রিফান্ড না করতে আজ মন্ত্রণালয়ে অনুরোধপত্র দিচ্ছে আটাব
তিনটি ট্রাভেল এজেন্সির ভূমিকায় আতংকিত ব্যবসায়ীরা
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৪ আগস্ট ২০২৫, ৩:৪৫:২৪ অপরাহ্ন
ফ্লাইট এক্সপার্টের মালিক-সিইও কানাডা নাকি দুবাই পালিয়েছেন!
স্টাফ রিপোর্টার ॥ অনলাইন টিকিট বুকিংয়ে দেশের অন্যতম প্ল্যাটফর্ম ‘ফ্লাইট এক্সপার্ট বাংলাদেশ (এফইবিডি)’ বন্ধ হওয়ার পর তিন ট্রাভেল এজেন্সির ভূমিকা নিয়ে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা। ফ্লাইট এক্সপার্টের মাধ্যমে আগাম কেটে রাখা উড়োজাহাজের টিকিট রিফান্ড করা শুরু করেছে ওই তিনটি ট্রাভেল এজেন্সী। এ তিনটি এজেন্সী এরই মধ্যে কয়েক কোটি টাকার রিফান্ড করে নিয়েছে বলে ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে। এদিকে, ইস্যুকৃত টিকেট রিফান্ড না করতে আজ মন্ত্রণালয়ে অনুরোধপত্র দেবে আটাব।
ফ্লাইট এক্সপার্টের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকা কোম্পানিগুলোর সূত্রে জানা গেছে, কোম্পানিটি নিজেদের আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ) নম্বর ছাড়াও অন্য বেশ কয়েকটি কোম্পানির আইএটিএ নম্বর ব্যবহার করে টিকিট কাটত। নিজেদের প্রতিষ্ঠান মক্কা ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলস ছাড়াও ফ্লাইট এক্সপার্ট হাজী ট্রাভেলস, প্রমা ওভারসিজ ও সোমা ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে টিকেট ইস্যু করতো। জাতীয় পতাকাবাহী বাংলাদেশ বিমান কেবল মক্কা ট্যুরস এন্ড ট্রাভেলসের টিকেট রিফান্ড ব্লকড (বন্ধ) রাখলেও বাকি ট্রাভেল এজেন্সীগুলো গ্রাহকদের ইস্যুকৃত টিকেটগুলো দেদারসে রিফান্ড করে ফেলছে। এ ব্যাপারে ঢাকাস্থ বিমানের একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, তারা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। এদিকে, দেশের বেশ কিছু ছোট ও মাঝারি টিকিট বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান চরম বিপাকে পড়লেও এ নিয়ে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তেমন মাথাব্যথা নেই। এমনকি এ বিষয়ে গতকাল রোববার রাত পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোন বিবৃতি কিংবা প্রেস নোটও ইস্যু করা হয়নি। গতকাল রোববার সকালে এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জনৈক অতিরিক্ত সচিব বলেন, তারা গ্রাহকদের সুরক্ষার জন্য কাজ করছেন। পাশাপাশি অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সী (ওটিএ) নীতিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। ফ্লাইট এক্সপার্টের সাথে সংযুক্ত অনেক এজেন্সী রিফান্ডের অর্থ তুলে নিয়ে যাচ্ছে-বিষয়টি তার নজরে আনা হলে তিনি জানান, তারা বিষয়টি দেখছেন। বিভিন্ন মিডিয়ার সাথে আলাপকালে অন্তত ৬৯ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, তাদের ২৭ কোটি টাকার বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এর বাইরেও ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
ফ্লাইট এক্সপার্ট বন্ধ হয় গত শনিবার। কয়েকটি ছোট ও মাঝারি টিকিট বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়, এদিন রাতেই ফ্লাইট এক্সপার্টের মাধ্যমে আগাম কেটে রাখা উড়োজাহাজের টিকিট রিফান্ড করা শুরু করে সোমা ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি বড় টিকিট বিক্রেতা এজেন্সি। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে ছোট ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো। টিকিটের দাম বাবদ ফ্লাইট এক্সপার্টকে পরিশোধ করা টাকা ফেরত পাওয়া নিয়েও তারা অনিশ্চয়তায় রয়েছে। আবুল হোসেন নামে একজন ভুক্তোভোগীর বরাত দিয়ে ওই দৈনিকের অনলাইন ভার্সনের রিপোর্টে বলা হয়, ‘সোমা কেন গত শনিবার রাতে অফিস বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে ভিতরে বসে সব পিএনআর (যাত্রীদের নামের রেকর্ড) রিফান্ড করছে? সেই জবাব ওপেন দিতে হবে।
তারা কেন অপেক্ষা করল না? তারা কেন সবার সাহায্য চাইল না?’
