ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস আজ
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ আগস্ট ২০২৫, ৩:১৬:০৪ অপরাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার। ঐতিহাসিক ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ আজ। সারাবিশ্ব এ দিন দেখেছিল এক অভাবনীয় গণঅভ্যুত্থান। ছাত্র-জনতার ক্ষোভের বিস্ফোরণে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ থেকে পালিয়ে যান। অবসান হয় তার ১৫ বছরের শাসনের।
এ যেন এক নতুন বিজয়ের দিন! এই দিনটি পরবর্তীকালে ‘৩৬ জুলাই’ নামে পরিচিতি পায়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রী, অনুগামী-অনুসারীরাও আত্মগোপন করেছিলেন অথবা পালিয়ে গিয়েছিলেন। এদিন দুঃশাসন ও অপশাসনের অবসান ঘটায় জাতি মুক্তির নিঃশ্বাস নেয়ার সুযোগ পায়।
ফ্যাসিস্ট শাসনে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব মারাত্মক হুমকির মুখে পতিত হয়েছিল। ভারতীয় আধিপত্যবাদ সর্বত্র প্রতিষ্ঠা লাভকরেছিল। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিজয়ই নিশ্চিত করে না, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে বিজয়ও নির্দেশ করে। এদিনে ফ্যাসিস্ট হাসিনারই পরাজয় হয় না, পরাজয় হয় ভারতীয় আধিপত্যবাদেরও। এ বিজয়ের কৃতিত্ব প্রথমত, তরুণদের, দ্বিতীয়ত গোটা দেশের মুক্তিপ্রত্যাশী মানুষের।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে দেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। মুক্তিযুদ্ধে তরুণদের ভূমিকা ছিল অগ্রবর্তী ও গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা আন্দোলন থেকে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সকল জাতীয় আন্দোলন-সংগ্রামে তরুণরা অদম্য ভূমিকা রেখেছে। তারুণ্যের জয় অবশ্যম্ভাবী, দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে তা প্রমাণিত। জুলাই গণআন্দোলন ও অভ্যুত্থানেও একই ইতিহাস রচিত হয়েছে। সরকারি চাকরিতে অযৌক্তিক কোটাপ্রথা সংস্কারের দাবিতে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। সেই আপাত অরাজনৈতিক ছাত্র আন্দোলন যে এক সময় দেশব্যাপী গণআন্দোলনে রূপ নেবে এবং সেই গণউৎক্ষেপ স্বৈরাচারকে হটিয়ে দেবে, তা তখন কেউ কল্পনা করতে পারেনি। ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যা কেউ আগে কল্পনা করতে পারে না।
অথচ শেষ পর্যন্ত সেই কল্পনাতীত ঘটনাটিই ঘটে যায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানও তেমনি একটি ঘটনা। ছাত্রদের আন্দোলন বাড়তে বাড়তে গণআন্দোলনে রূপ লাভ করে, যা পরে অভ্যুত্থানের আকারে স্বৈরাচারকে ভাসিয়ে দেয়। পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান এক-দেড় মাসের আন্দোলন বা প্রতিক্রিয়ার ফল নয়। এর পেছনে আছে সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে জমে থাকা জনক্ষোভ। ৫ আগস্ট সম্মিলিত জনক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
দিবসটি পালনে সিলেটসহ সারা দেশে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আজ সরকারি ছুটির দিন। জাতীয়ভাবে উদযাপন করা হবে দিবসটি। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস আজ বিকাল ৫টায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করবেন। সবার অংশগ্রহণে জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করা হবে।
বাংলাদেশ টেলিভিশন অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করবে। এদিকে, দিবসটি পালনে ৬৪ জেলায় জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে আজ সকাল ৯টায় পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হবে। সারা দেশের প্রতিটি ধর্মীয় উপাসনালয়ে মোনাজাত ও প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে। একই সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষ ‘বিজয় মিছিল’ নিয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে আসবেন। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং স্পেশাল ‘ড্রোন ড্রামা’র আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানমালা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সিলেটের বিভিন্ন স্থানেও বিজয় মিছিল, আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
