উপ সম্পাদকীয়

সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমনে মহানবীর আদর্শ

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ৩০-১০-২০২০ ইং ০৪:২৫:২২ | সংবাদটি ৯৭ বার পঠিত

আধুনিক বিশ্বের বহুল আলোচিত বিষয় হচ্ছে সন্ত্রাস ও দুর্নীতি। প্রতিটি দেশের জনগণ সন্ত্রাস ও দুর্নীতির কারণে আজ আতঙ্কিত। সন্ত্রাস ও দুর্নীতির তান্ডবে বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চল আজ প্রকম্পিত। সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমনে বিশ্বের সকল ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো আজ চরম ব্যর্থতা স্বীকার করেছে। এর কারণ কী? একজন রাষ্ট্রপ্রধান রাষ্ট্রের সবকিছুই করতে পারেন কিন্তু সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমন করতে পারেন না কেন? তার একমাত্র কারণ হল স্বজনপ্রীতি, অবিচার, দুর্নীতি। নিজে দুর্নীতিবাজ হলে সমাজ-রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতি দূর করবেন কিভাবে? নিজে সন্ত্রাসী হলে সমাজ-রাষ্ট্র থেকে সন্ত্রাস দূর করবেন কিভাবে? সরকারি দলের কেউ সন্ত্রাস-দুর্নীতিবাজ হলে তাকে ধন্যবাদের সাথে ছেড়ে দেয়া হয় আবার বিরোধী দলের কেউ সন্ত্রাসী-দুর্নীতিবাজ হলে তাকে আজীবন কারাবরণ করতে হয়। এটাই হচ্ছে আধুনিক রাষ্ট্রের সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমনের নিকৃষ্ট উদাহরণ। নিজে সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজ, নিজে সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজ তৈরি করবে, নিজে দলীয় সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজদের লালন করবে এরূপ সমাজপতি ও রাষ্ট্রপ্রধান দ্বারা সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমন করা কি কখনও সম্ভব হবে? আর এরূপ ব্যক্তির দ্বারা সন্ত্রাস ও দুর্নীতি বিরোধী কোন আইন প্রণয়ন করে কি কোনো লাভ হবে?
সন্ত্রাস ও দুর্নীতি আজ ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ব্যক্তিগত জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন তথা সবকিছুই আজ সন্ত্রাস ও দুর্নীতির কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না শান্তি-সুখের সুশীল পরিবেশ। সর্বত্রই কেবল অশান্তির অগ্নিশিখা দাউ দাউ করে জ্বলছে। সন্ত্রাস-দুর্নীতি নির্মূলে আইন, প্রস্তাব, পরামর্শ কম বর্ষিত হয়নি; বরং যতই আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দিন দিন পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলেছে। এ ব্যাপারে কোনো সেমিনার-সিম্পোজিয়াম কোনো কাজে আসছেই না, আর আসবেও না। কারণ এসব আইন, প্রস্তাব, পরামর্শ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ব্যক্তিগত স্বার্থে, দলীয় স্বার্থে। এ জন্যই এসব আইন, প্রস্তাব, পরামর্শ কোনো কাজে আসেনি, কাজে আসবেও না। সন্ত্রাস ও দুর্নীতির তান্ডব থেকে দেশ ও জাতি তথা গোটা বিশ্বকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় হলো-সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমনের ব্যাপারে আল্লাহ প্রেরিত রাসূল (সাঃ) নীতির পূর্ণ অনুসরণ করা। রাসূলে পাক (সাঃ) সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন নীতি উপস্থাপন করে এরই আলোকে সমাজ-রাষ্ট্র থেকে সব ধরণের সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দূর করতঃ ইতিহাস ঘৃণিত সেই বর্বর জাতিকে সোনার মানুষে পরিণত করেছিলেন। প্রশ্ন হল-সন্ত্রাস ও দুর্নীতি দমনে রাসূল (সাঃ) যে বিশ্বজনীন নীতি উপস্থাপন করে ছিলেন সেই সর্বজনীন ও বিশ্বজনীন নীতি ছিল কোনটি?
