সিলেটে ভ্যাপসা গরমেও ঘন ঘন লোডশেডিং
কুমারগাঁও ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বিকল
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ জুলাই ২০২৫, ১:৪২:৫৪ অপরাহ্ন
আনাস হাবিব কলিন্স :
সিলেটে আবারও বিদ্যুতের লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। ভ্যাপসা গরমের মাঝে ঘন ঘন লোডশেডিং নিয়ে জনমনে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লোডশেডিং এর অন্যতম কারণ কুমারগাঁও ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বিকল থাকা। তাছাড়া, জাতীয় গ্রীড থেকেও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় গ্রাহকরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
এদিকে, গতকাল শুক্রবার লোডশেডিং না থাকলেও গত কয়েকদিন থেকে কখনও দিনে আবার কখনও রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং এর কবলে পড়ে নাকাল সিলেটবাসী । পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন গ্রাম এলাকাগুলোতেও চরম বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে। বড়লেখায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা লোডশেডিং বন্ধের দাবিতে গতকাল শুক্রবার মানববন্ধন করেছেন।
বিদ্যুৎ বিভাগের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি’র পদযাত্রার দোহাই দিয়ে গতকাল শুক্রবার সিলেট জুড়ে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। তবে, পরবর্তী দিনগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে শংকার কথা জানায় ওই সূত্রটি।
জানা গেছে, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কুমারগাঁও ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বিকল হয়ে পড়ে আছে। ফলে, বিদ্যুৎ সরবরাহে এর প্রভাব পড়ছে পুরো সিলেট জুড়ে। তাছাড়া, জাতীয় গ্রীড থেকেও সরবরাহ কম হওয়ায় নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি’র) সিলেট অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদির জানান, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তোরণে কাজ চলছে। দ্রুত সমস্যা সমাধান হবে বলেও জানান তিনি।
ভুক্তভোগিরা জানিয়েছেন, চলমান এইচএসসি পরীক্ষার মধ্যে সম্প্রতি বিদ্যুতের লোডশেডিং বাড়ায় তারা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে রাতের বেলা লোডশেডিংয়ের মাত্রা বাড়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ ঝাড়ছেন।
নগরীর জিন্দাবাজারস্থ রাজাম্যানশনের ব্যবসায়ী সুবিল জানান, লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় কাজকর্ম কমে গেছে। কোন বিষয়ে কম্পোজ শুরু করলে সেটি শেষ করার আগেই চলে যাচ্ছে বিদ্যুৎ। পুনরায় বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকছে না।
লাকড়িপাড়ার এইচএসসি পরীক্ষার্থী এহসানুল হক অভি জানান, পরীক্ষার মুহুর্তে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট লেখাপড়ায় বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। তাছাড়া, বিদ্যুতের অভাবে ফ্যান, এসি ঠিকমতো চালাতে না পারায় বিভিন্ন অসুখবিসুখ দেখা দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
এদিকে, সিলেট নগরীসহ গ্রামাঞ্চলের ব্যবসায়ীরও বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তারা বলছেন ‘খোড়া’ অজুহাতে প্রায়ই সিলেটবাসী বিদ্যুৎ বিড়ম্বনার মধ্যে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতি তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটাচ্ছে বলেও জানান।
বিদ্যুৎ বিভাগ সংশ্লিষ্টরা জানান, সিলেট মহানগরীসহ আশপাশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কুমারগাঁও ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। সেটি এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ থাকায় সরবরাহে চাপ পড়ছে। ফলে, দেখা দিয়েছে লোডশেডিং এর মাত্রা। এই বিষয়ে ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের সাথে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় তার মুঠোফোনে আলাপ করলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রটি বন্ধ থাকার কথা স্বীকার করেন। তবে, ক’দিন ধরে বন্ধ আছে তা জানতে অফিস চলাকালীন সময়ে সাক্ষাতের পরামর্শ দেন তিনি।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এর বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-৩ এর নির্বাহী প্রকৌশলী শ্যামল চন্দ্র সরকার জানান, ২২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বিকল হওয়ায় তারা প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সমস্যা পোহাচ্ছেন। উদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবেলায় ফেঞ্চুগঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। যার কারণে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পল্লী বিদ্যুৎ-১ এর জেনারেল ম্যানেজার আব্দুর রশিদ জানান, পল্লী বিদ্যুৎ-১ এর আওতাধীন এলাকায় প্রতিদিনের চাহিদা ১১৩ মেগাওয়াট। গত কয়েকদিন ধরেই চাহিদার তুলনায় সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এতে করে গ্রাহকরা দুর্ভোগে পড়েছেন। তবে, গতকাল শুক্রবার বিদ্যুৎ সরবরাহে কোন ত্রুটি নেই বলে দাবি করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে বিপিডিবি’র সিলেট অঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদির আরো জানান, গতকাল শুক্রবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট না থাকলেও আগের কয়েকদিন চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় লোড শেডিং হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার সিলেট বিভাগে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ৭শ’ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় দেড়শ’ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি ছিল ।
এদিকে, মৌলভীবাজারের বড়লেখায় ঘন ঘন লোডশেডিং বন্ধ ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) খায়রুল বাকিকে অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে বড়লেখা পৌরশহরের শহীদ মিনার প্রঙ্গণে ‘বড়লেখা উপজেলার সর্বস্তরের নাগরিকবৃন্দ’ ব্যানারে এই কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, গত কয়েকদিন ধরে বড়লেখায় ঘন ঘন লোডশেডিং হচ্ছে। গরমের তীব্রতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন। তারা অবিলম্বে লোডশেডিং বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ ও ডিজিএম খায়রুল বাকিকে অপসারণের দাবি জানান। অন্যথায় আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাওসহ কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন। মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান পরিষদের সভাপতি সাইফুল আলম রাসেল, আয়োজক শরীফ উদ্দিন ইমন, স্বপন আহমেদ খান, ফাহাদ আহমেদ, কামরান আহমেদ, রুবেল আহমেদ, আব্দুল ওদুদ, কাওসার আহমেদ ও ব্যবসায়ী মুমিন মিয়া প্রমুখ।




