সিলেট অঞ্চলের ৫ আসনের দিকে ভোটারদের বিশেষ দৃষ্টি
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৬:২৪:২৮ অপরাহ্ন
মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম :
১৯টিতে ভোট হলেও সিলেট বিভাগের পাঁচটি আসনের দিকে ভোটাররা রাখছেন বিশেষ দৃষ্টি। আসনগুলো হচ্ছে-সিলেট-১, সিলেট-২, সিলেট-৪, হবিগঞ্জ-১ ও সুনামগঞ্জ-২। এসব আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আলোচিত ও হেভিওয়েট প্রার্থীরা। প্রচলিত একটি মিথ রয়েছে, সিলেট-১ আসনে যে দল বা ব্যক্তি বিজয়ী হয়, সেই দল সরকার গঠন করে ; এ কারণে আসনটি সারাদেশের মানুষের কাছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের দুই বারের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার পুত্র রেজা কিবরিয়া ও সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী এডভোকেট শিশির মনিরের আসনের প্রতিও ভোটারদের আকর্ষণ বেশি।
সিলেট-১:
সিলেট সিটি কর্পোরেশন ও সিলেট সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসনে স্বাধীনতার পর থেকেই যে প্রার্থী বিজয়ী হন, তার দল সরকার গঠন করে-এমন রীতি চলে আসছে। এ আসনেই ৩৬০ আউলিয়ার অন্যতম হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহপরান (র.) শায়িত রয়েছেন। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো দুই ওলির মাজার জিয়ারত ও ফাতেহা পাঠের মধ্য দিয়ে তাদের নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবারও সিলেট থেকে মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে তাঁর নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেন। এ আসনে বিএনপি’র প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এবারও তিনি এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা খন্দকার মুক্তাদির ‘আকাঙ্খার সিলেট’ নামে ১১ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সিলেটে নতুন শিল্প স্থাপনের পাশাপাশি তরুণদের তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদানসহ বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে উৎসাহিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সিলেট জেলা জামায়াতের আমীর। এ আসনে তিনি এবার প্রথমবারের মতো প্রার্থী হয়েছেন। ২০০৮ সালে তিনি বিএনপি জামায়াত জোটের প্রার্থী সিলেট-৫( গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। মাওলানা হাবিব তাঁর নির্বাচনী ইশতেহারে সন্ত্রাস, দুর্নীতি, চাঁদাবাজ ও দখলদারমুক্ত সিলেট প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছেন।
সিলেট-২:
বালাগঞ্জ-বিশ^নাথ উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটি ‘মাইনাস ইলিয়াস আলী’ ফর্মূলার কারণে বেশ আলোচিত। ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল এম ইলিয়াস আলী ‘নিখোঁজ’ হবার পর থেকে এ আসনটিতে আলোচনায় ছিলেন তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা। লুনার দাবি, আওয়ামী লীগ সরকার তাকে ‘গুম’ করেছে। এবার তিনি এ আসনে বিএনপি’র প্রার্থী। শুরুতে তার প্রার্থীতা নিয়ে দলের মধ্যে কিছুটা বিভাজন থাকলেও তার পক্ষে এখন দলের নেতা-কর্মীরা ঐক্যবদ্ধ। এ আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের শরীক খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলী। তার পক্ষে জামায়াতসহ অন্যান্য দলগুলো সরব রয়েছে।
সিলেট-৪:
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের দুই বারের নির্বাচিত মেয়র ছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। বিএনপি’র কাছে তিনি শহর খ্যাত সিলেট-১ আসন দাবি করলেও দলের পক্ষ থেকে তাকে পার্শ্ববর্তী সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী করা হয়েছে। এ আসনের কোম্পানীগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও গোয়াইনঘাট আসনের বিএনপি নেতা-কর্মীরা তার পক্ষে একাট্টা। পাশাপাশি বিএনপি’র শরীক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের নেতা-কর্মীদেরও তার পক্ষে প্রচারণায় দেখা যায়। এ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হচ্ছেন-সিলেট জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন। তার বাড়ি উপজেলার জৈন্তাপুরে। তাকে ‘লোকাল’ প্রার্থী ঘোষণা দিয়ে তার সমর্থকরা ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা চালাচ্ছেন। পাশাপাশি জোটের শরীক অন্যান্য দলের নেতা-কর্মীদেরও তার সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।