রাসূল (সাঃ) এর নেতৃত্বে আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের পূর্বে সমগ্র বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাস ও দুর্নীতি ছিল নিম্নরূপ-
(১) এক আল্লাহর ইবাদতের পরিবর্তে মূর্তি পূজা প্রচলিত ছিল সর্বত্র। (২) আইনের শাসন ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। (৩) ‘জোর যার মুল্লুক তার’-এ নীতিই ছিল তৎকালীন রাষ্ট্রব্যবস্থা। (৪) কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দিয়ে তারা আনন্দ-উল্লাস করত। (৫) তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মানুষে মানুষে, গোত্রে গোত্রে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ লেগে যেত। আর এ যুদ্ধ চলত বংশানুক্রমে, বছরের পর বছর। (৬) মদ্যপান, ব্যভিচার, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ, রাহাজানি ছিল স্বাভাবিক রীতি। জাহেলী যুগের এই বীভৎস ও করুণ পরিস্থিতিকে বিশ্বকবি আল্লামা ইকবাল তাঁর কাব্যের মাধ্যমে চিত্রায়িত করেছেন এভাবে-‘পূর্বে তোমার বিশ্বে ছিল দৃশ্য অতি চমৎকার/কেউ পূজিত গরু বাছুর কেউ পূজিত গাছ পাথর/সাকার পূজায় নিত্য রত নিখিল বিশ্ব চরাচর/কে পূজিত কে মানিত আকারবিহীন একেশ্বর।’ ইতিহাস ঘৃণিত এই বর্বর জাতিকে রাসূল (সাঃ) সন্ত্রাস ও দুর্নীতি থেকে চিরমুক্ত করে সোনার মানুষে পরিণত করেছিলেন। এ জন্য তিনি বিশেষভাবে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এগুলো হচ্ছে (১) ঈমান (২) তাসাউফ ভিত্তিক শিক্ষা (৩) ন্যায়বিচার। প্রকৃত ঈমানদার কখনও সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজ হতে পারে না। যার মধ্যে তাসাউফ ভিত্তিক বা তাকওয়া ভিত্তিক শিক্ষা আছে সে কখনও অন্যায়-অপকর্মে লিপ্ত হতে পারে না। সে অন্যায়-অপকর্মে সহযোগিতাও করতে পারে না। এ জন্য রাসূল (সাঃ) সর্বপ্রথম মানুষের অন্তরে ঈমানের বীজ বপন করেন। ঈমান মজবুত করার সকল কৌশল শিক্ষা দান করেন। তিনি ঘোষণা করলেন ‘যার অন্তর পরিশুদ্ধ তার সবকিছুই পরিশুদ্ধ।’ এ জন্য যখনই কেউ অপরাধ করতে উদ্যত হয়েছে তখনই তার মজবুত ঈমানের অন্তর কেঁপে উঠেছে এবং সে অপরাধ থেকে বিরত রয়েছে। ন্যায়বিচারের অভাব সন্ত্রাস ও দুর্নীতির মূল কারণ। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হলে কখনও সন্ত্রাস-দুর্নীতি থাকতে পারে না। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে রাসূল (সাঃ) দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলেছেন, ‘ঐ সত্তার কসম করে বলছি, যে সত্তার কুদরতী হাতে আমি মুহাম্মদের প্রাণ, যদি আমার মেয়ে ফাতিমাও চুরির অপরাধের শিকার হতো, তাহলে আমি নিজ হাতেই তার হাত কেটে শাস্তি কার্যকর করতাম।’ রাসূল (সাঃ) এর এই অমর বাণীর ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে সন্ত্রাস-দুর্নীতি ধূলিস্যাত হয়ে যায়।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শীতের শাকের পুষ্টিগুণ
  • জেনে শুনে বিষ করেছি পান
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • Developed by: Sparkle IT