আবুল হোসেন আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই স্ক্যামিংয়ের (ফ্লাইট এক্সপার্ট বন্ধ হওয়া) বিষয়ে ওরা জানত। না হলে লুকিয়ে এসব কাজ করবে কেন?’
এদিকে, হাজী ট্রাভেলস এবং প্রমা ওভারসিজও গতকাল রোববার থেকে টিকেট রিফান্ড শুরু করেছে। যেসব গ্রাহক তাদের সাথে যোগাযোগ করছেন, সেসব গ্রাহকের কাছ থেকে দ্বিতীয় দফায় টাকা নিয়ে তারা টিকেট অ্যালাইভ (সচল) রাখছে। একটি সূত্র জানায়, প্রমা ওভারসিজ ও হাজী ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী হচ্ছেন-নির্মল চন্দ্র বৈরাগী। এ বিষয়ে জানতে নির্মল চন্দ্রের সেলফোনে ফোন দেয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে, প্রমা ওভারসিজের অন্য একজন কর্মী জানান, ফ্লাইট এক্সপার্ট তাদের দেনা পরিশোধ করেনি। এজন্য তারা টিকেট রিফান্ড করছেন। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান (নির্মল চন্দ্র) অসুস্থ আছেন বলে জানান এ কর্মী।
ফ্লাইট এক্সপার্টের মালিক-এমডি’র গন্তব্য কানাডা অথবা দুবাই!
ফ্লাইট এক্সপার্টের সিইও (সম্রাটের ছেলে) সালমান বিন রশিদ শাহ সায়েম ও তার বাবা এম এ রশিদ শাহ সম্রাট কানাডায় নাকি দুবাইয়ে পালিয়েছেন-তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মী জানান, সালমানের স্ত্রী সন্তান-সম্ভবা। ৬ মাস আগে তিনি কানাডায় যেতে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের টিকেট কাটেন। গত শুক্রবার রাতে দেশ থেকে পালিয়ে যাবার আগে সালমান ও তার স্ত্রী এমিরেটস এয়ারলাইন্সের টিকেট কেটে দেশ থেকে পালিয়ে যান। সূত্রমতে, সালমানের ভায়রা ভাই হচ্ছে জুবায়ের। সালমানকে দেশত্যাগে সহায়তা করে সে। তাঁর (জুবায়ের) বাসা হচ্ছে পুরান ঢাকায়। সে ফ্লাইট এক্সপার্টের ভিসা সেকশনের প্রধান ছিল। এর আগে গত শুক্রবার সকালে সালমানের বাবা-মা দেশত্যাগ করেন। এ অবস্থায় তারা দুবাইয়ে নাকি কানাডায় গেছেন-তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে মতিঝিল থানার ওসি মেজবাহ উদ্দিনের কাছে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, পিতা-পুত্রের গন্তব্য তাদের এখনো অজানা। তারা বিষয়টি তদন্ত করছেন।
অন্য একটি সূত্র জানায়, গতকাল রোববার প্রমা ওভারসিজের টিকেট রিফান্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল জুবায়ের নামের এক ব্যক্তি। সালমানের ভায়রা ভাই-এই জুবায়ের কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি সিলেটের ডাক।
ফ্লাইট এক্সপার্ট দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের টিকিট বুকিং, হোটেল রিজার্ভেশন (কক্ষ সংরক্ষণ), ট্যুর প্যাকেজ ও ভিসা প্রক্রিয়াকরণের মতো সেবা দিত। বিশেষ করে কম খরচে সহজে টিকিট বুকিংয়ের সুবিধার কারণে প্ল্যাটফর্মটি জনপ্রিয় ছিল। গত শনিবার প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে যায়।
ফ্লাইট এক্সপার্টের কর্মকর্তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে মালিকপক্ষ দেশ ছেড়েছে। এতে গ্রাহক ও সরবরাহকারীদের কোটি কোটি টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। যদিও ফ্লাইট এক্সপার্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সালমান বিন রশিদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, টাকা নিয়ে পালানোর অভিযোগ মিথ্যা। ফ্লাইট এক্সপার্ট বন্ধের খবরে শোরগোল তৈরি হয়। টিকিট বিক্রেতা ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠানটির মতিঝিলের কার্যালয়ে ভিড় করে।
