উপ সম্পাদকীয়

সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ

মাওলানা আব্দুল হান্নান তুরুকখলী প্রকাশিত হয়েছে: ২০-১১-২০২০ ইং ১০:৪০:১৯ | সংবাদটি ৬৫ বার পঠিত

গত দুই দশক আগে একটি মাদ্রাসায় এক ছাত্রের আলিম পরীক্ষার নম্বর জানতে গিয়েছিলাম। প্রিন্সিপাল সাহেব টেবুলেশন বের করলেন। ৯০ জন ছাত্র-ছাত্রীর নম্বর দেখলাম। মাত্র ২ জন ছাত্রের একজন পেয়েছে ৮২% নম্বর অপরজন পেয়েছে ৭৩% নম্বর। বাকি ৮৮ জন ছাত্র-ছাত্রীর ৮০ জনের প্রত্যেকেই ৪৫-৫০% নম্বর পেয়ে পাশ করেছে। অবশিষ্ট ৮ জন ফেল করেছে। প্রিন্সিপাল সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম হুজুর এবারে মাদ্রাসার ৯১% ছাত্র-ছাত্রী আলিম পরীক্ষায় পাশ করেছে। এর মধ্যে মাত্র দু’জন ছাত্র যথাক্রমে ৮২% ও ৭৩% নম্বর পেয়ে পাশ করেছে। বাকিরা সবাই ৪৫-৫০% নম্বর পেয়ে পাশ করেছে। মাত্র ২ জন ছাত্র ছাড়া সবাই প্রায় একই নম্বর পেয়ে পাশ করার কারণ কী? তিনি বললেন, যারা ৮২% ও ৭৩% নম্বর পেয়ে পাশ করেছে তারা দু’জনই তাদের নিজেদের মেধা থেকে লিখেছে। আর যারা ৪৫-৫০% নম্বর পেয়ে পাশ করেছে তারা কেবল ‘আব্দুল্লাহ গাইড’ ফলো করেছে। তখন ‘আব্দুল্লাহ গাইড’ বাজারের সস্তা গাইড ছিল। এই সস্তা গাইড সকল ছাত্র-ছাত্রীই কিনেছে, ফলো করেছে। আর এজন্যই তারা সকলে একই নম্বর পেয়ে পাশ করেছে। এই গাইড বই তাদের মেধাকে হরণ করেছে। সকল স্কুল-কলেজ ও ভার্সিটির অবস্থা একই। সকল প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা মানেই যেন গাইড বই হুবহু ফলো করে লিখে দেয়া। এখানে মেধার কোনো বালাই নেই। গাইড বই থেকে লিখে দিলেই হয়ে গেল। এই করুণ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য সরকার সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি ও প্রশ্ন পদ্ধতি চালু করেছে। প্রশ্ন হল-সেই সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি ও প্রশ্ন পদ্ধতির সফল বাস্তবায়ন কি হচ্ছে অথবা কতটুকু হয়েছে?
সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চালু হলে শিক্ষার্থীরা চিন্তাশক্তি দিয়ে বুঝে শিখবে, মুখস্থবিদ্যা এবং নোট গাইড থাকবে না- এমন নানা আশার কথা শোনানো হলেও বাস্তবে এখনো এই শিক্ষার চর্চা ঠিকমতো হচ্ছে না। আর হবেই বা কীভাবে; প্রায় অর্ধেক শিক্ষকই তো এখনো এ বিষয়ে দক্ষ নন। আরও আশংকার কথা হলো, সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতির চর্চা দিনে দিনে যেখানে উন্নতি হবার কথা ছিল, সেখানে অবনতিই হচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক অধিদপ্তর (মাউশি) এর সর্বশেষ তদারকি প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ৪৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ বিদ্যালয়ের শিক্ষক এখনো সঠিকভাবে সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন করতে পারছেন না। এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অন্যান্য বিদ্যালয়ের সহায়তায় কিংবা বাইরে থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেন। এই পদ্ধতিতে শিক্ষকদের সঠিকভাবে প্রশ্ন প্রণয়ন করার হার দেড় বছরের ব্যবধানে প্রায় ৩ শতাংশ কমেছে। এই সমস্যার মূল কারণ সকল শিক্ষক পর্যাপ্ত যোগ্য নন। সবাই বি.এড কোর্সও করতে পারছেন না। আবার সৃজনশীলের প্রশিক্ষণ সবাইকে দেয়া হয়নি। আবার অনেকে সৃজনশীলের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন কিন্তু নিয়মিত চর্চা করেন না। শিক্ষকরা যেখানে এ বিষয়ে চর্চা করেন না সেখানে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েই বা লাভ কী?
করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে গত ১৭ মার্চ থেকে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে দেশের ৯ হাজার ৯৩০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয় তদারক সর্বশেষ ‘একাডেমিক সুপারভিশন প্রতিবেদন’ তৈরি করে মাউশি। বর্তমানে দেশে মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে ১৮ হাজার ৫৯৮টি। মোট বিদ্যালয়ের ৫৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ তদারক করা হয়। দেশে ২০০৮ সালে মাধ্যমিক পর্যায়ে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়। পরে ২০১২ সালে প্রাথমিক স্তরেও যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্ন (সৃজনশীল) পদ্ধতি চালু করা হয়। তখন নীতি নির্ধারকেরা বলেছিলেন, এই পদ্ধতি চালু হলে মুখস্থবিদ্যা কমবে এবং শিক্ষার্থীদের বুঝে শেখার দক্ষতা বাড়বে। কিন্তু শুরু থেকেই এই পদ্ধতির প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক চলছে। কারণ যেখানে শিক্ষকরা সৃজনশীল পদ্ধতিতে পাঠদান করতে পারছেন না, সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশ্ন তৈরি করতে পারছেন না সেখানে শিক্ষার্থীদেরকে কী শেখানো হবে- তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এই করুণ অবস্থা হচ্ছে মাধ্যমিক স্তরের। প্রাথমিক স্তরের অবস্থা আরও নাজুক। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিংহভাগ মহিলা শিক্ষকের যোগ্যতা এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি। এদেরকে সৃজনশীল পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ দিলেও নানা কারণে এরা তা চর্চা করেন না এবং প্রয়োগ করেন না। ফলে শিক্ষায় সৃজনশীল পদ্ধতিটি বাস্তবায়িত হচ্ছেই না।
জাতীয় উন্নয়নের সকল ক্ষেত্রে মানসম্মত শিক্ষার বিকল্প নেই। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার অনন্য মাধ্যম হচ্ছে সৃজনশীল পদ্ধতির পূর্ণ বাস্তবায়ন করা। তাই শিক্ষাক্ষেত্রে সরকার প্রবর্তিত সৃজনশীল পদ্ধতির পূর্ণ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসা আমাদের সকলের উচিত।
লেখক : প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • স্থানীয় প্রজাতির ধান
  • রায়হান হত্যা : এক ঘটনায় বহু ইঙ্গিত
  • Developed by: Sparkle IT