কোম্পানীগঞ্জের নিম্নবিত্ত আর দিনমজুররা যাবে কোথায়?
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৫:৫০:১৩ অপরাহ্ন
রাজু আহমেদ : না, সাদাপাথর নয়। সাদাপাথর অংশ সুরক্ষিত রেখে যুগের পর যুগ ধরে দেশের বৃহত্তম পাথর কোয়ারি ভোলাগঞ্জ থেকে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলন এই অঞ্চলের মানুষের সুদীর্ঘ কয়েক যুগের পেশা। সরকার থেকে কোয়ারিসমূহ লিজ নিয়ে বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে এই পাথর উত্তোলন কার্যক্রম। এই প্রেক্ষিতেই এক সময় কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নাম হয়ে উঠে পাথুরে জনপদ। পাথর উত্তোলন পাথর ভাঙ্গা আর পাথর বিক্রির সাথে জড়িয়ে পড়েন এই অঞ্চলের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত খেটে খাওয়া মানুষেরও। প্রায় প্রতিবছরই বানের পানিতে প্রাকৃতিকভাবে পাথর চলে আসে এই কোয়ারিতে। আর শুষ্ক মৌসুমে সরকারকে পর্যাপ্ত অর্থ দিয়ে লিজ নিয়ে ব্যবসায়ীরা লক্ষ শ্রমিককে খাটিয়ে পাথর উত্তোলন অব্যাহত রাখেন। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এক পর্যায়ে বোমা মেশিন নামক একটি যন্ত্রদানব নিয়ে আসে। কোয়ারি সমূহে এই মেশিন সংযোগের পর ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এটাকে পুঁজি করে নেয় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এবং পরিবেশবাদী উচ্চাভিলাসী কয়েকজন।
তৎকালীন ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকারের সময় পরিবেশ আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা কিছু ভারতপ্রেমী হাইকোর্টে একটি রিট করে বসেন। এই রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১৮ সালে বোমা মেশিন ব্যবহার করে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকেই কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার প্রায় লক্ষাধিক মানুষ একটা দৈন্যতার মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। শুধু কোম্পানীগঞ্জ নয় পার্শ্ববর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাট সুনামগঞ্জের ছাতকসহ সমগ্র সিলেটে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শুরু হয় এলসি করে ভারত থেকে পাথর আমদানি। এতে সায় ছিল তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী-উপদেষ্টার। তাদের আসল উদ্দেশ্য পরিবেশ রক্ষা নয়; পরিবেশ সুরক্ষার নাম করে ভারত থেকে পাথর আমদানির সুযোগ করে দেয়া। আওয়ামী লীগ সরকার পালিয়ে যাওয়ার পর এই জনপদের মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখেছিল। হয়তো আবার কোয়ারিসমূহে ফিরবে প্রাণচাঞ্চল্য। সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলিত হবে। বন্ধ হবে ভারত থেকে পাথর আমদানি। মহামান্য হাইকোর্টে রিটও খারিজ হয়। কিন্তু যেই লাউ সেই কদু। সব সমস্যা মোকাবিলা করে যখন পাথর উত্তোলনের দ্বারপ্রান্তে জনগণ; ঠিক তখনই এক শ্রেণির লোক সাদাপাথরে লুটপাট চালায়।
কথিত আছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে সাদাপাথরে লুটপাট শুরু হয়। আর এর সমাপ্তি ঘটে এ বছরের ১১ আগস্ট। সাদাপাথরে লুটপাট নিয়ে দৈনিক সিলেটের ডাকসহ স্থানীয় দৈনিকগুলোতে একাধিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে খ্যাত ‘ভোলাগঞ্জ রোপওয়ে’কে চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে পরিণত করা হয় বিরানভূমিতে। অবাধে বালু উত্তোলনের ফলে সাবেক অর্থমন্ত্রী, সিলেটের উন্নয়নের রূপকার মরহুম এম সাইফুর রহমানের স্মৃতি বিজড়িত ধলাই সেতুকেও ফেলা হয় ঝুঁকির মুখে। কিন্তু, তখন প্রশাসনিকভাবে তেমন কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
দৈনিক সিলেটের ডাক-এ গত ১২ আগস্টের লিড নিউজের শিরোনাম ছিল- সাদাপাথর লুট ঠেকাতে প্রশাসন কি ব্যর্থ ? এরপর প্রশাসন নড়ে চড়ে বসে। সাদাপাথর থেকে লুট হওয়া পাথর উদ্ধারে শুরু হয় অভিযান। সাদাপাথর রক্ষায় ব্যর্থতার জন্য সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদকে করা হয় ওএসডি। কোম্পানীগঞ্জের ওসি আজিজুন্নাহারকে বদলি করা হয় ফেঞ্চুগঞ্জে । সম্প্রতি কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি উজায়ের আল মাহমুদ ও গোয়াইনঘাট থানার ওসি সরকার তোফায়েল আহমদকে বদলি করা হয়।
স্থানীয় ভাষ্যমতে, সাদাপাথর এলাকা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নোম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থিত। এই সাদাপাথর -পাথর কোয়ারিরই অন্তর্ভুক্ত নয় বলে তাদের ভাষ্য। পাহাড়ি ঢলের সাথে প্রতি বছরে ভারত থেকে নেমে আসে বিপুল পরিমাণ সাদাপাথর। কয়েক যুগ ধরে সেখানে জমা হচ্ছে সাদাপাথর। সেখান থেকে কেউ কখনো একটি পাথর সরানোর সাহস পায়নি। তবে এখন কোন ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সাদাপাথরের এই লুটপাট সংঘটিত হলো-এই প্রশ্ন এখন সবার মুখে মুখে। এখন পর্যটনের দোহাই দিয়ে প্রশাসনের নজর পড়েছে এই সাদাপাথরে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের বক্তব্য হচ্ছে-তিন হাত বদল হয়ে মূলত সাদাপাথর এসেছে ব্যবসায়ীদের কাছে। কিন্তু, টাকা দিয়ে ক্রয় করা পাথর জোরপূর্বক উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই অত্যাচার চলতে দেওয়া যায় না- এর একটি সুরাহা প্রয়োজন ।