ফ্যাসিবাদী অপশাসনের বিরুদ্ধে ৫ আগস্ট চূড়ান্ত বিজয়: রাষ্ট্রপতি
দিবসটি উপলক্ষে গতকাল সোমবার এক বাণীতে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও ফ্যাসিবাদী অপশাসনের বিরুদ্ধে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলে ২০২৪ সালের এই দিনে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। ঐতিহাসিক এই অর্জনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আমি দেশের মুক্তিকামী ছাত্র-জনতাকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, দুঃশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট, গুম, খুন, অপহরণ, ভোটাধিকার হরণসহ সব ধরনের অত্যাচার, নিপীড়নের বিরুদ্ধে তরুণ প্রজন্ম ও আপামর জনতার ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এই বৈষম্যমূলক ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপ করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জনগণের ক্ষমতায়ন এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সুনিশ্চিত করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। একটি সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ফ্যাসিবাদের মূলোৎপাটন করে জুলাইয়ের চেতনার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। সংস্কারের মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হবে, প্রকৃত গণতান্ত্রিক উত্তরণের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠবে একটি ন্যায় ও সাম্যভিত্তিক নতুন বাংলাদেশএ আমার একান্ত প্রত্যাশা।’
বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখি: প্রধান উপদেষ্টা
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘জুলাই আমাদের নতুন করে আশার আলো একটি ন্যায় ও সাম্যভিত্তিক, বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখিয়েছে। হাজারো শহীদের আত্মত্যাগ আমাদের রাষ্ট্র সংস্কারের যে সুযোগ এনে দিয়েছে, তা যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। পতিত স্বৈরাচারী ও তার স্বার্থলোভী গোষ্ঠী এখনো দেশকে ব্যর্থ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই ষড়যন্ত্রকে মোকাবিলা করতে হবে। আসুন সবাই মিলে আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়ে তুলি, যেখানে আর কোনো স্বৈরাচারীর ঠাঁই হবে না।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অন্যান্য আয়োজনের মধ্যে রয়েছে-বেলা ১১টায় ‘টং’-এর গান, ১১টা ২০ মিনিটে সাইমুম শিল্পী গোষ্ঠী, ১১টা ৪০ মিনিটে কলরব শিল্পী গোষ্ঠীর গান।
দুপুর ১টায় নামাজের বিরতির পর একে একে পারফর্ম করবে চিটাগাং হিপহপ হুড, সেজান এবং শূন্য ব্যান্ড। এরপর দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে ‘ফ্যাসিস্টের পলায়নক্ষণ’ উদযাপন করা হবে। ‘পলায়নক্ষণ’ উদযাপনের পর আবারও শুরু হবে কনসার্ট। একে একে পারফর্ম করবে সায়ান, ইথুন বাবু ও মৌসুমি, সোলস এবং ওয়ারফেজ। এরপর আসরের নামাজের বিরতি চলবে। বিরতির পর বিকাল ৫টায় ঐতিহাসিক ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ পাঠ করা হবে।
এ সময় উপস্থিত থাকবেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। সবার অংশগ্রহণে জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করা হবে। সন্ধ্যায় সংসদ ভবনের সামনে লাখো কণ্ঠে জুলাইয়ের গান ‘কতো বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা…’ গাওয়া হবে। জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠের পর আবারও শুরু হবে কনসার্ট। একে একে পারফর্ম করবে বেসিক গিটার লার্নিং স্কুল, এফ মাইনর এবং পারশা। এরপর মাগরিবের নামাজের বিরতির পর পারফর্ম করবেন এলিটা করিম। তার পারফরম্যান্সের পর অনুষ্ঠিত হবে স্পেশাল ‘ড্রোন ড্রামা’। ড্রোন শো-এর পর সংগীত পরিবেশন করবে জনপ্রিয় ব্যান্ড আর্টসেল। এছাড়া এদিন ‘নোটস অন জুলাই’ জুলাইয়ের কিছু নির্বাচিত ছবি দিয়ে পোস্টকার্ড ডিজাইন করা হবে, যা জনসমাগমের মধ্যে ভলান্টিয়াররা নিয়ে ঘুরবেন এবং জনগণ ইচ্ছামতো
পোস্টকার্ড নিয়ে নিজেদের জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা লিখতে পারবেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।




