পাওনার বিষয়টি গড়াল আদালত পর্যন্ত
লাফার্জহোলসিমের কাছে জালালাবাদ গ্যাসের বকেয়া ৭৮৬ কোটি টাকা
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ৯:০৯:২৭ অপরাহ্ন
ডাক ডেস্ক ॥ লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসি’র কাছে জালালাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেড(জেজিটিডিএসএল)-এর গ্যাস বিল বাবদ ৭৮৬ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। বকেয়া পরিশোধিত না হওয়ায় বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। জালালাবাদ গ্যাসের একটি দায়িত্বশীল সূত্র সিলেটের ডাক-কে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
সূত্র জানায়, বকেয়া পরিশোধে জালালাবাদ গ্যাসের নোটিশের পর গত ১৯ নভেম্বর জ্বালানি উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সময়ের আবেদন করে লাফার্জহোলসিম। আলোচনার ভিত্তিতে তাদেরকে ৭ দিনের সময় দেয়া হয়। এ সময়ের মধ্যে বকেয়া পরিশোধ না করে হাইকোর্টে যায় লাফার্জ। হাইকোর্ট সংযোগ বিচ্ছিন্নের উপর স্থিতাবস্থার আদেশ দেন। হাইকোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করে জালালাবাদ গ্যাস।
গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি খিজির আহমদ চৌধুরী শুনানি শেষে স্থিতাবস্থার আদেশ বাতিল করে দেন। এতে করে সংযোগ বিচ্ছিন্নের বাঁধা অপসারিত হয়। ওইদিন বিকেলের দিকে লাফার্জহোলসিম সিমেন্ট কারখানার সংযোগ বিচ্ছিন্নের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। অন্যদিকে, ওই আদেশ চ্যালেঞ্জ করে তাৎক্ষণিক চেম্বার আদালতে যায় লাফার্জহোলসিম। ওই মামলা শুনানির জন্য আগামী ১৫ ডিসেম্বর ধার্য তারিখ রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে শিল্পকারখায় গ্যাসের দাম বাড়ালে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিল নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়। এরপর একাধিক দফায় গ্যাসের দাম বাড়লেও লাফার্জ বর্ধিত মূল্য পরিশোধ থেকে বিরত ছিল। চুক্তির সময় ধার্য গ্যাস দর প্রায় ১১ টাকা ( প্রতি ঘনমিটার) বেশি বিল দিতে অপরাগতা জানায় লাফার্জহোলসিম।
জালালাবাদ গ্যাসের একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের অন্যান্য সিমেন্ট কারখানা ৩০ টাকা হারে (প্রতি ঘনমিটার) বিল প্রদান করলেও লাফার্জহোলসিম প্রায় ১১ টাকা দরে (আংশিক) বিল দিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, জেজিটিডিএসএল বিইআরসি ঘোষিত দরে বিল কষে যাচ্ছে। যার মোট যোগ ফল দাড়িয়েছে ৭৮৬ কোটি টাকা। একাধিক দফায় বিল প্রদানের নোটিশ দিয়ে ব্যর্থ হলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নেয় জালালাবাদ গ্যাস।
সূত্রমতে, ২০২০ সালে বর্ধিত বিল পরিশোধের জন্য চূড়ান্ত নোটিশ প্রদান করা হলে কোর্টে যায় লাফার্জহোলসিম। ২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি সংযোগ বিচ্ছিন্নের উপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা এবং বকেয়ার সমপরিমাণ টাকা ব্যাংক গ্যারান্টি আকারে আদালতে দাখিলের নির্দেশ প্রদান করেন। জালালাবাদ গ্যাস জবাবে লিভ টু আপিল দায়ের করলে বিইআরসি নির্ধারিত দরে গ্যাসের বিল প্রদান এবং বকেয়ার মধ্যে ১০ কোটি টাকা এক মাসের মধ্যে, অবশিষ্ট বকেয়া ৩ মাস পরপর ১০ কোটি করে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। আদেশ মোতাবেক ৯০ কোটি ২৫ লাখ টাকা বকেয়া পরিশোধ করে প্রতিষ্ঠানটি।
আদেশে আরও বলা হয়, বিল প্রদানে ব্যর্থ হলে ৭ ফেব্রুয়ারি দেওয়া সংযোগ বিচ্ছিন্ন করণের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বাতিল বলে বিবেচিত হবে। ওই আদেশের পর ২০২৩ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিইআরসি ঘোষিত দর অনুযায়ী বিল এবং বকেয়া বাবদ ৯০ কোটি টাকা জমা দেয় লাফার্জহোলসিম।
অন্যদিকে, ইন্টারন্যাশনাল আর্বিট্রেশন মামলায় (পিসিএ ২০২১-২১) দুই অনুপাত এক মেজরিটিতে এওয়ার্ড পায় লাফার্জ। এরপর তারা আগের দরে আংশিক বিল পরিশোধ শুরু করে। হাইকোর্ট বিভাগ আর্বিট্রেশন আবেদন (০৫/২০২১) দীর্ঘ শুনানী শেষে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রদান করেন। ওই আদেশের সার্টিফায়েড কপি গত ৩ আগস্ট পায় জালালাবাদ গ্যাস। এতে বলা হয়েছে, লিভ টু আপিল মামলায় (৬৯৪/২০২১) যে আদেশ দিয়েছে (কিস্তিতে বকেয়া পরিশোধ) তা এখনও বহাল রয়েছে। এর বিরুদ্ধে কোন রিভিউ কিংবা রিভিশন হয়নি।
সূত্র জানায়, বহুজাতিক কোম্পানিটির সঙ্গে ২০০৩ সালের ১৯ জানুয়ারি ২০ বছর মেয়াদী গ্যাস সরবরাহ চুক্তি করে জেজিটিডিএসএল। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি চুক্তি নবায়ন না করার চিঠি দেওয়া হয়েছিল। সরকার পরিবর্তনের পর বিষয়টি বদলে যায়। সমালোচনার মধ্যেই লাফার্জহোলসিমের সঙ্গে নতুন করে ১০ বছরের জন্য চুক্তি করা হয়েছে। এমনকি বিবদমান বকেয়া অমীমাংসিত রেখেই চুক্তি নবায়ন করা হয়।
অন্য একটি সূত্র জানায়, বাংলাদেশে ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে, গ্যাসের অভাবে অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও শিল্প বেকার বসে থাকছে। রাষ্ট্রায়ত্ব ৬ সার কারখানা গ্যাসের অভাবে বন্ধ, সরকারিভাবে উচ্চমূল্যে আমদানি করে সার সরবরাহ করতে হচ্ছে।
হোলসিম সুইজারল্যান্ড ও লাফার্জ প্যারিসভিত্তিক কোম্পানি। লাফার্জর বিশ্বের ৬৪টি দেশে, ৭০টি দেশে হোলসিমের কার্যক্রম ছিল। কোম্পানি দু’টি ২০১৪ সালে একীভূত হয় লাফার্জহোলসিম নাম ধারণ করে। সুনামগঞ্জের ছাতকে লাফার্জহোলসিমের সিমেন্ট কারখানা রয়েছে। এছাড়া কোম্পানিটির নারায়ণগঞ্জের মেঘনাঘাটে দুটি ও খুলনার মোংলায় একটি গ্রাইন্ডিং স্টেশন রয়েছে।




