জগন্নাথপুরের নলজুর নদের দুই সেতুর ভোগান্তি কবে দূর হবে?
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ৩০ আগস্ট ২০২৫, ১:২৪:০৮ অপরাহ্ন
জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা : প্রবাসী অধ্যুষিত জগন্নাথপুর উপজেলাবাসী নলজুর নদের ওপর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডির দুটি সেতুর কারণে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। কবে শেষ হবে এমন ভোগান্তি- তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। তিনদফা বর্ধিত সময়ে সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী সম্প্রতি মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা কর্মসূচি পালন করেছেন।
গত ১৯ আগস্ট জগন্নাথপুর পৌর পয়েন্টে বিএনপির সভায় যুক্তরাজ্য বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কয়ছর এম আহমেদ সেতুর কাজ বিলম্বিত হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত শেষ করার দাবি জানান।
এলাকাবাসী সূত্র জানায়,জগন্নাথপুর উপজেলা সদরে নলজুর নদের ওপর ১৯৮৬ সালে খাদ্য গুদামের সামনে ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নে নলজুর সেতু নির্মাণ করা হয়। ২০২২ সালে জগন্নাথপুর-সুনামগঞ্জ-আউশকান্দি আঞ্চলিক মহাসড়ক চালু হলে জগন্নাথপুর পৌর শহরে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। সরু এ সেতু ভেঙে রাজধানীর হাতিরঝিলের আদলে সিলেট বিভাগের প্রথম দৃষ্টিনন্দন আর্চ সেতুর কাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি প্রায় ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দে সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী সংসদ সদস্য এম এ মান্নান এ সেতুর কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কাজ শেষ হওয়ার কথা। ভাটিবাংলা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতুর কাজ বাস্তবায়ন করছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হলে আরেকদফা ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। কিন্তু ধীরগতিতে কাজ চলায় কাজ শেষ হয়নি। সময় বাড়ানো হয় চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত কিন্তু কাজ শেষ হলোনা। এখন অক্টোবর পর্যন্ত আরেক দফা সময় বাড়ানো হয়েছে। এলাকাবাসীর ধারণা চতুর্থদফা সময়েও কাজ শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এদিকে, এ সেতুর পাশে বিকল্প হিসেবে জোড়াতালির একটি বেইলি সেতু ও বাঁশের সাঁকো তৈরি করা হয়। দুটোই চলাচলের অনুপযোগী। জোড়াতালির বিকল্প সেতু আর অ্যপ্র্যোচের ইট সরে গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় যানবাহন চলাচল দুরূহ হয়ে উঠছে। এ প্রেক্ষাপটে উপজেলাবাসীর ভরসা ছিল নলজুর নদের ডাকবাংলো সেতু। কিন্তু এ সেতুর অবস্থা আরো নাজুক।
১৯৮৮ সালে এলাকাবাসীর অর্থায়নে নলজুর নদের ডাকবাংলোর সামনের এ সেতু নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৯৯৬ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে সেতুর কাজ শেষ করা হয়। ২০২১ সালে নলজুর নদ খননকালে সেতুর পিলারের কাছ থেকে খননযন্ত্র দিয়ে মাটি উত্তোলন করায় ডাকবাংলো সেতুর দুটো অংশ দেবে যায়। এক বছর সেতু দিয়ে সবধরনের চলাচল বন্ধ থাকার পর স্টিলের পাটাতন বসিয়ে সেতুটি জোড়াতালি দিয়ে চালু করা হয়।এখন সেতু দিয়ে একটি অটোরিকশা চলাচল করলে একজন পথচারী পায়ে হেঁটে চলাচল করতে পারে না। ইতিমধ্যে যানবাহনের চাপে সেতুর রেলিং ভেঙে যায়। বাঁশ দিয়ে রেলিং দেয়া হয়েছে। পাটাতন ফাঁক হয়ে যাওয়ায় প্রতিদিন এ সেতুতে ঘটছে দুর্ঘটনা। নারী, শিসহ অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আহত হয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গুদামের সামনে আর্চ সেতুর ঢালাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে এখন শ্রমিকরা মিলে সেতুর দুই পাশের দৃষ্টিনন্দন আর্চের কাজ করছেন। সেতুর দুই পাশে কাজ দৃশ্যমান হলেও কাজ ধীরগতিতে চলছে বলে জনসাধারণের অভিযোগ।
সেতুর পাড়ে কথা হয় জগন্নাথপুর বাজারের ব্যবসায়ী রজত গোপের সঙ্গে। তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এ সেতুর কাজ বার বার সময় বাড়িয়ে নাগরিকদের চরম দুর্ভোগে রাখা হয়েছে। এভাবে ধীরগতিতে কাজ চললে কবে শেষ হবে তা বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন,বিকল্প সড়ক ও বেইলি সেতুর অবস্থা নাজুক হওয়ায় জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।
ডাকবাংলো সড়কের ব্যবসায়ী কবির আহমেদ জানান,প্রতিদিন ডাকবাংলো সড়কের সামনের সেতু দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে লোকজন ও যানবাহন চলাচল করছে। তীব্র যানজটের পাশাপাশি ঘটছে দুর্ঘটনা। একজন প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে তিনি গত এক মাসে কমপক্ষে ২০টি দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানান। সেই সাথে নারী ও শিশু সেতু থেকে নদীতে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে বলে জানান তিনি।
জগন্নাথপুর গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ নারী ছায়া রানী দাস জানান, জগন্নাথপুর বাজার থেকে বাসুদেববাড়ি বাসায় ফেরার পথে কয়েক দিন আগে সেতুর মধ্যভাগে একটি অটোরিকশা তাকে চাপা দেয়।তিনি নদীতে না পরে কোন রকম ঠিকে থাকলেও বুকে প্রচন্ড আঘাত পেয়েছেন। সৃষ্টিকর্তার নাম জপ করে করে সেতু পার হন বলে জানান ওই নারী।
উপজেলা নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক বিষ্ণুপদ রায় বলেন, নলজুর নদের দুটি সেতু একসঙ্গে অচল হওয়ায় সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন উপজেলাবাসী। মেয়াদ শেষ হলেও আর্চ সেতুর কাজ শেষ না হওয়া দুঃখজনক।
অপরদিকে, ডাকবাংলো সেতুর কাজের দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হলেও এখনো ঠিকাদার কাজ শুরু করেনি। জনদুর্ভোগের কথা বিবেচনা করে দ্রুত সেতু দুটির কাজ বাস্তবায়ন করার জোর দাবি জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডির জগন্নাথপুর উপজেলা প্রকৌশলী সোহরাব হোসেন বলেন, নানা জটিলতায় আর্চ সেতুর কাজ যথাসময়ে শুরু করা যায়নি। তাই কাজ শেষ করতে কিছুটা বিলম্ব হয়। আমরা আশাবাদী আগামী তিন মাসের মধ্যে সেতুর কাজ শেষ হবে।
এদিকে, জুন মাসে ডাকবাংলো সেতুর কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে। মেসার্স হাসান এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ১৮০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৮ ফুট প্রস্তের সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এটি বাস্তবায়ন করবে। বর্ষার পরপর সেতুর কাজ শুরু হবে বলেও জানান তিনি।




