উপ সম্পাদকীয়

করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি

দুলাল শর্মা চৌধুরী প্রকাশিত হয়েছে: ২০-১১-২০২০ ইং ১০:৪১:২৩ | সংবাদটি ১০২ বার পঠিত

আসছে শীতে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। করোনাভাইরাসের প্রকোপ প্রথম ধাপের চেয়ে বেশি হতে পারে বলে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে। তার কারণ বিশেষজ্ঞরা ব্যাখ্যা করে বলেছেন রোগটির ধরন শীতে বদলে যাবে যার ফলে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটতে পারে। শীতকালের মৌসুমি ফ্লু’র সঙ্গে কোভিড ১৯-এর চাপ যুক্ত হলে ইউরোপে গভীর বিষাদের ছায়া নেমে আসতে পারে। বাংলাদেশও প্রথম সংক্রমণ পৌঁছেছিল ইউরোপের কয়েক সপ্তাহ পর। দ্বিতীয় ঢেউয়ের ক্ষেত্রেও সেই একই ধারায় ফিরে আসার আশঙ্কাই বেশি। কিন্তু প্রস্তুতি প্রথম দফার মতো হলে তার পরিণতি গুরুতর হতে বাধ্য। তাই এখন থেকেই করোনার দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবেলা করার সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। সেই সাথে মানুষের মধ্যে দ্বিতীয় করোনা ঢেউয়ের ভয়াবহতা সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। ঘরে বাহিরে মাস্ক পরাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
ইতিমধ্যেই সারাদেশে করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেছে। সেই সাথে বাড়ছে মৃত্যুর হারও। এখন পর্যন্ত সারাদেশে করোনায় মৃত্যু হয়েছে ছয় হাজারেরও বেশি মানুষের। আক্রান্তের সংখ্যা লাখের উপরে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত, করোনা বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য বেশি ঝুঁকির। তাই তাদের সব থেকে বেশি সাবধানে থাকতে হবে। এ প্রসঙ্গে রোগতত্ত্ব রোগনিয়ন্ত্রক ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানী ডা. এসএসএম আলমগীর সোজাসাফটা বলেন- টিকা আসুক, বা না আসুক, আমাদের আরও দীর্ঘদিন নিজের এবং অন্যের সুরক্ষায় মাস্ক ব্যবহার, সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। এক সঙ্গে এ তিনটি বিষয় পালন করলে টিকার সমান উপকার পাওয়া যাবে। সেই সাথে উষ্ণ গরম জল গলায় নিয়ে গড়গড়ি দিতে হবে সঙ্গে লবঙ্গ-আদা দিয়ে রং চা খাওয়া।
ইতিমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মন্ত্রিসভা বৈঠকে নির্দেশনা দিয়েছেন, করোনাভাইরাস মহামারীর মধ্যে মাস্ক না পড়লে সরকারি-বেসরকারি অফিসগুলিতে ঢোকা যাবে না, কোনো সেবা পাওয়া যাবে না। ‘নো মাস্ক-নো সার্ভিস’। এরপরও মানুষের মধ্যে মাস্ক পড়ার সচেতনতা লক্ষ্য করা যায়নি। আমি নিজে শহরের রাস্তায়, গাড়ি, সিএনজি, মোটর সাইকেল, রিকশা, অফিস, আদালত, দোকানে মার্কেটে মাস্ক না পরা মানুষের সংখ্যাই বেশি দেখেছি। যে যেভাবে পারছে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আমি কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তার উত্তরে যা জানলাম তা হলো মাস্ক পড়ে লাভ কি? আমাদের করোনায় কিছু করতে পারবে না? পরতে ভালো লাগে না? আমি তাদের বললাম আপনার কিছু না হোক অন্যের তো কিছু হতে পারে। আপনি তো আপনার পরিবার-পরিজনকেও ঝুঁকির মধ্যে রাখছেন। দয়া করে ঘরের বউ, মা, ছেলে, মেয়ের কথা চিন্তা করে এখন থেকে মাস্ক ব্যবহার করুন। দামও নাগালের মধ্যে মাত্র পাঁচ টাকা একটি কিনে পরতে অসুবিধা কি। আমি পড়বো না তাতে আপনার কি। ভেবেছিলাম একটা কষে চড় বসিয়ে দেই। তবে মাথা ঠান্ডা রেখে নিজেকে সামলে নেই। বিদেশে করোনায় মানুষ মারা যাচ্ছে, আক্রান্ত হচ্ছে জেনেও আমাদের দেশের কিছু মানুষ স্বাস্থ্যবিধি মানতে চায় না। স্বাস্থ্যবিধি মান্য ও মাস্ক পরার ব্যাপারে একবারেই উদাসীন। ইতিমধ্যেই ইউরোপের বেশকটি দেশে লকডাউন দিয়ে দিয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সকল রাষ্ট্রে সংক্রমিত ও মৃত্যুর মিছিল থামেনি, চলছেই। চীনে থেমে গিয়ে আবার সংক্রমণ শুরু হয়েছে, ওরা ওদের বেশ কয়েকটি জনপদকে লক ডাউনের আওতায় এনেছে।
প্রথমদিকে ধারণা করা হয়েছিল ৭০ এর উর্ধ্ব ব্যক্তিরা এর প্রধান শিকার, পরে দেখা গেল তা ঠিক নয়। এটি সববয়সী মানুষের জন্য ভীতিকর। তবে গবেষণায় দেখা যাচ্ছে মহিলাদের চেয়ে পুরুষরাই আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। আক্রান্তের হার ৬৫-৩৫। মহিলাদের দেহে নিঃসৃত ইস্টোজন হরমোন তাদেরকে এই রোগ প্রতিরোধে সহায়ক হয়।
কোভিডে আক্রান্তের লক্ষণগুলো হলো, জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, শীতবোধ, বারবার শীতের কাঁপুনি, পেশি ব্যথা, মাথা ব্যথা, গলাব্যথা এবং জিহ্বার স্বাদ ও নাকের ঘ্রাণ কমে যাওয়া। কারো কারো ক্ষেত্রে ডাইরিয়া, ক্ষুধামান্দা, পেটব্যথা ও বমি বমি ভাব দেখা দিতে পারে। যাদের হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ফুসফুসের স্থায়ী রোগ ও উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে তাদের ব্যাপারে অধিক সতর্ক থাকতে হবে। এই রোগে নাক দিয়ে জলপড়া, হাঁচি ও গলাব্যথা খুব কম। পায়ের আঙ্গুল নীল হওয়া ও পায়ে আমের মত রেশ হওয়ার লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
কোভিড ১৯-এর আক্রমণে মৃত্যু হয় কেন? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ভাইরাস আমাদের দেহে নানা সমস্যা সৃষ্টি করে। ভাইরাস শ্বাসনালি ধরে নেমে ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটালেই সমস্যা দেখা দেয়। সাধারণ কোষের তুলনায় ফুসফুসের কোষে, এসি-২ গ্রাহী কোষের সংখ্যা বেশি। কোভিড ১৯-এর জন্য ফুসফুসের অনেক কোষ নষ্ট হয়ে যায়, অনেক কোষ ভেঙে যায়, ফলে ফুসফুস ভাঙা কোষে ভরে যায়। তখন আক্রান্ত রোগীকে ইনটেনসিভ কেয়ার বা নিবিড় পরিচর্যা ব্যবস্থায় রাখা হয়। কখনোও অবস্থা খারাপের দিকে যায়।
আমাদের উপমহাদেশে সংক্রমণ ছড়িয়েছে সেই সাথে মৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, তবে ঘনবসতিপূর্ণ বলে মহামারিতে তীব্রতা যতটা আশঙ্কা করা হয়েছিল, সৌভাগ্যক্রমে সে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম ছিল। তবে স্বস্তিবোধ করার কোনও কারণ নেই। এই শীতে দ্বিতীয় ধাক্কার দিনগুলি কেমন হবে সে ভবিষ্যবাণী করা কঠিন। যেহেতু এখনও মহামারীর কোনও কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি, কাজেই দিন যাপন প্রণালীতে রদ-বদল করতে হচ্ছে খাদ্যভাস, সংযোজন করতে হচ্ছে রোগ প্রতিরোধমূলক ভেষজগুণ সম্পন্ন মসলা, শাকসবজি, ফলমূল। মহামারীর অবসান ঘটবেই আমাদের প্রিয় গ্রহ থেকে, তারজন্য আমাদেরও স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে ঘরে বাহিরে মেনে চলতে হবে। যে সব জায়গায় মানুষের পদচারণা বেশি যেমন- কারখানা, হাসপাতাল, অফিস-আদালত সেখানেই সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিদেশী মানুষ ও প্রবাসীরা দেশে এলে তার পৃথকীকরণের ব্যবস্থা থাকতে হবে। যেন নতুন মানুষ সমাজের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। সে ব্যাপারে সরকারের কর্মসূচি থাকতে হবে এবং হাসপাতাল, ক্লিনিক, নার্সিং হোমের মত জায়গাতে বিশেষভাবে নজরদারী নিশ্চিত করতে হবে। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি করোনা নামক এক ভয়ঙ্কর মহামারীর কবলে মানবসভ্যতা এখন সমূহ সংকটের সম্মুখীন। আমাদের এই মহাসংকট থেকে উদ্ধার করো, আমাদের করুণা করো, দয়া করো।
প্রার্থনা করি কেটে যাক এ অমানিশা, ফিরে আসুক আলোকোজ্জ্বল সকাল।
লেখক : প্রাবন্ধিক।

