মৎস্যজীবী লীগ নেতার কান্ড : সরকারি চাকরিতে কর্মরত, সক্রিয় আইন পেশায়ও
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৪ আগস্ট ২০২৫, ১০:৩৬:২৮ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী : তিনি সরকারের পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা। সরকারি চাকরি করছেন টানা এক যুগ ধরে। আবার আইন পেশায়ও পুরোদস্তুর সক্রিয়। এর সাথে রাজনৈতিক দলের একজন পদবীধারী নেতাও। আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগ সিলেট জেলার আইন বিষয়ক সম্পাদক।
যিনি সরকারি চাকরিবিধিকে বৃদ্ধাঙ্গলী দেখিয়ে সরকারি চাকরির সাথে আইন পেশা এবং রাজনীতিও করে যাচ্ছেন। গুনধর এই ব্যক্তির নাম ফয়সল আহমদ বাবুল।
সিলেটের ডাক’র অনুসন্ধানে এ রকম চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হয়ে কারাভোগের পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক সিলেট জেলা কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সঞ্জয় কুমার দত্ত সিলেটের ডাককে এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, এই কর্মকর্তা সম্পর্কে আগে আমরা বিস্তারিত জানতাম না। তার কর্মকান্ড জানার পর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে সিলেট জেলা কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
জানা গেছে, একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্পের ফিল্ড সুপারভাইজার হিসেবে ২০১৩ সালের ২২ মে ফয়সল আহমদ বাবুল যোগদান করেন। তিনি সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার লামাকাজী ইউনিয়নের খালপাড় গ্রামের ওয়াকির আলীর পুত্র। সর্বশেষ সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে ফয়সল আহমেদ বাবুল (পরিচিতি নম্বর-এফ-১০২) কর্মরত ছিলেন।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের বিভিন্ন নথিপত্রে তার অনিয়মের বর্ণনা লিপিবদ্ধ আছে। সময়মতো অফিসে না যাওয়া, ঋণ দিতে অনৈতিক সুবিধা বা ঘুষ বাণিজ্য, অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত আবার অনুপস্থিত থেকেও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর প্রদান, মাঠ পর্যায়ে না যাওয়াসহ আছে বহু অভিযোগ। একাধিকবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাকে এসব বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেন। কিন্তু ক্ষমতার দাপটে তিনি এসবে কর্নপাত করেননি। তার ক্ষমতার দাপট এখানেই শেষ নয়। তিনি চাকরি বিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আইনজীবী পেশায় সক্রিয় থাকার পাশাপাশি রাজনীতিতেও পুরোদস্তুর সক্রিয় ছিলেন।
সূত্র জানায়, একজন সরকারি চাকরিজীবী বিধি অনুযায়ী অন্য পেশায় সক্রিয় থাকার সুযোগ না থাকলেও তিনি কিন্তু আইন পেশায় সক্রিয় আছেন। ফয়সল আহমদ বাবুল সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির একজন সদস্য। তার মেম্বার আইডি নম্বর- ১৬১৫ এবং এনরোলমেন্ট সনদ নং-১৮৫১, তারিখ-১৪/০৫/২০১৬)।
বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের প্রভাবে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই সরকারি চাকরিতে কর্মরত অবস্থায় ২০১৬ সালে আইন পেশার সনদ অর্জন করেন। অথচ তাকে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এ কারণে ২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে ও ২০১৭ সালে নোটিশ দিলেও তিনি আইন পেশায় সক্রিয় থাকেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ নোটিশ দিয়েই দায় শেষ করে বসে থাকেন তার বিরূদ্ধে কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে নিয়মিত ভোট প্রদান করেন আবার ভোট দিয়ে ব্যালট পেপার বাক্সে ফেলার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দিয়ে নিজের ক্ষমতারও জানান দেন।
ফয়সল আহমদ বাবুল বাংলাদেশ আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগ সিলেট জেলা শাখার বর্তমান কমিটির আইন বিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন। ২০২২ সালের ২৬ এপ্রিল এই কমিটি অনুমোদন করা হয়।
মৎস্যজীবী লীগের নেতা হিসেবে তিনি বিগত দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালান, নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন আবার ওই বক্তব্যের ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের আইডি থেকে পোস্ট করেন। তার ক্ষমতার দাপটে নিজের কর্মস্থল কিংবা নিজ এলাকার সাধারণ লোকজন তটস্থ থাকতেন বলে সূত্র জানিয়েছে। তার বিরুদ্ধে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে ছাত্রদের উপর নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। তিনি জালালাবাদ থানায় দায়েরকৃত মামলার এজাহারভুক্ত আসামি। তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা নম্বর-০৭, তারিখ-১১/০৯/ ২০২৪। ধারা ১৪৩/১৪৭/১৪৮/৩২৩/৩২৫/৩৪ দন্ডবিধি ও ১৯৮০ সালের বিস্ফোরক আইনের ৩/৪ ধারা। এই মামলার এজাহারভুক্ত আসামির সংখ্যা ১১২ জন। এ মামলায় জালালাবাদ থানার পুলিশ গত ১৪ জুন দুপুরে নিজ বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করে। বর্তমানে তিনি জামিনে রয়েছেন। এরপর পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেন।
এদিকে, তার এ সকল কর্মকাণ্ড তুলে ধরে সিলেটের বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও ইনকিলাব মঞ্চ পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের প্রধান দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জুবায়ের বখত সিলেটের ডাককে বলেন, বার কাউন্সিলের সনদ নেয়ার পর সরকারি চাকরি করার কথা নয়। সরকারি চাকরিকালীন বার কাউন্সিলের সনদ স্থগিত থাকবে। সরকারি চাকরিকালীন সনদ বহাল বা আইন পেশায় সক্রিয় থাকার সুযোগ নেই। কিন্তু কেউ যদি এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে সরকারি চাকরির পাশাপাশি আইন পেশায় সক্রিয় থাকেন তাহলে বার কাউন্সিল তার ব্যাপারে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ করার বিধান রয়েছে।
এ সকল অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চেয়ে ফয়সল আহমদ বাবুলের সাথে গতকাল সন্ধ্যায় সিলেটের ডাক’র বার্তা কক্ষের ল্যান্ড ফোন থেকে যোগাযোগ করা হয়। এ প্রতিবেদক পরিচয় দিয়ে তার চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্তের ব্যাপারে জানতে চান। ফয়সল জবাব দেন, তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। পরক্ষণেই তিনি আবার প্রতিবেদকের পরিচয় নিশ্চিত হতে চান। এ প্রতিবেদক বলেন, আপনাকে তিন তিনবার পরিচয় দিয়ে কথা বলা হচ্ছে। এরপর তিনি এ প্রতিবেদকের ব্যক্তিগত সেলফোনের নম্বরের জন্য অনুরোধ করেন এবং বলেন তিনি আগামীকাল দেখা করবেন। এ প্রতিবেদক যখন তার সরকারি চাকরি থেকে আইন পেশায় সক্রিয় থাকা এবং রাজনৈতিক দলের পদ পদবীর ব্যাপারে প্রশ্ন করতেই তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর কয়েক দফা কল দিলেও তিনি আর কল রিসিভ করেননি।