ভুক্তোভোগীরা জানিয়েছেন, গতকাল রোববার সকাল থেকে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে কাটা অনেক টিকিট যাত্রীদের নামের রেকর্ডে (পিএনআর) তাঁরা দেখতে পাচ্ছেন না।
টিকেট রিফান্ড না করতে আজ মন্ত্রণালয়ে অনুরোধপত্র দেবে আটাব
অবশ্য এজেন্সিগুলো যেন টিকিট রিফান্ড করতে না পারে, সে বিষয়ে আজ সোমবার মন্ত্রণালয়ে একটি অনুরোধপত্র দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সভাপতি আবদুস সালাম আরেফ। তিনি বলেন, টিকিট বিক্রি হয়ে যাওয়ার পর সেটির মালিক যাত্রী। কেউ রিফান্ড করে থাকলে যাত্রী যদি অভিযোগ দেন, তাহলে সরকার সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নিতে পারে। তিনি বলেন, ভুক্তভোগীদের কাছে তাঁরা তথ্য-উপাত্ত চেয়েছেন। সেগুলো এক সঙ্গে করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এ ঘটনায় আটাবের পক্ষ থেকে ফ্লাইট এক্সপার্টের মালিককে কারণ দর্শানোরে নোটিশ দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ফ্লাইট এক্সপার্টের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল এমন ৬৯টি টিকিট বুকিং
ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে নিজেদের তথ্য জানিয়েছে।
তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ৬৯ ব্যবসায়ীর ২৭ কোটি ৩৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে এর পাশাপাশি অগ্রিম টিকিট কাটার জন্য অনেক এজেন্সি ফ্লাইট এক্সপার্টের ‘ওয়ালেটে’ টাকা জমা রাখত। সেই টাকা ফেরত পাওয়া নিয়েও ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
সিলেটের একজন ভুক্তভোগী জানান, তাঁর এজেন্সীর প্রায় দেড় লাখ টাকা ফ্লাইট এক্সপার্টের ডিজিটাল ওয়ালেটে থেকে গেছে। এই টাকা ফেরত পাবেন কি না, তা তিনি জানেন না।
যাত্রীর নামে ইস্যু হওয়া টিকিট যাত্রীর অনুমতি ছাড়া রিফান্ড কেন হলো, এমন প্রশ্ন তোলেন ফ্লাইট ইওরস ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গিয়াস ইউ আহমেদ। তিনি বলেন, আপদকালে সবগুলো এয়ারলাইন্সকে বাধ্য করা উচিত কোনো যাত্রীর অনুমতি ছাড়া তাঁর টিকিট বাতিল বা কোনো পরিবর্তন যেন না আনা হয়।
গ্রেফতার তিনজন কারাগারে
রাজধানীর মতিঝিল থানায় গত শনিবার রাতে ফ্লাইট এক্সপার্টের বিরুদ্ধে গ্রাহকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেন এক ভুক্তভোগী। রাতেই ফ্লাইট এক্সপার্টের তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারকৃত তিনজন হলেন এজেন্সির হেড অব ফিন্যান্স সাকিব হোসেন (৩২), চিফ কমার্শিয়াল অফিসার সাঈদ আহমেদ (৪০) ও চিফ অপারেটিং অফিসার এ কে এম সাদাত হোসেন (৩২)। গতকাল রোববার তাঁদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত। মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিন দুপুরে সিলেটের ডাককে বলেন, বিপুল সরকার নামের এক গ্রাহক গত শনিবার রাতে মতিঝিল থানায় মামলাটি করেন। এতে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেফতার তিনজনকে ৭ দিনের রিমান্ডে নেয়ার আবেদন করা হবে। বাকি দুজন আসামি হলেন ফ্লাইট এক্সপার্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সালমান বিন রাশিদ শাহ সাঈম ও তাঁর বাবা এম এ রাশিদ। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন ওসি।




