১৫ দিনের ব্যবধানে ২ কিশোর খুন, যৌথ অভিযান শুরুর পরামর্শ নগরবাসীর
সিলেট নগরীতে অপ্রতিরোধ্য ‘কিশোর গ্যাং’
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ৫:৫২:১৯ অপরাহ্ন
আনাস হাবিব কলিন্স :
সিলেট মহানগরীতে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাং। ওই চক্রের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ১৫ দিনের ব্যবধানে খুন হয়েছেন ২ কিশোর। নগরীর প্রতিটি পাড়া মহল্লায়ই রয়েছে-কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা।
গত বৃহস্পতিবার রাতে বাদামবাগিচা এলাকায় প্রতিপক্ষ কিশোর গ্যাং এর ছুরিকাঘাতে সপ্তম শ্রেণীতে পড়ুয়া এক কিশোর খুন হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার বিকেলেও নয়াসড়ক এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষে একজন আহত হয়েছেন।
সরেজমিনে নগরীর টিলাগড় পয়েন্ট, বালুচর, শাহী ঈদগাহ এলাকা, ইলেকট্রিক সাপ্লাই, আম্বরখানা, সুবিদবাজার, মদিনা মার্কেট, তেমুখী পয়েন্ট, জিন্দাবাজার, নবাবরোড, মাছুদিঘীরপার, লালাদিঘীর, কুয়ারপার, শেখঘাট, শিবগঞ্জ, উপশহর, ওসমানী মেডিকেল কলেজ এলাকাসহ প্রতিটি পাড়া মহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের জম্পেশ আড্ডা দিতে দেখা যায়। মোটর সাইকেল চুরি, ছিনতাই, অপহরণসহ হেন কোন অপরাধ নেই যে, এ চক্রের সদস্যরা জড়িত নয়। অনেকে লোক লজ্জার ভয়ে তাদের অপকর্মের বিষয়টি প্রকাশ করেন না। সরকারি ছুটির দিনে বিশেষ করে শুক্র ও শনিবার নগরীর শাহী ঈদগাহ এলাকায় কিশোর গ্যাং সদস্যদের আড্ডার পাশাপাশি তুচ্ছ বিষয় নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে দেখা যায়। এ চক্রের বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকার লোকজন আইন-শৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনীর কাছে অভিযোগ দিয়েও প্রতিকার পাচ্ছেন না। অভিযোগ পেয়ে পুলিশ কিছুদিন অভিযান পরিচালনা করলেও ফের তারা সক্রিয় হয়ে পুরনো অপকর্মে লিপ্ত হয়।
ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নগরীর প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় একাধিক গ্রুপ ও উপগ্রুপ তৈরি হয়েছে। শহরতলীর খাদিমপাড়া থেকে শুরু করে তেমুখী পয়েন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত তাদের কার্যক্রম। পাড়া-মহল্লার বাসা-বাড়ির সামনে এদেরকে চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে আড্ডা দিতে দেখা যায়। পাবলিক প্লেসে ধূমপান আইনত নিষিদ্ধ থাকলেও এরা উঠতি বয়সি ছেলেদের প্রকাশ্যে ‘বেয়াদবে’র মতো সিগারেট সেবন করতে দেখা যায়। এ নিয়ে অনেক অভিভাবককেও বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়।
একটি সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের আগে ছাত্রলীগের ব্যানারে কিশোর গ্যাং সদস্যরা অপতৎপরতা চালালেও বর্তমানে একটি বড় রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের ব্যানারে এরা তৎপর রয়েছে।
কিশোর গ্যাং সদস্যদের উৎপাতে নগরবাসী এতোটাই বিরক্ত যে, তারা না পারছেন সইতে, না পারছেন তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিকারে যেতে। উদ্বেগের সাথে কয়েকজন নগরবাসী বলেন, এই মুহূর্তে কিশোর গ্যাংয়ের লাগাম টেনে ধরতে না পারলে নগরবাসীকে এর চরম মাশুল দিতে হবে। সেই সাথে তাদের মদদদাতাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি নগরবাসীর। তারা এ ব্যাপারে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান চালুর তাগিদ দিয়েছেন।
অবশ্য, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) কমিশনার মো. আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী বলছেন, কিশোর গ্যাং এর সকল অপতৎপরতা রুখে দিতে পুলিশ বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, পুলিশের কাছে কিশোর গ্যাং এর তালিকা রয়েছে। পূর্বে প্রস্তুতকৃত ওই তালিকা এবং বর্তমানে তাদের তৎপরতা পর্যালোচনা করে অভিযান চালানো হবে। শাহ মাহমুদ হাসান তপু হত্যার ঘটনায় পুলিশ ৩ জনকে আটক করেছে বলেও জানান তিনি।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এর সাবেক সভাপতি ও ব্লাস্ট সিলেট ইউনিটের উপদেষ্টা এডভোকেট ইরফানুজ্জামান চৌধুরী বলেন, আইনশৃংখলা বাহিনীর জোরালো তৎপরতার অভাবে নগরীতে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত বেড়েছে। এখনি তাদের রুখে দিতে হবে। সেই সাথে অস্ত্র উদ্ধারসহ আইনশৃংখলার উন্নয়নে সংশ্লিষ্টদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার পরামর্শ তার।
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা সিলেট জেলা শাখার সভাপতি এডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, নগরীতে কিশোর গ্যাং এর মাথাচাড়া দেয়ার ঘটনা সিলেটবাসীর জন্য অশনি সংকেত। এদের অপতৎপরতা বন্ধ না করতে পারলে চরম মাশুল দিতে হবে। সেই সাথে তাদের আশ্রয় প্রশ্রয় দাতাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
প্রাণ গেছে দুই জনের
কিশোরদের দুই গ্রুপের বিরোধকে কেন্দ্র করে গত বৃহস্পতিবার রাত ১২ টার দিকে বাদামবাগিচা এলাকায় খুন হয়েছেন শাহ মাহমুদ হাসান তপু (১৭)। তিনি ইলাশকান্দি বাদামবাগিচার উদয়ন ৪০/২ আবাসিক এলাকার শাহ এনামুল হকের পুত্র।
এদিকে, গত ১২ নভেম্বর নগরীর বালুচরে কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় আহত ফাহিম (১৫) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। নিহত ফাহিম দোয়ারাবাজার উপজেলার কান্দিগাঁও গ্রামের হারুন রশিদের পুত্র। পরিবারসহ ফাহিম নগরীর বালুচর ছাড়ারপাড় এলাকায় ভাড়া থাকতেন। ফাহিমের ভাই মামুন তার ভাইকে মারার জন্য বুলেট মামুন গ্রুপের লোকজনকে দায়ী করেন। এ ঘটনায় নিহত ফাহিমের পিতা অভিযোগ দায়ের করলে শাহপরান থানা পুলিশ সবুজ আহমদ রেহান নামে একজনকে আটক করেছে।
হাওয়াপাড়া গলির মুখে সংঘর্ষ
এ সব ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল শুক্রবার বিকেল ৫টার দিকে হাওয়াপাড়া গলির মুখে কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে দুই পক্ষের কিশোররা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়। এতে একজন কিশোর গুরুতর আহত হয়। আহত কিশোরকে তার সঙ্গে থাকা বন্ধুরা দ্রুত সিএনজি অটোরিক্সায় করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে, তার নাম ও পরিচয় জানা যায়নি। কাজিটুলা এলাকা ও জেলরোড এলাকার কিশোরদের মধ্যে স্কুল কেন্দ্রীক পূর্ব শত্রুতার জের ধরে এ ঘটনা ঘটেছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।