শেয়ার করুন
উপ সম্পাদকীয় এর আরো সংবাদ
  • শীতের শাকের পুষ্টিগুণ
  • জেনে শুনে বিষ করেছি পান
  • চলে গেলেন ফেলুদা
  • ফিরে দেখা ট্রাম্পের চার বছর
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • পাল্টে যাচ্ছে সিলেট নগরীর চেহারা
  • বেকার সমস্যা সমাধানে মহাপরিকল্পনা
  • বাইডেনের জয় ও ট্রাম্প সমাচার
  • স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও একজন দাতা ভিক্ষুক
  • মার্কিন নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে আমাদের শিক্ষা
  • দর্শন দিবসের প্রাসঙ্গিকতা
  • শিশুর বই পড়া ও অন্যান্য প্রসঙ্গ
  • পাল্টে যাচ্ছে শাবি ক্যাম্পাসের চিত্র
  • প্রসঙ্গ : চিকিৎসা-বাণিজ্য
  • করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ও প্রস্তুতি
  • সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি প্রসঙ্গ
  • যে কথাটি হয়নি বলা
  • জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও শিক্ষার উন্নয়ন
  • চিকিৎসার নামে নির্যাতন ও আমাদের মূল্যবোধ
  • Developed by: Sparkle IT