উপ সম্পাদকীয়

স্থানীয় প্রজাতির ধান

মোহাম্মদ ছয়েফ উদ্দিন প্রকাশিত হয়েছে: ১৭-১১-২০২০ ইং ১০:১৪:৪৯ | সংবাদটি ৮৬ বার পঠিত

ভাতে মাছে বাঙালি। ভাত বাঙালিদের প্রধান খাবার। আমরা তিন বেলা ভাত চাই। ভাত কার্বো হাইড্রেড জাতিয় খাবার। দেহে তাপ ও শক্তি যোগায়। আটা ভাতের বিকল্প হলেও আমাদের কাছে ভাতের কদর বেশি। ভাত বেশি পছন্দনীয় খাবার। ভাত হয় চাউল থেকে। আর চাউল বের হয় ধান থেকে। বাংলাদেশের সর্বত্রই ধান চাষ করা হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম ঙৎুুধ ঝধঃরাব. ইহা একবর্ষজীবী উদ্ভিদ। অর্থাৎ ধান গাছের জীবনকাল এক বৎসরের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। ধান প্রধানত চার ধরনের। আউশ, আমন, বোরো ও ইরি।
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে আউশ ধান রোপণ করা হয়। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে ফসল তোলা হয়। দ্রুত ফলন পাওয়া যায় তাই এর নামকরণ করা হয়েছে আউশ (আশু)। আউশ আসলে ধান ফলানোর একটি মওসুমের নাম। ঐ সময় উৎপাদিত ধানকে আউশ ধান বলে। যেমন-কাটারিভোগ। উচ্চ ফলনশীল নয় বলে আমাদের এলাকায় ধানটি ফলাতে চাষীরা অনাগ্রহী।
আমন ধান কৃষকের গোলা ভরার একটি নিশ্চিত ফসল। আমন ধানের গাছ লম্বা হয়ে থাকে। বৃষ্টি কিংবা বন্যার জলের সাথে পাল্লা দিয়ে আমন ধানের গাছের ডগা বৃদ্ধি পায়। তাই সহজে পানিতে নিমজ্জিত হয়না। আমন ধান দু’ধরনের চাষ করা যায়। রোপা আমন ও বোনা আমন। বীজ তলায় চারা জন্মিয়ে রোপা আমন ক্ষেতে লাগানো হয়। জমিতে বীজ ছিটিয়ে বোনা আমন চাষ করা হয়। চৈত্র-বৈশাখ মাসে বোনা আমনের বীজ বপন করে অগ্রহায়ণ মাসে ফসল কাটা হয়। রোপা আমন শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে জমিতে রোপণ করে কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে ফসল কাটা হয়। এ জাতীয় ধান ক্ষেতে খুব বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। অপেক্ষাকৃত নিম্ন ভূমি আমন চাষের উপযুক্ত জায়গা। সুতরাং আমন ধান উচ্চ ফলনশীল হলেও এর চাষাবাদ দীর্ঘমেয়াদি।
আমনের মৌসুম শেষ হলেও বোরো ধানের মওসুম শুরু হয়। অর্থাৎ কার্তিক মাস থেকে বোরো ধান চাষ শুরু হয়। ফসল কাটা হয় জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত, এটি শীতকালীন ফসল। তাই বোরো ধানকে রবি শস্যও বলা হয়। শুকনো মওসুম ব্যাপিয়া এর চাষাবাদ বিধায় ক্ষেতে পর্যাপ্ত সেচ দিতে হয়। বিল-ঝিল তথা জলাভূমিতে সাধারণত এ ধান জন্মে। এর ফলন ভালো। এ জাতিয় ধানের মধ্যে সুগন্ধযুক্ত ও সুস্বাদু চাল রয়েছে। যেমন-টোপা বোরো। চালটি বাজারে সহজলভ্য এবং এর বাজার দর তুলনামূলক কম।
