‘লন্ডন যেতেও এত সময় লাগে না, যত সময় সিলেটে আসতে লাগে’
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৪৩:৫৬ অপরাহ্ন
মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম :
সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের শোচনীয় অবস্থার কথা তুলে ধরে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘ঢাকা থেকে সিলেট আসতে যত সময় লাগে, লন্ডন যেতেও এত সময় লাগে না।’
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সিলেটে ‘দ্য প্ল্যান, ইয়ুথ পলিসি টক উইথ তারেক রহমান’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে তরুণদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এ মন্তব্য করেন। আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে বিএনপির নির্বাচনী সমাবেশের আগে এয়ারপোর্ট রোডস্থ হোটেল গ্র্যান্ড সিলেট এন্ড রিসোর্টে এ অনুষ্ঠানে অংশ নেন তিনি। অনুষ্ঠানে সিলেটের ১৯টি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শতাধিক অরাজনৈতিক তরুণ অংশ নেন। এর মধ্যে মেডিকেল শিক্ষার্থীসহ প্রায় ১০ জন তাকে প্রশ্ন করার সুযোগ পান।
তারেক রহমান বলেন, ২০০৫ সালে বন্যার সময় আমি সিলেটে সড়ক পথে ৫ ঘণ্টায় পৌঁছি। কিন্তু, বুধবার ঢাকা থেকে আমাদের প্রচারের গাড়ি প্রায় ১০ ঘণ্টা সময়ে সিলেট এসে পৌঁছে। সিলেটের অনেক মানুষের লন্ডন যেতেও এতো সময় লাগে না। এটা হলো বিগত সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি। এই সড়কে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ৪-৫ ঘণ্টা সময় লাগলে তেল খরচও কম হতো। বিগত সরকারের আমলে আইটি পার্কের সাথে বড় বড় বিল্ডিং করা হলেও সেগুলো কোন কাজে আসেনি। আমরা এই জায়গাগুলোকে অ্যাকটিভ করতে চাই। সেখানে ওয়ার্কিং স্পেস গড়ে তুলতে চাই।
তারেক রহমান বলেন, গণতন্ত্র কেবল জাতীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, স্থানীয় সরকারব্যবস্থা থেকেই গণতান্ত্রিক চর্চা কার্যকর করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও স্থানীয় কমিউনিটি পর্যায়ে শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
তরুণদের দিকনির্দেশনা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘গণতন্ত্র হাজার বছরের চর্চার ফল। উন্নত দেশগুলোতে আমরা দেখি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসন পর্যন্ত সব জায়গায় গণতান্ত্রিক অনুশীলন কার্যকরভাবে রয়েছে।’
বাংলাদেশে রোগীর তুলনায় সরকারি হাসপাতাল ও চিকিৎসকের সংখ্যা অত্যন্ত কম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অর্থনৈতিক অক্ষমতার কারণে বহু মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানে সীমিত সম্পদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে হচ্ছে।’
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘একটি হাসপাতাল নির্মাণ করতে জমি অধিগ্রহণ, বাজেট, টেন্ডার সব মিলিয়ে দীর্ঘ সময় লাগে। অথচ রোগীরা সেই সময়ের মধ্যে চিকিৎসা পায় না। ’
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় ২০ লক্ষ লোক বারান্দায় বসে চিকিৎসা নেয়-এই মন্তব্য করে তিনি বলেন, জনগণের ভোটে বিএনপি আগামীতে ক্ষমতায় গেলে পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপের (পিপিপি) ভিত্তিকে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলো পরিচালনা করা হবে।
প্রতিটি জেলায় বিশেষায়িত হাসপাতাল করা বাস্তবসম্মত নয় বলে মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোতেও নির্দিষ্ট রোগের জন্য নির্দিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশেও পরিকল্পনা করতে হবে।’
প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘কমিউনিটি পর্যায়ে হেলথ কেয়ার ওয়ার্কারদের মৌলিক চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এতে সাধারণ রোগে ঘরে ঘরেই প্রাথমিক সেবা দেওয়া সম্ভব হবে এবং হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে।’
বিদেশে অদক্ষ শ্রমিক যাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর প্রায় ৭০ লাখ মানুষ বিদেশে যায়, যাদের বড় অংশই অদক্ষ। ফলে তারা দেশের অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখতে পারে না।’
তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিক করতে চাই। প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ভাষা শিক্ষা যুক্ত করা হবে, যাতে তরুণেরা জাপান, ইউরোপ কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে দক্ষ হিসেবে কাজ করতে পারে।’
নারী ক্ষমতায়নের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার সময় মেয়েদের শিক্ষায় বিনামূল্য ব্যবস্থা চালুর ফলে আজ নারী শিক্ষায় বড় অগ্রগতি হয়েছে। বিএনপি সরকারের পরিকল্পনায় ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হবে, যা পরিবারের প্রধান নারীর নামে দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে মাসিক ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা নগদ সহায়তা বা প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হবে। ক্ষমতায় এলে দেশের চার কোটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড প্রদান করা হবে।
তারেক রহমান আরও বলেন, ‘গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা অর্থ পেলে তা সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের স্বাস্থ্য ও ক্ষুদ্র বিনিয়োগে ব্যয় করেন। এতে স্থানীয় অর্থনীতি সচল হয় এবং নারীর আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক মর্যাদা বাড়ে।’
পরিবেশ সুরক্ষার সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক তুলে ধরে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, নাগরিকের কথা বলার অধিকার থাকলেই শহরের ময়লা ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণের মতো সমস্যা সমাধান সম্ভব। বিএনপি আগামী পাঁচ বছরে দেশজুড়ে ৮০ কোটি গাছ রোপণের পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রতিটি উপজেলায় সরকারি নার্সারির মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে চারা বিতরণ করা হবে। সিলেট নগরী ঢাকার চেয়ে অনেক পরিষ্কার বলে মন্তব্য করেন এই বিএনপি নেতা।
কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ‘এটি অর্থনীতির একটি বাস্তবতা। তবে অন্যায় হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যায়কারীকে গ্রেফতারের পাশাপাশি তার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। কৃষককে প্রতীকী সহায়তা নয়, বাস্তব ও কার্যকর সহায়তা দিতে হবে।’
এ সময় তারেক রহমানের স্ত্রী ডা: জোবায়দা রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও আরিফুল হক চৌধুরী এবং বিএনপি’র কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকীসহ চেয়ারম্যানের সফরসঙ্গীরা উপস্থিত ছিলেন।




