সংবিধান সংস্কারে গণভোট আজ, সিলেটে প্রথম গণভোট হয় ১৯৪৭ সালে
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৬:১৩:৪৫ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী :
জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে আজ বৃহস্পতিবার দেশে গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের পাশাপাশি ভোটাররা গণভোটও প্রদান করবেন। একই সাথে দুটো নির্বাচন হওয়ায় রয়েছে পৃথক ব্যালট পেপার। ভোটারগণ ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোটের মাধ্যমে গণভোট দেবেন। দেশে চতুর্থবারের মতো আজকের গণভোট হলেও সিলেটবাসীর জন্য এটি পঞ্চম গণভোট। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের (ভারত-পাকিস্তান) সময় গণভোটের মধ্য দিয়ে আসাম থেকে পৃথক হয় সিলেট।
জানা গেছে, স্বাধীন বাংলাদেশের সর্বপ্রথম গণভোট হয়েছিল ১৯৭৭ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে। এরপর দ্বিতীয় গণভোট হয় ১৯৮৫ সালে রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে। তৃতীয় দফায় ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় গণভোট। আজ চতুর্থবারের মতো গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এবার চারটি বিষয়ে গণভোট
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই জাতীয় সনদের সংবিধান সম্পর্কিত সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নে আজ চারটি বিষয়ে গণভোট হচ্ছে।
(ক) নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।
(খ) আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।
(গ) সংসদে নারী প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল হতে ডেপুটি স্পীকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে একমত হয়েছে- সেগুলো বাস্তবায়ন জাতীয় সংসদ নিশ্চিত করতে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকবে।
(ঘ) জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা।
অতীতের গণভোট
সংবাদ পত্রে প্রকাশিত তথ্য মোতাবেক, ১৯৭৭ সালের ৩০ মে দেশে প্রথমবারের মতো গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এর লক্ষ্য ছিল, সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া জিয়াউর রহমানের শাসনকাজের বৈধতা দেওয়া। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তাঁর নীতি – কর্মসূচির প্রতি আস্থা আছে কি না, সে বিষয়ে দেশের জনগণের মতামত জানতে ওই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল।
১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়ে জাতির উদ্দেশ্যে বেতার ও টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে গণভোটের ঘোষণা দিয়েছিলেন।
ওই বছরের ৩১ মে দৈনিক ইত্তেফাকের খবরে জানা যায়, সারা দেশে ২১ হাজার ৬৮৫টি কেন্দ্রে ৩০ মে সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোট নেওয়া হয়। ওই সময় দেশে মোট ভোটার ছিলেন ৩ কোটি ৮৪ লাখ।
সেই গণভোটে ৮৮ দশমিক ১ শতাংশ মানুষ ভোট দিয়েছিলেন। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল ৯৮ দশমিক ৯ শতাংশ। অন্যদিকে ‘না’ ভোট পড়েছিল ১ দশমিক ১ শতাংশ।
এরপর দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ। রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নীতি ও কর্মসূচি এবং স্থগিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের ওপর জনগণের আস্থা আছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য ওই গণভোটের আয়োজন হয়েছিল। আগের মতোই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ এই পদ্ধতিতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সেই গণভোটে ভোট পড়েছিল ৭২ দশমিক ২ শতাংশ। এর মধ্যে ‘হ্যাঁ’ ভোট ছিল ৯৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ‘না’ ভোট ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।
জানা গেছে, গণ আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করলে এর ৩ মাসের মধ্যে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি বিজয়ী হয়। টানা ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে প্রধানমন্ত্রীশাসিত সংসদীয় পদ্ধতির (পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি) সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট মধ্যরাতে সর্বসম্মতিক্রমে সংসদে বিল পাস হয়।
ওই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, এরশাদবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ‘তিন জোটের রূপরেখা’ অনুযায়ী জাতীয় সংসদে গৃহীত সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠার পর সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীতে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে থাকা বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ সম্মতি দেবেন কি না, সে প্রশ্নে দেশব্যাপী গণভোট আয়োজনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
দেশের ইতিহাসে অনুষ্ঠিত ওই তৃতীয় গণভোটে ভোট পড়ে ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ। ১ কোটি ৮৩ লাখ ৮ হাজার ৩৭৭ জন ভোটার সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে, অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন। এই হার ৮৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অন্যদিকে ৩৩ লাখ ৯০ হাজার ৬২ জন ভোটার ‘না’ ভোট দেন। অর্থাৎ তাঁরা রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসনব্যবস্থার পক্ষে মত দেন। ‘না’ ভোটের হার ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। গণভোটে ৯৯ দশমিক ১৩ শতাংশ বৈধ ভোটের বিপরীতে বাতিল হয়েছিল শূন্য দশমিক ৮৭ শতাংশ ভোট।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিলে আবারও গণভোটের বিষয়টি সামনে আসে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বৈঠকে জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংস্কারের বৈধতা দিতে গণভোট আয়োজনে মতৈক্য হয়। জামায়াতে ইসলামীসহ কয়েকটি দল জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের আয়োজনের দাবি তুলে। অন্যদিকে বিএনপিসহ অন্যান্য দল বলছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে আয়োজন করতে। এসব বাস্তবতায় দেশে চতুর্থ দফায় আজ গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোট নিয়েও ভোটারদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে।
১৯৪৭ সালের সিলেটে সেই গণভোট
প্রায় আট দশক আগে ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই সিলেটে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
সেই গণভোট ছিল দেশভাগের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ওই গণভোট নির্ধারণ করে দিয়েছিল সিলেট অঞ্চলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
দেশভাগের সময়ে সিলেট জেলা ছিল আসাম প্রদেশের অংশ। আসাম প্রদেশ মূলত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকলেও সিলেট জেলা ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ও সিলেটী ভাষাভাষী।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈ ১৯৪৬ সালে সিলেটকে পূর্ব বাংলার (পূর্ব পাকিস্তান) কাছে হস্তান্তরের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এরপরে ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই ভোটে ৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮১৫ জন ভোটারের মধ্যে প্রায় ৭৭ শতাংশ ভোটার ভোট দেন। সেই গণভোটে পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৯ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন আর আসামের পক্ষে (ভারতের পক্ষে) ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন ১ লাখ ৮৪ হাজার ০৪১ জন।
সেই গণভোটে সিলেটিরা পাকিস্তানের অংশ হলেও করিমগঞ্জ মহকুমার কিছু অংশ আসাম প্রদেশেই (ভারত) থেকে যায়।



