ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন
সাঙ্গ হলো প্রচারণা, ভোট উৎসবে মেতে উঠার অপেক্ষা
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৮:৩৭:০৯ অপরাহ্ন
নূর আহমদ :
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট প্রয়োগের আর বাকি মাত্র ২ দিন। এটি জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে সাঙ্গ হয়েছে প্রচার-প্রচারণা। এবার শুধু ভোট উৎসবে মেতে উঠার অপেক্ষা। ফ্যাসিস্ট আমলের ১৬ বছর বিতর্কিত একতরফা নির্বাচনের কারণে ভোট দিতে না পারা প্রজন্ম এক অন্যরকম উৎসাহে ভোট কেন্দ্রে যাবে। আছে হ্যাঁ- না ভোট দেয়ার অভিজ্ঞতাও। ফলে জেন-জি প্রজন্মসহ নাগরিকদের মাঝে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা বিরাজ করছে। অন্যদিকে নির্বাচনে ভোটগ্রহণ স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য করতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সংশ্লিষ্ট দপ্তর সমূহ। সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে নির্বাচনী এলাকার কেন্দ্রগুলোতে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের শরীরে সংযুক্ত বডি-ওর্ন ক্যামেরায় ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা হবে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ(এসএমপি)-এর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচন উপলক্ষে আজ মঙ্গলবার বিকেল ৩টায় সিলেট জেলা স্টেডিয়াম থেকে যৌথবাহিনীর টহল ও মহড়া অনুষ্ঠিত হবে। এতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ, র্যাব, বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী,নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটগণ অংশগ্রহণ করবেন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, সিলেট জেলায় মোট ভোটার ৩১ লাখ ১৩ হাজার ৩৯৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৯৭০ জন, মহিলা ১৪ লাখ ৮৮ হাজার ৪০৮ জন এবং হিজড়া ভোটার রয়েছেন ১৮ জন। অন্যদিকে সিলেট জেলায় যে ৬টি নির্বাচনী আসন রয়েছে এর মধ্যে সিটি কর্পোরেশন ও সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসন নগর পুলিশের ছয়টি থানায় পড়েছে। আর সিলেট-৩ আসনে তিনটি উপজেলার মধ্যে দক্ষিণ সুরমা উপজেলার বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র নগর পুলিশের দুটি থানায় আওতায় রয়েছে। এছাড়াও সিলেট-২, ৪, ৫, ৬ ও ৩ আসনের দুটি উপজেলাসহ বাকি ভোট কেন্দ্রগুলো জেলা পুলিশের অধীনে।
অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রের বরাত দিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, মহানগরীর ‘অধিক গুরুত্বপূর্ণ’ কেন্দ্রগুলোতে চারজন করে অস্ত্রসহ পুলিশ, দুইজন অস্ত্রধারী আনসার, প্রতি কেন্দ্রে লাঠিসহ ১০ জন পুলিশ ও মহিলা আনসার মোতায়েন থাকবে। এছাড়া ‘গুরুত্বপূর্ণ’ ও ‘সাধারণ’ কেন্দ্রগুলোতে থাকবে তিনজন করে অস্ত্রধারী পুলিশ, দুইজন অস্ত্রধারী আনসার, প্রতি কেন্দ্রে লাঠিসহ ১০ জন পুলিশ ও মহিলা আনসার মোতায়েন থাকবে।’
এ ব্যাপারে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, মহানগর পুলিশের আওতায় মোট ২৯৪টি ভোট কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ৯৫, গুরুত্বপূর্ণ ১৩৪ ও সাধারণ ৬৫টি কেন্দ্র রয়েছে। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার জন্য ইতিমধ্যে ২৩৪টি বডি-ওর্ন ক্যামেরা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সাথে মহানগরী এলাকায় ২ হাজার ২শ’ পুলিশ সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবেন। একই সাথে ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স মোতায়েন থাকবে।
দূরত্ব, ভোটারের সংখ্যা ও দুর্গম এলাকার কারণে ১০৩টি কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিলেট জেলা পুলিশের গণমাধ্যম কর্মকর্তা মো. সম্রাট তালুকদার। তিনি জানান, জেলার ৬১৯টি কেন্দ্রকে ‘সাধারণ’ কেন্দ্র ধরা হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এজন্য সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও আনসার সদস্যদের সমন্বয়ে প্রতিটি কেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
সিলেটের ডিআইজি মো. মুশফেকুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, অতি ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হবে। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা ভিডিও ধারণ করবেন। এসব ভিডিও পরবর্তী তদন্তে ডিজিটাল প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে।’
সিলেটের রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় জানিয়েছে, ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, ভোটগ্রহণের প্রায় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে প্রশাসন। নির্বাচনকে সামনে রেখে কয়েক স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়ছে। এবারের নির্বাচনে প্রথম বারের মতো প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে থাকছে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা। এছাড়াও পুলিশের সঙ্গে থাকবে বডি ওর্ন ক্যামেরা।
অপরদিকে ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রচারণা শেষ করার বাধ্যবাধকতার কারণে আজ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হয়েছে প্রচারণা। তবে কার্যত গতকাল সোমবারই ছিল প্রচার প্রচারণার শেষ দিন। শেষ দিনে গণসংযোগ, মতবিনিময়, পথসভা আর গণমিছিলে মুখর ছিল সিলেট নগরী। এবার কেবল ভোটগ্রহণের পালা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নির্বাচনি গণমিছিল, গণসংযোগ ও পথসভায় সরগরম ছিল সিলেট-১ (সিটি কর্পোরেশন-সদর উপজেলা) আসন। গতকাল সোমবার প্রার্থীরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়েছেন। বড় রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিভিন্ন সভা, সমাবেশ ও গণসংযোগের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে নিজেদের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন।