হবিগঞ্জ-১:
নবীগঞ্জ-বাহুবল উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে রেজা কিবরিয়া। নির্বাচনের কিছুদিন পূর্বে তিনি বিএনপিতে যোগদান করেন এবং তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন অর্থনীতিবিদ। এ আসনে তার শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি’র বিদ্রোহী সাবেক এমপি শেখ সুজাত মিয়া। এ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের রিক্সা প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা সিরাজুল ইসলাম।
সুনামগঞ্জ-২:
দিরাই ও শাল্লা উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে জামায়াত জোটের প্রার্থী সুপ্রীম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী এডভোকেট শিশির মনির যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলাসহ বেশ কয়েকটি আলোচিত মামলার আইনজীবী ছিলেন। দেশব্যাপী তার পরিচিতি। এবার প্রথমবারের মতো ভোটের মাঠে নেমে তিনি সাধারণ ভোটারদের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হন। এ আসনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক একাধিকবারের এমপি, সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক নাছির উদ্দিন চৌধুরী। ভোটাররা বলছেন, এ আসনে এ দুই প্রার্থীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ভোটারদের ধারণা।
সুজন সভাপতির বক্তব্য:
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেট চ্যাপ্টারের সভাপতি এডভোকেট সৈয়দা শিরিন আখতার বলেন, আমরা একটি শান্তিপূর্ণ ও রক্তপাতহীন নির্বাচন দেখতে চাই। নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল সহনশীল আচরণ করবে-এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, নির্বাচনে একদল জিতবে, একদল হারবে-এটাই স্বাভাবিক। নির্বাচনী ফলাফল মেনে নিয়ে দলগুলো একসাথে দেশ গঠন করবে-এটাই তার আশা। হেভিওয়েট প্রার্থীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জনগণ যাকে ভোট দেবে-তিনিই সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন।
সিলেটের জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মো: সারওয়ার আলম জানান, ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কেউ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর হস্তে দমন করা হবে। সিলেটে এখন বড় ধরনের নির্বাচনী সহিংসতা ঘটেনি বলে জানান তিনি।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনে যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আমাদের মোবাইল টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত রয়েছে।
প্রসঙ্গত, সিলেট বিভাগে সবমিলিয়ে ১৯টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৬টি, সুনামগঞ্জে ৫টি এবং হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলায় ৪টি করে আসন রয়েছে। এ বিভাগের মোট ভোট কেন্দ্র ২ হাজার ৮৮১টি । এর মধ্যে ১ হাজার ১২৬টি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিভাগের ৫টি আসনে বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যে কারণে এসব আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থীরা কিছুটা বেকায়দায় রয়েছেন।
অতীতে সিলেট-১ আসনের এমপি ছিলেন যারা ॥
১৯৯১ সালে এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন খন্দকার আব্দুল মালিক। ওই বছর সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে কেবল সিলেট-১ আসনে বিজয়ী হয়েছিল বিএনপি। ১৯৯৬ সালে এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন সাবেক স্পিকার মরহুম হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। ২০০১ সালে সিলেট সদর আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করে বিএনপির এম সাইফুর রহমানের কাছে হেরে যান সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে সাইফুর রহমানকে বিপুল ভোটে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় বিনা ভোটেই দ্বিতীয় মেয়াদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। আর ২০১৮ ও ২০২৪ সালে এ আসনের এমপি নির্বাচিত ড. এ কে আব্দুল মোমেন। এর আগে ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেওয়ান ফরিদ গাজী এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন। এছাড়া, ২য় সংসদ নির্বাচনে খন্দকার আব্দুল মালিক, ৩য় ও ৪র্থ সংসদ নির্বাচনে হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী এ আসন থেকে এমপি নির্বাচিত হন।



