আলিয়া মাদ্রাসা মাঠের জনসভায় জামায়াতের আমির ডা: শফিকুর রহমান
একবার আমাদের সুযোগ দিন, আপনাদের জীবন, সম্পদ আর ইজ্জতের পাহারা দেব
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১১:২২:০৫ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী/ নূর আহমদ :
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘একবার আমাদের সুযোগ দিন। আপনাদের মালিক হব না। আপনাদের জীবন, সম্পদ আর ইজ্জতের পাশে দাঁড়িয়ে আমরা চৌকিদারের কাজ করব। পাহারা দেব ইনশাআল্লাহ।’ গতকাল শনিবার বিকেলে সিলেট নগরীর আলিয়া মাদরাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এইভাবে ভোট প্রার্থনা করেন। একই সাথে জামায়াত আমির বলেন, ক্ষমতায় গেলে দেশের এক ইঞ্চি জমিতেও বেইনসাফি সহ্য করা হবে না। দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির রুট বন্ধ করতে পারলে পাঁচ বছরের মধ্যেই দেশের চেহারা পাল্টে দেওয়া সম্ভব।
সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির মুহম্মদ ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে জনসভায় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, আল্লাহতালা যদি আমাদেরকে এই দেশের সেবকের দায়িত্ব দেন, তা হলে এক ইঞ্চি মাটির ওপর কেউ আর চাঁদাবাজির হাত বাড়ানোর সাহস করতে পারবে না।
রাষ্ট্রীয় দপ্তরগুলোর দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, কোনো অফিস-আদালত বা কার্যালয়ে কারো ঘুষ নেওয়ার প্রয়োজন হবে না এবং ঘুষ খাওয়ার সাহসও হবে না। কিন্তু সম্মানের সঙ্গে বসবাস করার নিশ্চয়তা পাবে প্রতিটি নাগরিক। তিনি দাবি করেন, নাগরিকের মর্যাদা নিশ্চিত না করে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়া সম্ভব নয়। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য যে বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইনসাফভিত্তিক নয়। সম্মানজনকভাবে জীবনযাপনের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই এটা পর্যাপ্ত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে ডা: শফিকুর রহমান আরও বলেন, আপনি তার একান্ত প্রয়োজন পূরণ না করে, সে যদি তার প্রয়োজন পূরণের জন্য কোনো অপরাধ করে রাষ্ট্রের কোনো অধিকার নাই ওই অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়ার। আগে তাকে সম্মানজনকভাবে বাঁচার সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে।
দুর্নীতিবাজদের উদ্দেশ্যে কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে জামায়াত আমির বলেন, যারা জনগণের হক আত্মসাৎ করেছে, তারা যদি স্বেচ্ছায় ফেরত দেয় তাহলে অবশ্যই তারা অভিনন্দিত হবে। কিন্তু যদি ফেরত না দেয়, রাষ্ট্র ইনশাআল্লাহ ওদের মুখের ভেতর দিয়ে হাত ঢুকিয়ে পেটের ভেতর থেকে বের করে নিয়ে আসবে।
তিনি বলেন, উদ্ধার করা অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যুক্ত করা হবে এবং সেই অর্থ দিয়েই উন্নয়ন কাজ পরিচালিত হবে। “যে এলাকা যত বেশি বঞ্চিত, সেই এলাকাতেই সর্বপ্রথম উন্নয়নের কাজ শুরু হবে,” বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমি প্রধানমন্ত্রী হব কি না আল্লাহ ভালো জানেন। কে হবেন, কে হবেন না এটা আল্লাহর ফয়সালা।” তবে দায়িত্ব পেলে ইনসাফের প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি দৃঢ় অবস্থান জানান। তিনি বলেন, যদি এমন কিছু আমার দায়িত্বে এসে যায়, আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই ৫৪ হাজার বর্গমাইলের এক ইঞ্চিতেও আমি বেইনসাফি করতে পারব না। প্রতি ইঞ্চি মাটি তখন আমার কাছে তার পাওনা বুঝে নেবে।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, ‘একটা দল মা বোনদের সম্মান দিতে পারে না-এটার প্রতিবাদ করায় আমার বিরুদ্ধে মিসাইল ছুঁড়তে শুরু করেছে। হাতে হাত মিলিয়ে আমার চরিত্র হনন করা হচ্ছে। কিন্তু এরা জানে না আধুনিক বিশ্বে মিসাইল ছুঁড়লে এন্ট্রি মিসাইলও খেতে হয়।’ এসময় তিনি যারা তার চরিত্র হননে নেমেছে-তাদেরকে মাফ করে দেওয়ার কথাও বলেন।

জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, জাগপার সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা রেজাউল করিম জালালী ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারী জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা।
সিলেট মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারী মো: শাহজাহান আলীর পরিচালনায় রাশেদ ইকবালের পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সুচিত জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর ও সিলেট-৬ আসনে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরা সদস্য, সিলেট জেলা আমীর ও সিলেট-১ আসনে জামায়াত ও ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান, জামায়াতের সিলেট অঞ্চল টীম সদস্য হাফিজ আব্দুল হাই হারুন, সুনামগঞ্জ জেলা আমীর ও সুনামগঞ্জ-১ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাওলানা তোফায়েল আহমদ খান, সিলেট জেলা নায়েবে আমীর হাফিজ আনওয়ার হোসাইন খান, অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নান, সাবেক দক্ষিণ সুরমা উপজেলা চেয়ারম্যান মাওলানা লোকমান আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিলেট মহানগর সভাপতি মাওলানা এমরান আলম, খেলাফত মজলিসের সিলেট মহানগর সভাপতি হাফিজ মাওলানা তাজুল ইসলাম হাসান ও সিলেট মহানগর ছাত্রশিবিরের সভাপতি শাহীন আহমদ।
