উপ সম্পাদকীয়

যে কথাটি হয়নি বলা

ইনাম চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ১৯-১১-২০২০ ইং ০৯:৩০:৪৭ | সংবাদটি ৭৯ বার পঠিত

বিশ্ব বিজয়ী আলেকজান্ডারকে তার জীবন প্রদীপ নিভে যাবার ঠিক পূর্বক্ষণে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো কে হবে তার যোগ্য উত্তরসুরি? পরিষদবর্গ বীর আলেকজান্ডারকেই সেটা নির্ধারণ করে দেবার অনুরোধ জানান। উত্তরে সেই বিশ্বজয়ী বীর পুরুষটি বলেছিলেন যে হবে সর্বাধিক শক্তিশালী আর সর্বোচ্চ মানের যোগ্যতাসম্পন্ন সেই হবে তার (আলেকজান্ডার) উত্তরসুরী। বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আলেকজান্ডার এর পিতা মেসিডোনিয়ার রাজা ফিলিপ নিজ উত্তরসুরি হিসাবে নিয়োগ দিয়েছিলেন মহাবীর আলেকজান্ডার এর একজন সৎ ভাইকে। সেই ভাইটি সর্বতোভাবে ব্যর্থ হয় নিজ যোগ্যতা প্রমাণে। তার না ছিলো শক্তিমত্তা প্রদর্শনের মতো দক্ষতা, না ছিলো সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। ঘটনাপ্রবাহ আর মতভিন্নতা সবকিছু মিলে পরিশেষে আলেকজান্ডারের দিকেই রাজ্য শাসন কর্মের পাল্লা ভারী হয়ে উঠে এবং সেই গুরুদায়িত্বটি তিনি কাধে তুলে নেন।
আলেকজান্ডার জানতেন কোথায় শক্তি প্রয়োগ করতে হয় এবং কিভাবে সেটিকে কূটনৈতিক বাতাবরণে নৈতিকতার বেড়াজালে আবদ্ধ করতে হয়। তিনি যখন তৎকালীন ভারত অঞ্চলে সৈন্যদল নিয়ে আক্রমণ পরিচালনা করেন। অত্র এলাকার ছোট বড় নৃপতিবৃন্দ বিনাবাক্য ব্যয়ে তার বশ্যতা স্বীকার করে তারই অধীনে নিজ সৈন্যসামন্ত নিয়োজিত করেন। বাধ সাধেন সিন্ধু নদের এপারের এক ছোট্ট রাজ্যের নৃপতি। বীর হিসাবে তার নাম ইতিহাসে আজও উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। সেই নৃপতিটির নাম ছিলো রাজা পুরু। তিনি বিনা যুদ্ধে আলেকজান্ডার এর বশ্যতা স্বীকারে অস্বীকৃতি জানান। সত্যি কথাটি হলো তিনি ছিলেন আসল ও খাঁটি একজন দেশপ্রেমিক। নিজ জনগণ, দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে তিনি সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছিলেন। ক্রোধোন্মন্ত আলেকজান্ডার নিজ বাহিনী ও দোসরদের নিয়ে সিন্ধু নদ অতিক্রম করে পুরুর রাজ্যটি আক্রমণ করতে অগ্রসর হন। শত্রু বাহিনীর সম্মুখীন হয়ে বীর আলেকজান্ডার রাজা পুরুর বিরাট হস্তীবাহিনী দেখে নিজ দলবলসহ সকলেই হতভম্ব হয়ে যান। আলেকজান্ডার এর সহযোগী স্থানীয় নৃপতিরা ছিলেন পুরুর উদ্ধত্যে বেশী উৎকণ্ঠায়। তাদের উৎসাহে ্ও সহযোগিতায় সেই যুদ্ধ পর্বটি অনুষ্ঠিত হয়। অবধারিতভাবে রাজা পুরু ও তার বাহিনীর বিপর্যয় ঘটে। বন্দী পুরু বীর আলেকজান্ডার এর সামনে নীত হলে নিজে (পুরু)কে একজন রাজা হিসাবে দাবী করে সঠিক মর্যাদা প্রত্যাশা করেন। আলেকজান্ডার তার (পুরু) দাবীর ন্যায্যতা আর পুরুর ব্যক্তিত্ব অনুধাবন করতে সমর্থ হোন। তিনি তার রাজ্যটি ফিরিয়ে দেন এবং আলেকজান্ডার রাজা পুরুকে নিজ গভর্নর হিসাবে নিয়োগ দান করেন। আগেই আমি মহাবীর আলেকজান্ডার এর কূটনৈতিক দক্ষতার কথা উল্লেখ করেছি।। রাজা পুরুসে গর্ভণর নিয়োগ, রাজ্যটি ফিরিয়ে দেয়া সবকিছু যেমন আলেকজান্ডার এর বিজয়ীর সম্মান নিশ্চিত করলো তেমনি রাজ্য পুরুর দেশপ্রেম ও শৌর্যবীর্যের স্বীকৃতি ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হতে নিশ্চিত করলো। রাজ্য শাসনে গলাবাজী আর পেশীশক্তি যে মুখ্য নয় বরং কূটনৈতিক দক্ষতারও যে প্রয়োজন সেটিও স্বীকৃত হলো।
