তাহিরপুরে সবকটি পর্যটন স্পটে মাদকের ছড়াছড়ি
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৪:১২:৪০ অপরাহ্ন
বাবরুল হাসান বাবলু, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) থেকে : তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওর, টেকেরঘাট নীলাদ্রি লেক, যাদুকাটা নদীসহ সবকটি পর্যটন স্পটে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদকদ্রব্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাওরে ঘুরতে আসা নানা বয়সী পর্যটকরা হাউজবোটে বসে সেবন করছেন মদ, গাঁজা, বিয়ার, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মরণনেশা। অতিরিক্ত টাকার লোভে পরে মাদক ব্যাবসায়ীরা হাউজবোটগুলোতে মাদক সরবরাহ করাচ্ছেন শিশু কিশোরদের দিয়ে।
চলতি বছর টাঙ্গুয়ার হাওরসহ তাহিরপুরের সবকটি পর্যটন স্পটে বর্ষা মৌসুমে অন্যান্য বছরের তুলনায় পর্যটকের চাপ বাড়ে। সেই সাথে বেড়ে যায় আগত পর্যটকদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণ। গত ১৬ জুন টেকেরঘাট নীলাদ্রি লেকে ছোট নৌকায় করে পর্যটকদের কাছে মদ বিক্রি করার সময় বড়ছড়া বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে ভারতীয় বিভিন্ন ব্রান্ডের মদ রেখে পালিয়ে যায় মাদক ব্যাবসায়ী ও মাদকসেবী পর্যটকরা।
গত ৩ জুলাই টাঙ্গুয়ার হাওরে একটি হাউজবোটে বসে প্রকাশ্যে মদ পান করে এবং ছোট একটি ডিঙ্গি নৌকায় হাতে মদের বোতল নিয়ে রিলস ভিডিও করে এক নারী তা ফেইসবুকে আপলোড করে। ভিডিওটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয়। তারপর থেকে নজরে আসে টাঙ্গুয়ার হাওরে হাউজবোটে মদ খাওয়া এবং মদ বিক্রির বিষয়টি। গত ১ আগস্ট যাদুকাটা নদীতে নোঙর করা হাউজবোটে কয়েক জন শিশু কিশোর মদ বিক্রি করতে গেলে সে সময় নৌকার মাঝি তাদের ভিডিও ধারণ করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তারা পালিয়ে যায়। সে ভিডিওটিও স্থানীয় মানুষদের নজরে আসে এবং নানা সমালোচনা আলোচনা হয়। পরবর্তীতে ২ আগস্ট সীমান্তের বড়ছড়া বাজার এলাকা থেকে মদ কিনে নীলাদ্রি লেকের হাওর ঘাটে
হাউজবোটে যাওয়ার সময় ঢাকার কেরানী গঞ্জের পর্যটক রাজ বর্মণ দু’টি ভারতীয় মদের বোতল সহ টেকেরঘাট পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যদের হাতে আটক হন।
স্থানীয়দের অভিযোগ দিনে তেমন কিছু না হলেও রাতে ঘাট থেকে একটু দূরে হাওরের ভেতর নোঙ্গর করা হাউজবোটগুলো হয়ে উঠে মাদক সেবনের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। হাউজবোটগুলোতে কখনো স্থানীয় শিল্পীরা গান পরিবেশন করেন,কখনো বক্স বাজিয়ে গানের তালে তালে বোতল নিয়ে নাচতে নাচতে তা ছুঁড়ে ফেলেন হাওরের স্বচ্ছ পানিতে।
সচেতন মহলের অভিযোগ প্রশাসনের নজরদারি কম থাকায় তাহিরপুরের বিভিন্ন পর্যটন স্পটে মাদকের ছড়াছড়ি বেড়েছে। এ নিয়ে গত ২৮ আগস্ট তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের মাসিক আইনশৃঙ্খলা সভায় আলোচনা উঠে। এতে উপস্থিত অনেকেই হাউজবোটে মদ বিক্রি এবং পর্যটকদের উচ্ছৃঙ্খল আচরণের কথা উত্থাপন করেন।
উপজেলার বড়দল দক্ষিণ ইউনিয়নের মাটিকাটা গ্রামের বাসিন্দা আলাই মিয়া বলেন,নীলাদ্রি লেক হাসপাতালের পিছনের হাওরে আমার কিছু বোরো জমি আছে। জমি রোপণ করার আগে পর্যটকদের ফেলে দেয়া বোতল কুঁড়িয়ে চাষাবাদ করতে হয়। তা না হলে পাওয়ার টিলারে বোতল ভেঙ্গে কাচের টুকরো মাটির গভীরে মিশে যায়,তখন শ্রমিকরা ধান রোপণ করতে সাহস পান না । এ অবস্থা শুধু আমার না যাদের জমি রয়েছে প্রত্যেকেরই একই অবস্থা।
তাহিরপুর নৌ পর্যটন শিল্প সমবায় সমিতির সভাপতি রব্বানী মিয়া বলেন, টাঙ্গুয়ার হাওরে শত শত হাউজবোট চলাফেরা করে। কে কোথায় বসে মাদক সেবন করে তা খুঁজে বের করা কঠিন। তবে আমরা আমাদের সমিতির সকল হাউজবোটের মালিক ও মাঝিদের জানিয়ে দিয়েছি; যাতে কোনভাবেই কোন পর্যটক হাউজবোটে বসে মাদক সেবন করতে না পারেন।
তাহিরপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জুনাব আলী বলেন, তাহিরপুরের পর্যটন স্পটগুলোতে মাদকের ছড়াছড়ি বেড়েছে। মাদক বিক্রিতে মাদক ব্যাবসায়ীরা শিশুদের ব্যবহার করছে। এর ফলে বিপথগামী হচ্ছে শিশুরা।
তাহিরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ দেলোয়ার হোসেন বলেন, পর্যটকরা হাওরসহ অসংখ্য স্থানে হাউজবোটে রাত যাপন করেন। আমাদের সব জায়গাতে যাওয়ার মত লোকবল কিংবা বাহন নেই । আমরা চেষ্টা করছি ; আমাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মেহেদী হাসান মানিক বলেন, তাহিরপুরে অনেকগুলো পর্যটন স্পট রয়েছে। পর্যটন স্পটগুলোতে মাদকের ছড়াছড়ি যত কম থাকবে; পর্যটকরা তত নিরাপদে চলাফেরা করতে পারবেন। আমরা সে লক্ষ্যে কাজ করছি। এ নিয়ে হাউজবোট মালিকদের সাথে তিনি শিগগিরই আলোচনায় বসবেন বলে জানান তিনি।




