আলী আমজদের ঘড়ির পাশে জুলাই স্মৃতিফলক নির্মাণের প্রতিবাদ
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৫ আগস্ট ২০২৫, ৮:৪০:০৮ অপরাহ্ন
সিলেটের দেড়শো বছরের ঐতিহ্যবাহী আলী আমজদের ঘড়ির পাশেই জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিফলক ‘স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প’ নির্মাণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে চলছে সমালোচনা। ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার অংশবিশেষ আড়াল করে স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হচ্ছে দাবী করে সোমবার স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
জানা যায়, ১৮৭৪ সালে সিলেটের ক্বিন ব্রিজ এলাকায় স্থাপিত হয় আলী আমজদের ঘড়ি। এখন এটি সিলেটের একটি ঐতিহ্য হিসেবে সব জায়গায় পরিচিতি পেয়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান চলাকালে যাঁরা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের স্মরণে প্রত্যেকের জন্য আলাদাভাবে ঘটনাস্থলে কিংবা ঘটনাস্থলের পাশে একই নকশায় ‘স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প’ নামে স্মৃতিফলক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সিলেট নগরে চারজন শহীদের স্মরণে এমন স্মৃতিফলক নির্মাণের কাজ গত জুলাই মাসে শুরু হয়েছে। যেগুলো নির্মাণ করছে সিলেট সিটি করপোরেশন। আলী আমজদের ঘড়ির সামনে মো. পাবেল আহমদ কামরুল ও পঙ্কজ কুমার কর শহীদ হন। তাই সেখানে দুই শহীদ স্মরণে স্মৃতিফলক নির্মিত হচ্ছে।
এর বাইরে কোর্ট পয়েন্টের মধুবন সুপার মার্কেটের সামনে শহীদ সাংবাদিক আবু তাহের মো. তুরাব এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ শিক্ষার্থী রুদ্র সেনের স্মরণে ঘটনাস্থলের পাশে স্মৃতিফলক নির্মিত হচ্ছে। প্রতিটি ফলক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৩৭৫ টাকা।
সোমবার দুপুরে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারোয়ার আলম ও সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকারের কাছে সিলেটের ল্যান্ডমার্ক খ্যাত দেড় শতাব্দীর প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী আলী আমজাদের ঘড়িঘরের অখণ্ডতা রক্ষার নাগরিক আহবান সম্বলিত যৌথ স্মারকলিপি প্রদান করেছে তিনটি নাগরিক সংগঠন। পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট সিলেট, ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) সিলেট ও সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলনের পক্ষ থেকে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। সংগঠন তিনটির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন- ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী, আব্দুল করিম কিম, শামসুল বাসিত শেরো, প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান চৌধুরী, রেজাউল কিবরিয়া প্রমুখ।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, সিলেট শহরের প্রাচীনতম ও প্রতীকখ্যাত স্থাপত্য “আলী আমজদের ঘড়িঘর। এ কেবল একটি স্থাপনা নয়; আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের প্রতীক।
১৮৭৪ সালে পৃথিমপাশার জমিদার নবাব আলী আমজদ খান এটি নির্মাণ করেন। শতবর্ষ অতিক্রান্ত এই স্থাপনাটি সিলেটকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত করেছে। সুরমা নদীর তীরে অবস্থিত এইঘড়ি ঘর সিলেটের ল্যান্ডমার্ক। তবে গভীর দুঃখ ও উদ্বেগের সঙ্গে জানাতে হচ্ছে যে, এই ঐতিহ্যবাহী ঘড়িঘরের সীমানার ভেতরেই নতুন একটি স্থাপনার (জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মরণে “জুলাই স্তম্ভ”) নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। স্মারকলিপিতে উল্ল্যেখ করা হয়, সিলেটের মুক্তিকামী মানুষের সংগ্রামে জুলাই আন্দোলনের গুরুত্ব অস্বীকারযোগ্য নয়। কিন্তু ঐতিহাসিক “আলী আমজদের ঘড়িঘর”-এর গায়ে নতুন স্থাপনা চাপিয়ে দেওয়া সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও স্থাপত্যরক্ষার মৌলিক নীতির পরিপন্থী।
স্মারকলিপিতে এই স্থাপনা সংরক্ষণের আইনগত ভিত্তি তুলে ধরে বলা হয়, বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব আইন, ১৯৬৮ (সংশোধিত ১৯৭৬ ও ২০১৬): আইন অনুযায়ী প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনার সীমানায় কোনো নতুন স্থাপনা নির্মাণ বা পরিবর্তন আনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
জাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ নীতি, ২০০৯: ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রতীকের চারপাশের দৃশ্যমানতা, পরিবেশ ও নান্দনিকতা অক্ষুণ্ণ রাখা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।এছাড়া ইউনেস্কোর হেরিটেজ সংরক্ষণ নীতি অনুযায়ী, শতবর্ষ প্রাচীন স্থাপনার ভৌগোলিক ও স্থাপত্যগত অখণ্ডতা নষ্ট করা যায় না।
স্মারকলিপিতে সংগঠন তিনটি নাগরিকসমাজ, পরিবেশবাদী ও ঐতিহ্য সংরক্ষণকামী মানুষের পক্ষে নিকটবর্তী বিকল্প স্থানে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি স্মারক নির্মাণ ও সিলেটের প্রতীকখ্যাত ঐতিহ্যের ক্ষতি না করার আহ্বান জানানো হয়।
এব্যাপারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সিলেট জেলার সাবেক যুগ্ম আহবায়ক ইব্রাহীম বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের একজন সম্মুখ সারির সংগঠক হিসাবে এধরণের উদ্ভট তৎপরতার নিন্দা জানাই৷ জুলাই স্মরণে সিলেটের বিভিন্ন স্থানে ফলক, স্মারক নির্মিত হতে পারে৷ কিন্তু সেটা ঐতিহ্য, প্রকৃতি কিংবা জনস্বার্থ বিঘ্ন করে নয়৷
সংক্ষুব্ধ নাগরিক আন্দোলন সিলেটের সমন্বয়ক আবদুল করিম চৌধুরী (কিম) বলেন, সিলেটের এই ল্যান্ডমার্কের অখন্ডতা যেকোনোভাবে রক্ষা করতে হবে। জুলাই শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ এর পাশাপাশি অন্যত্র স্থাপন করাও সম্ভব। এই দাবীতে আমরা আজ স্মারকলিপি দিয়েছি।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বলেন, সিলেটের ৪ জন শহীদের শহীদ হওয়া স্থানে এই স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হচ্ছে। আলী আমজদের ঘড়ির পাশে ২ জন শহীদের ফলক নির্মাণ করা হচ্ছিল। বিভিন্ন দাবীর প্রেক্ষিতে আপাতত কাজটা বন্ধ আছে। আমরা আলোচনা করে পরবর্তী কাজ করবো।