ইরি হলো আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা কেন্দ্র কর্তৃক উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান বা ওজজও (ওহঃবৎহধঃরড়হধষ জরপব জবংবধৎপয ওহংঃরঃঁঃব). এর আদলে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ১ অক্টোবর গাজীপুরে পূর্ব পাকিস্তান ধান গবেষণা কেন্দ্র বা ঊচজজও স্থাপন করা হয়। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের পর এর নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ ধান গবেষণা কেন্দ্র বা ইজজও (ইধহমষধফবংয জরপব জবংবধৎপয ওহংঃরঃঁঃব)। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই বর্ধিত জনসংখ্যার ভাতের চাহিদা মেটানোর জন্য প্রতিষ্ঠানটি স্বল্প সময়ে উৎপন্ন উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করে যাচ্ছে। আউশ, আমন ও বোরো মওসুমের বিভিন্ন ধরনের ধানের জাত প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে বৈজ্ঞানিক পন্থায় উদ্ভাবন করেছে। স্বল্প সময়ে বেশি ফলন পাওয়া যায় বলে কৃষকেরা এ ধরনের ধানের চাষ করতে আগ্রহী।
এক সময় সিলেট অঞ্চলে স্থানীয় জাতের বিভিন্ন ধরনের ধান চাষ করা হতো। সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় এসব ধানের নাম হলো-বালাম, ময়নাশাইল, মুলাশাইল, জড়িয়া, কার্তিকা, দুমাই, মুরালি, চানমনি, কালিজিরা, পাইজন, কালিমেখরি, বিভিন্ন জাতের বিরইন ইত্যাদি। ময়নাশাইল লালচে বর্ণের ধান। বড় সুস্বাদু, মুলাশাইল আকারে বড় ও প্রায় গোলাকৃতি। জড়িয়া ও দুমাই কালচে বর্ণের। চানমনি প্রায় হলুদ বর্ণের। কালিজিরা কৃষ্ণবর্ণের সুগন্ধযুক্ত ক্ষুদ্রাকৃতি ধান। কাটার পরও এর দন্ডায়মান খড়ে সুগন্ধ মেলে। পাইজন চিকন ও লম্বাকৃতির ধান। এর ভাত ধবধবে সাদা ও সুস্বাদু।
প্রায় এক দশক পূর্বেও ক্ষেত ভরা ছিল এসব জাতের ধান। ধান গাছের পুষ্পমঞ্জুরি বিভিন্ন বর্ণ ধারণ করে বাতাসে সুগন্ধ ছড়াত। পরিপক্ষ হওয়ার পর ধানের শীষ রঙের পূর্ণতা পেত। বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠে বিভিন্ন বর্ণের ধান ক্ষেত শিল্পীর তুলিতে আঁকা ছবির মতো মনে হতো।
আজকাল ফসলের মাঠে বাহারি বর্ণের ধান চোখে পড়েনা। বিলুপ্ত হতে যাচ্ছে স্থানীয় জাতের এসব শস্য কণা। এখন প্রতি বছর ফলানো হয় দু’চার ধরনের আধুনিক ধানের বীজ। একই মাটিতে প্রতি বছর একই জাতের ধান চাষ করা উচিত নয়। তাতে ফলন কমে যায়। উদ্ভিদ মাটি থেকে খাদ্য গ্রহণ করে। উদ্ভিদ ভেদে খাদ্যের তারতম্য রয়েছে। প্রতি বছর একই জমিতে একই জাতের ধান চাষ করলে গাছের খাদ্য ঘাটতি দেখা দেয়। তাই ধানের জাত পরিবর্তন করে চাষ করলে মাটিতে বিদ্যমান সব ধরনের জৈব রাসায়নিক উপাদান (খাদ্য) উদ্ভিদ গ্রহণ করতে পারে। ফলে গাছ পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় ও ফলন বৃদ্ধি হয়। ধান রোপণের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি অনুসরণ করলে ভালো ফল পাওয়া যায়।
গ্রাম বাংলার অতি পরিচিত স্থানীয় জাতের এসব ধান চাষ হ্রাস পেলেও এর বীজগুলো এখনো বিলুপ্ত হয়নি। তাই উন্নত জাতের উচ্চফলনশীল ধান চাষের পাশাপাশি স্থানীয় জাতের এসব ধান চাষ করাও প্রয়োজন। কেননা, স্বাদে, গন্ধে, বর্ণে ও ফলনে বৈচিত্রপূর্ণ এসব ধানের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শীতের শাকের পুষ্টিগুণ
  • জেনে শুনে বিষ করেছি পান
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • Developed by: Sparkle IT