সোনাই নদীতে বালু লুটপাট থামছে না, বিজিবির অভিযানে ৩টি ট্রাক জব্দ
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ৩:২১:৫৬ অপরাহ্ন
আবিদুর রহমান, কোম্পানীগঞ্জ থেকে : উপজেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান সত্ত্বেও ছাতক-কোম্পানীগঞ্জ সীমান্তের সোনাই নদী থেকে অবৈধ বালু লুটপাট থামছে না। আজ মঙ্গলবার ভোররাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)–এর অভিযানে বালুভর্তি ৩টি ট্রাক জব্দ করা হয়েছে। তবে আটক করা যায়নি বালু উত্তোলন ও পাচার চক্রের কাউকে।
সোনাই নদী ভারতের মেঘালয় থেকে উৎপন্ন হয়ে সুনামগঞ্জের ছাতক ও সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এটি বাইরং নদী নামেও পরিচিত। এই নদীর বালুর চাহিদা রয়েছে এ অঞ্চলে।
বিজিবির ছাতক নোয়াকুট বিওপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোর রাতে সোনাই নদীতে বালু উত্তোলনের সময় অভিযান দিয়ে তিনটি ট্রাক্টর জব্দ করে বিজিবি। গাংপার নোয়াকুট মসজিদের সামনে থেকে ট্রাকগুলো আটক করা হয়। মসজিদের সামনে প্রস্তুত করা বালুর ঘাট এলাকা থেকে বালু ভর্তি করে ট্রাকগুলো আসছিল।
বিজিবির নোয়াকুট ক্যাম্পের সৈনিক মো. ইয়াছিন মিয়া জানান, নিজেদের কাজের বাইরে নিয়মিত আমরা বালু উত্তোলন ও পাচার রোধে কাজ করছি। মঙ্গলবার বালুভর্তি তিনটি ট্রাক জব্দ করা হয়। মালিকপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে মামলা প্রক্রিয়াধীন।
স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আটক হওয়া তিনটি ট্রাকের মালিক ছাতকের ইসলামপুর ইউনিয়নের ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মখলিছুর রহমান, একই কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিক ও বিএনপি নেতা দাবিদার আব্দুল কুদ্দুছ। স্থানীয়রা জানান, এই তিনজন আপন ভাই এবং বিভিন্ন মামলার আসামি। তারা সোনাই নদীতে দীর্ঘ দিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও পাচার করে আসছেন। এলাকায় তাদের বেশ প্রভাব থাকায় ভয়ে কেউ তাদের বিরুদ্ধে মুখ খুলে না। তারা গাংপার নোয়াকোট গ্রামের শফিক মিয়া বাড়ির সামনে ও মসজিদের সামনে বালু উত্তোলনের জন্য দুটি ঘাট প্রস্তুত করে সেখান থেকে ট্রাক দিয়ে বালু পাচার করেন।
তবে বালু লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করেন স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মখলিছুর রহমান ও তার ভাই আব্দুল কুদ্দুছ। বিজিবির অভিযানে আটক ট্রাকগুলোও তাদের নয় বলে দাবি করে আব্দুল কুদ্দুস বলেন, একটি ট্রাক কোম্পানীগঞ্জের শাহ আরেফিনের মোহনের। অন্য দুটি পাড়ুয়া নোয়াগাওয়ের একজনের। তবে স্থানীয় একটি সূত্র জানায়, জব্ধ ট্রাকগুলো ছাড়িয়ে আনতে স্থানীয় ওয়ার্ড মেম্বার শফিক মিয়া ও ময়না মিয়াকে নিয়ে সকালে বিজিবি ক্যাম্পে গিয়েছিলেন মখলিছ ও আব্দুল কুদ্দুছ। জানতে চাইলে শফিক মেম্বার ও ময়না মেম্বার বলেন, আমরা স্বেচ্ছায় যাইনি, ক্যাম্প কমান্ডার ফোন দিয়ে আমাদেরকে নিয়েছিলেন। এ সময় আব্দুল কুদ্দুছ ছাতকের ইউএনওর সঙ্গে ফোনে কথা বলে ট্রাকগুলো আমার জিম্মায় দেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত এই চেষ্টা সফল হয়নি।
অভিযোগ আছে, ছাতকের ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুফি আলম সোহেল স্থানীয় আওয়ামী লীগ-বিএনপি ও জামায়াতের প্রভাবশালীদের নিয়ে একটি বালু সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটের দ্বারা অব্যাহত বালু উত্তোলনের ফলে হুমকির মুখে পড়েছে সরকারের ১০ কোটি টাকার রাবার ড্যাম ও নদীপাড়ের জনবসতি।
এ বিষয়ে বক্তব্যের জন্য ছাতকের ১নং ইসলামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সুফি আলম সোহেলের মুঠোফোনে কল দিলে তিনি রিসিভ করেননি।
সোনাই নদীর পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুল জব্বার খোকন জানান, রাবার ড্যামের ফলে সোনাই নদীর পানি দিয়ে বোরো মৌসুমে স্থানীয় কৃষকরা সাতশো একর অনাবাদি ও পতিত জমিতে বোরো ও রবিশস্য চাষ করেন। কিন্তু বেপরোয়া বালু উত্তোলনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে রাবার ড্যাম। গত বছর বালু উত্তোলনের কারণে ড্যামে ছিদ্র হয়ে যায়। এবারও ড্যাম হুমকির মুখে। তিনি বলেন, সুফি আলম সোহেল চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিদিন রাবার ড্যাম এলাকায় শতাধিক নৌকা দিয়ে বালু লুট হয়। বালু সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিলেও কোনো প্রতিকার মিলে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, রাত ২টা থেকে ভোর রাত পর্যন্ত চলে বালু উত্তোলন। এলাকাবাসী নিষেধ দিলেও তারা মানে না। বর্তমানে নদীর দুই পাড়ের ঘরবাড়ি হুমকির মুখে পড়েছে।
ছাতক থানার ওসি শফিকুল ইসলাম খান জানান, অবৈধ বালু লুট ঠেকাতে পুলিশ নিয়মিত অভিযান দিচ্ছে। চলতি মাসে তিনটি মামলা হয়েছে। পনেরোজন আটক আছে। উপজেলা প্রশাসনকে সহায়তা করা হচ্ছে।