জনসভা শেষে ১১ দলীয় জোট মনোনীত সিলেট-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানের হাতে দাঁড়িপাল্লা, সিলেট-২ আসনের খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদ মুনতাসির আলীর হাতে দেয়াল ঘড়ি, সিলেট-৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজুর হাতে রিক্সা, সিলেট-৪ আসনে জামায়াত প্রার্থী জয়নাল আবেদীনের হাতে দাঁড়িপাল্লা, সিলেট-৫ আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসানের হাতে দেয়াল ঘড়ি ও সিলেট-৬ আসনে জামায়াত প্রার্থী মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন। এছাড়া জনসভায় সুনামগঞ্জ-১ আসনে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা তোফায়েল আহমদ খানের হাতে দাঁড়িপাল্লা, সুনামগঞ্জ-২ আসনের প্রার্থী এডভোকেট শিশির মনিরের অনুপস্থিতিতে তার দাঁড়িপাল্লা প্রতীক গ্রহণ করেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের জামায়াত প্রার্থী এডভোকেট শামছ উদ্দিনের হাতে দাঁড়িপাল্লা ও সুনামগঞ্জ-৫ আসনের জামায়াত প্রার্থী মাওলানা আব্দুস সালাম আল মাদানীর হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন।
জনসভায় উপস্থিত ছিলেন- এনসিপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এহতেশামুল হক, লেবারপার্টির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান খালেদ, এলডিপির সিলেট মহানগর সভাপতি মোজাম্মেল হোসেন লিটন, এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদ ও সিলেট মহানগর সভাপতি এডভোকেট আব্দুর রহমান আফজল, এবি পার্টির সিলেট মহানগর আহ্বায়ক মো. ওমর ফারুক, জাগপা সিলেট মহানগর সভাপতি শাহজাহান আহমদ লিটন ও বিডিপি সিলেট মহানগর আহ্বায়ক কবির আহমদ প্রমূখ।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী জেনালের ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, সিলেটবাসীর সামনে এক সুবর্ণ সুযোগ এসেছে। এই অঞ্চল থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনে সিলেটবাসীকে জামায়াত সমর্থিত ১১ দলীয় জোট প্রার্থীদের ভোট প্রদানের মাধ্যমে সেই অগ্রযাত্রায় অংশ নিতে হবে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) সহ সভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান তার বক্তব্যে বিএনপির কঠোর সমালোচনা করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ইঙ্গিত করে ‘লন্ডনী মুফতি’ আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, “লন্ডন থেকে এক মুফতি এসেছেন আপনারা জানেন? উনাকে আমীরে জামাত মুখোমুখি বিতর্কের আহ্বান জানিয়েছেন, কিন্তু উনি সেই সৎ সাহস পাচ্ছেন না। গতকাল শনিবার দ্বিতীয়বারের মতো আহ্বান জানানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “উনি প্রধানমন্ত্রী হতে চান, অথচ আমীরে জামাতের সাথে সামনাসামনি কথা বলার সাহস অর্জন করতে পারছেন না। এ কেমন গুপ্ত আচরণ?”
রাশেদ প্রধান তার বক্তব্যে নেতৃত্বের সংজ্ঞা তুলে ধরে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী হতে হলে শুধু নিজ দলের নেতা হলে হয় না, ১৮ কোটি মানুষের নেতা হতে হয়। আমাদের দেশে ১৮ কোটি মানুষের নেতা একজনই আছেন তিনি এই সিলেটের সন্তান ডা. শফিকুর রহমান।”
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর মাওলানা রেজাউল করিম জালালী- দীর্ঘদিনের শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের প্রতি সমর্থন জানানোর আহবান জানান। আধিপত্যবাদীদের হাত থেকে ইসলাম, দেশ ও জাতিকে রক্ষায় ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে হবে।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারী জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা বলেন, আগামী ১২ তারিখ এক নতুন সূর্যোদয় হবে। যে সূর্যোদয় হবে তারুণ্যের জয়ের, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। তরুণ প্রজন্মকে সেই বিজয়মুকুট নিয়ে আসতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে সিলেট মহানগর আমীর মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, সিলেটের আলিয়া মাঠের জনস্রোত প্রমাণ করেছে সিলেটের মানুষ ইনসাফের পক্ষে সাড়া দিয়েছেন। আগামী নির্বাচনে গণভোটে ‘হ্যা’ কে এবং ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের বিজয়ী করার মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা পূরণে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।