মর্যাদাপূর্ণ সিলেট-১ (নগর-সদর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির গতকাল সোমবার নগরীর বন্দরবাজার, সোবহানীঘাট ও উপশহরসহ শহরজুড়ে নির্বাচিন শোডাউন দিয়েছেন। বিশাল শোডাউনে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও তার সমর্থকেরা ছিলেন বেশ উৎফুল্ল। খন্দকার মুক্তাদিরও ট্রাকে উঠে হাত নেড়ে ভোটারদের শুভেচ্ছা জানান এবং ধানের শীষে ভোট প্রার্থনা করেন।
১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানও সোমবার নগরীর কোর্ট পয়েন্ট ও শেখঘাটসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচার মিছিলে অংশ নেন। দাঁড়িপাল্লা মার্কাকে বিজয়ী করার আহবান জানান সিলেটের প্রবীণ এই রাজনীতিবিদ। এই আসনে দুই প্রার্থী ছাড়াও ভোটের মাঠে রয়েছেন বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রণব জ্যোতি পাল, ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের মো: শামীম মিয়া, গণঅধিকার পরিষদের আকমল হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের মাহমুদুল হাসান ও বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্কসবাদী) প্রার্থী হিসেবে সঞ্জয় কান্তি দাস। শেষ মুহূর্তে এসে তারাও ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। এই আসনে মোট ভোটার রয়েছেন ৬ লাখ ৬৬ হাজার ৩শ ৩০ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ৩ লাখ ৪২ হাজার ৬শ ৩৭ জন, মহিলা ভোটার ৩ লাখ ২৩ হাজার ৬শ ৮০ জন ও হিজড়া ভোটার ১৩ জন। কেন্দ্র রয়েছে মোট ২শ ১৫ টি।
সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে গুম হওয়া বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী তাহসিনা রুশদীর লুনা নির্বাচনে লড়ছেন। এই আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলীকে (দেওয়াল ঘড়ি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. আমির উদ্দিন (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির মাহবুবুর রহমান চৌধুরী (লাঙ্গল) এবং গণফোরামের মো. মুজিবুল হক (উদীয়মান সূর্য) প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এই আসনে মোট ভোটার রয়েছেন ৩ লাখ ৬৪ হাজার ৮৩ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৪ হাজার ৫শ ৮১জন, মহিলা ভোটার ১ লাখ ৭৯ হাজার ৫শ ২ জন । কেন্দ্র রয়েছে মোট ১শ ২৮ টি।
সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও বালাগঞ্জ) আসনে মোট ভোটার রয়েছেন ৪ লাখ ৯ হাজার ৮শ ৯০ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৬ হাজার ৬শ ৮৪জন, মহিলা ভোটার ২ লাখ ৩ হাজার ২শ ৪ জন। হিজড়া রয়েছেন ২ জন। কেন্দ্র রয়েছে মোট ১শ ৫১ টি। এই আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন মোহাম্মদ আব্দুল মালিক এবং জামায়াত জোটের শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজু রয়েছেন। এই আসনে জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আতিকুর রহমান (লাঙ্গল), স্বতন্ত্র প্রার্থী মোস্তাকিম রাজা চৌধুরী (ফুটবল) ও মইনুল বকর (কম্পিউটার) প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
সিলেট-৪ (কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট) আসনে বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সিলেট সিটির সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী (ধানের শীষ), অন্য জন জেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন (দাঁড়িপাল্লা) নিয়ে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। এই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা জাহিদ আহমেদ (হাতপাখা), গণঅধিকার পরিষদের জহিরুল ইসলাম (ট্রাক) ও জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ মজিবুর রহমান (লাঙ্গল) প্রতীক নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। এই আসনে মোট ভোটার রয়েছেন ৫ লাখ ৮ হাজার ১শ ১৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৬২ হাজার ৭শ ৪৫ জন, মহিলা ভোটার ২ লাখ ৪৫ হাজার ৩শ ৭২ জন। হিজড়া রয়েছেন ১ জন। কেন্দ্র রয়েছে মোট ১শ ৭২ টি।
সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট) আসনে মোট ভোটার রয়েছেন ৪ লাখ ২০ হাজার ৮শ ৪৫ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৪ হাজার ৩শ ২৬ জন, মহিলা ভোটার ২ লাখ ৬ হাজার ৫শ ১৯ জন। কেন্দ্র রয়েছে মোট ১৫৮ টি। এই আসনে বিএনপি ও জামায়াত কেউই নিজেদের প্রার্থী দেয়নি। দুটি দলই জোটের প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে। এর মধ্যে বিএনপি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে (খেজুর গাছ) সমর্থন দিয়েছে। অন্যদিকে খেলাফত মজলিসের মুফতি মাওলানা মোহাম্মদ আব্দুল হাসানকে (দেওয়াল ঘড়ি) সমর্থন দিয়েছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এছাড়া সিলেট জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি (বহিষ্কৃত) মামুনুর রশীদ স্বতন্ত্র প্রার্থী (ফুটবল) হয়েছেন। এছাড়া বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মাওলানা মো. বিল্লাল উদ্দিন (হারিকেন) প্রতীক লড়ছেন।
সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ) আসনে এবার লড়ছেন পাঁচ প্রার্থী। এরমধ্যে রয়েছেন বিএনপির অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, স্বতন্ত্র প্রার্থী ফখরুল ইসলাম, গণঅধিকার পরিষদের জহিদুর রহমান (ট্রাক) ও জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ আবদুন নূর (লাঙ্গল)।