অনুরূপ আরেকটি ঘটনায় একজন দুর্ধর্ষ ডাকাতকে বন্দী করে আলেকজান্ডার এর সামনে হাজির করা হলো। ডাকাতকে তার অপরাধ কর্ম সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করলে সে বলেছিল যে তার অপরাধ কর্মটি নিছক গুরুত্বহীন কারণ সে একজন বিশ্ব ডাকাত এর সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ বিশ্ববিজয়ী বীরকে সে একজন ডাকাত হিসাবে আখ্যায়িত করে। আলেকজান্ডারকে উদ্দেশ্য করে সে বলে যে তাকে বন্দী করা হলেও তার জিহ্বাটি বন্দী করা হয়নি অর্থাৎ তার কথা বলার অধিকারটি অক্ষুন্ন আছে। যোগ্যতার অধিকারী বিজয়ী নৃপতি বন্দী ডাকাতকে মুক্ত করে দিয়ে সহায় সম্পদ দান করে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে পূণর্বাসিত করেন। বিজয়ী বীরটি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যতো শক্তিমত্তাই প্রদর্শন করা হউক না কেনো মানুষের বাক স্বাধীনতার হস্তক্ষেপ করা কখনোও বাঞ্চনীয় নয়। ডাকাত এর বাক্যবানে জর্জরিত বিজয়ী নৃপতি কোন প্রতিশোধস্পৃহা প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকেন বরং সেই ডাকাত এর বাক্যবান এর মর্মার্থ অনুভব করে নিজেকে আরও পরিশীলিত করার অনুপ্রেরণা লাভ করেন।
সেই কাল, সেই যুগ কিছুই নেই। মহাবীরদের আস্ফালনও নেই। অন্যদিকে সেই জাতীয় আস্ফালন আর রক্তচক্ষু এখন রয়েছে অন্যরূপে অন্যপন্থায়। এটি কিন্তু আরও ভয়ঙ্করতম উপায়ে। মাত্র একজন ব্যক্তির অঙ্গুলি ইশারায় লুপ্ত হয়ে যেতে পারে পুরো একটি সভ্যতা। এমন মারণাস্ত্র রয়েছে যেগুলির ব্যবহার আংশিক মাত্রায় হলেই এই বিশ্ব মন্ডল তুলার মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে মিলিয়ে যাবে বিশ্বব্রহ্মান্ডে। আগে ছিলো নেতার বা অধিপতির শৌর্যবীর্য এখন হয়েছে নেতা বা অধিপতির ভান্ডারে কি কি অস্ত্র আছে সেটি নিয়ে আস্ফালন। উত্তর কোরিয়া নামক একটি ছোট্ট উপদ্বীপ তার অস্ত্র ভান্ডার ঠিক কতো বড় সেটার জানান না দিয়ে বরং ভয়ঙ্কর সব মারণাস্ত্র তৈরি করেই চলেছে এবং সারা বিশ্বকে আতঙ্কিত করে তুলছে কখনো বা হতভম্ব করে ফেলছে। বিশাল সাম্রাজ্য, বিরাট লোকলস্কর, বিরাট ব্যাপ্তি এসব এখন আর বিবেচনার বিষয় নয়। এখন কে কার সর্বনাশ ঘটায়, কোন জাতি অন্য জাতিকে বিনাশ করতে অগ্রসর হয় সেটাই যেন এখন সর্বোচ্চ ভাবনার কারণ। বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মায়ানমার যাকে কোনদিনই হুমকী হিসাবে ভাবনায় আনা হয়নি সেই রাষ্ট্রটি পর্যন্ত এখন বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকী হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে। রাষ্ট্রটি বিশাল, বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর মায়ানমার রাষ্ট্রটি সবসময় নিজেকে নিয়েই বিভোর ছিলো। তাকে নিয়ে বাংলাদেশের মাথা ঘামানোর কোন ব্যাপার ছিলোনা কিন্তু অন্যদের ছিলো। যে সকল দেশ পররাজ্য লোভী, পরধন লুণ্ঠনে আগ্রহী নতুবা আগ্রাসন নীতির ধ্বজাধারী তাদের শ্যেনচক্ষু কিন্তু মায়ানমারের প্রতি নিবদ্ধ ছিলো যুগ যুগ ধরে। তারা হিসাব কষেছে। লাভলোকসান খতিয়ে দেখেছে। তারপরে মায়ানমার পানে হাত বাড়িয়েছে। উন্নয়নের নামে দেশটিকে পেছনপানে হাটতে বাধ্য করেছে। ঋণ আর উন্নয়ন সহায়তার নামে এটির টুটি চেপে ধরেছে এবং তারপরে তথাকথিত বন্ধু রাষ্ট্রগুলি তাদের মনের কথাগুলি খুলে বলেছে। নিজের দেশের শিল্পাঞ্চলগুলির কারণে আপন ভূমির আকাশ বাতাস কালো ধোয়ায় ছেয়ে রয়েছে তাই তারা মায়ানমার এর বিস্তীর্ণ ভূমিতে আপন শিল্প এলাকা গড়ে তুলতে চায়। তাও আবার নদী ও সমুদ্র সংগ্রামের মতো জায়গায় হতে হবে। অনন্যোপায় হয়ে আবার জাতিগত বিষবাষ্পের অনলে পুড়ে মায়ানমার আরাকান এলাকা খালি করতে শুরু করে। চৌদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করতে হলে অবশ্যই গণহত্যার মতো ঘটনা ঘটাতে হয় এবং সেটা তারা করেছে।
প্রাণরক্ষার তাগিদে দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা এসে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশের আঙ্গিনায়। এখানেও যেন আলেকজান্ডার এর ছায়া দেখতে পাই। যেন পেছন থেকে তিনি কলকাঠি নাড়ছেন। ভারত ও চীন আমাদের কাছে জানের জান অন্যদিকে উদ্বাস্তু হিসাবে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে একেবারে মুখে কুলুপ আটা। এটি বিস্ময়কর। অতি কথন ভালো নয় বলে প্রসঙ্গ পাল্টিয়ে নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এর প্রসঙ্গে আসি। তিনি আপাতদৃষ্টিতে একজন সজ্জন ব্যক্তি। পোড় খাওয়া রাজনীতিক, ব্যক্তি জীবনেও তাকে মোকাবেলা করতে হয়েছে অনেক দুঃখ বেদনার। তাই তিনি একটি অতি ধনশালী, অতি শক্তিধর রাষ্ট্রের কর্ণধার হয়ে কি আচরণ করেন বিশ্বের বাকি দেশগুলির সাথে সেটাই এখন দেখার বিষয়। মনে রাখতে হবে বিশ্বের সমুদয় সম্পদের পঁচিশ শতাংশ এর মালিক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সমরাস্ত্র, সৈন্যবল, কৌশলগত মারণাস্ত্র সবকিছুর ভান্ডার তার কাছে অফুরন্ত। এগুলির নিয়ন্ত্রণ হাতে পেয়ে সজ্জন বাইডেন নিশ্চয়ই দুর্জন হয়ে উঠবেন না। সেই আশা করতে পারি। বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন নিজ দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সব ব্যবস্থাই তিনি নিশ্চিত করবেন।
লেখক : কলামিস্ট।

 

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • স্থানীয় প্রজাতির ধান
  • রায়হান হত্যা : এক ঘটনায় বহু ইঙ্গিত
  • ভাইফোঁটা
  • বিদায় ডোনাল্ড ট্রাম্প
  • Developed by: Sparkle IT