটে ভারত ও বাংলাদেশকে পাশে চায় আমেরিকা। তাই, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে ভারতের উত্থানকে স্বাগত জানায় আমেরিকা। কারণ, চীনের উত্থানের পক্ষে ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রক্ষা করবে ভারত, মনে করে আমেরিকা। বাংলাদেশকেও একই দৃষ্টিতে বিবেচনায় নিয়েছে আমেরিকা।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শীতের শাকের পুষ্টিগুণ
  • জেনে শুনে বিষ করেছি পান
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • Developed by: Sparkle IT