প্রথমবার এমপি হয়েই মন্ত্রী মুক্তাদির-আরিফ
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯:০৯:২৫ অপরাহ্ন
মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম :
প্রথমবার এমপি হয়েই পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী হলেন সিলেটের খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও আরিফুল হক চৌধুরী। এর মধ্যে খন্দকার মুক্তাদিরকে তিনটি এবং আরিফুল হককে দুটি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির পেয়েছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। আর সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য আরিফুল হক চৌধুরী পেয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। প্রতিক্রিয়ায় দুই মন্ত্রীই নির্বাচনী এলাকার মানুষের প্রত্যাশা পূরণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।
খন্দকার মুক্তাদির ॥
সিলেট সিটি কর্পোরেশন ও সিলেট সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-১ আসনে স্বাধীনতার পর থেকেই যে প্রার্থী বিজয়ী হন, সেই দল সরকার গঠন করে-এমন মিথ প্রচলিত। এবারও এর ব্যত্যয় হয়নি, এ আসনের বিজয়ী এমপি খন্দকার মুক্তাদিরের দল সরকার গঠন করেছে। আসনটির আরেকটি বিশেষত্ব হলো-এ আসনের নির্বাচিত এমপি পরবর্তীতে মন্ত্রীও হন। খন্দকার মুক্তাদিরের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য হয়েছে।
খন্দকার আবদুল মুক্তাদির একজন ব্যবসায়ী নেতা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনীতিবিদ, যিনি প্রগতিশীল মূল্যবোধ ও নীতিনির্ভর শাসনব্যবস্থার জন্য সুপরিচিত। তাঁর পিতা মরহুম খন্দকার আবদুল মালিক ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন এবং তিনবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। পিতার এই ঐতিহ্য ও আদর্শ মুক্তাদিরের জনজীবন ও জাতীয় উন্নয়নে অঙ্গীকারকে প্রভাবিত করে চলেছে।
তাঁর বায়োগ্রাফিতে দেখা গেছে, মুক্তাদির এক দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় রয়েছেন। তিনি ২০১৬ সাল থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি অর্থনৈতিক সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি বিষয়ে কৌশলগত নীতিনির্ধারণী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তিনি ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-১ আসন থেকে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।
খন্দকার মুক্তাদির রাজনীতির পাশাপাশি দেশের ব্যবসা ও শিল্প খাতের একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব।
তিনি টেক্সটাইল, উৎপাদন ও বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে কৌশলগত কার্যক্রম তদারকি করছেন। রপ্তানিমুখী শিল্পে তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি, বাণিজ্য সহজীকরণ এবং বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি বিষয়ে তাঁর নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গিকে সমৃদ্ধ করেছে।
মুক্তাদির বাণিজ্য ও শিল্পসংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনে নেতৃত্বস্থানীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ টেরি টাওয়েল অ্যান্ড লিনেন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি, ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক এবং তুরস্ক-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়াও তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন কমিটির সদস্য ছিলেন।
শিক্ষাজীবনে খন্দকার মুক্তাদির সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। তিনি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন্যান্সে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার অব সোশ্যাল সায়েন্স এবং স্নাতক (বিএ) ডিগ্রি লাভ করেন।
রাজনীতি, ব্যবসা ও নীতি-আলোচনায় তাঁর সমন্বিত ভূমিকার মাধ্যমে খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও টেকসই উন্নয়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় সক্রিয় অবদান রেখে চলেছেন।
আরিফুল হক চৌধুরী:
গতরাতে এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, মানুষ যে প্রত্যাশা নিয়ে-আমাকে নির্বাচিত করেছে-আমি তাদের সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে চাই। নির্বাচনী এলাকার লোকজনকে দেয়া ওয়াদা পূরণ করতে চাই। সিলেট-৪ আসনের মানুষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, এই তিন উপজেলার মানুষ আমাকে যেভাবে সম্মানিত করেছেন, সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে মূল্যায়ণ করেছেন। আমি যেন আমার নির্বাচনী এলাকার মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারি-মহান আল্লাহর কাছে তিনি এই প্রার্থনা করেন।
এক নজরে ॥
আরিফুল হক চৌধুরী ১৯৫৯ সালের ২৩ নভেম্বর সিলেট নগরীর কুমারপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম মোঃ শফিকুল হক চৌধুরী এবং মা আমিনা খাতুন। আরিফুল হক বিএনপির অঙ্গ সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের একজন সদস্য হিসাবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং পরবর্তীতে চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা হন। তিনি সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি এবং জেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০৩ সালে তিনি সিলেট সিটি কর্পোরেশনের কমিশনার নির্বাচিত হন। সে সিটি কর্পোরেশনের নগর উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে নগরীর উন্নয়নের সূচনা করেন।
২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি কর্পোরেশনের তৃতীয় নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে ৩৫ হাজার ১৫৭ ভোটে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হন। সে সময় আরিফ পেয়েছিলেন এক লাখ ৭ হাজার ৩৩০ ভোট আর কামরান পেয়েছিলেন ৭২ হাজার ১৭৩ ভোট। এছাড়া, ২০১৮ সালের নির্বাচনেও তিনি বদর উদ্দিন আহমদ কামরানকে হারিয়ে দ্বিতীয় দফায় মেয়র নির্বাচিত হন।
মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাকে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এমএস কিবরিয়া ও সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে আওয়ামী লীগ নেতা সুরঞ্জিত সেন গুপ্তের জনসভায় গ্রেনেড হামলা মামলার আসামী করা হয়। মেয়র থেকেও তাকে বরখাস্ত করা হয়। কারাগারেও যেতে হয় তাকে। আইনী লড়াইশেষে তিনি কারামুক্ত হন। যদিও মামলাগুলো এখনো বিচারাধীন।
গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-৪ আসনে এবারই প্রথম সংসদ সদস্য পদে লড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে ১ লাখ ১৫ হাজার ৪৫৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। তার প্রাপ্ত ভোট ছিল -১ লাখ ৮৬ হাজার ৮৪৬। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিলেট জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীন পেয়েছেন ৭১৩৯১ ভোট। দলের নেতা-কর্মীরা জানান, আরিফুল হক চৌধুরী এবার সিলেট-১ আসনে বিএনপি’র প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন।
তবে, দলের পক্ষ থেকে তাকে সিলেট-৪ আসনে মনোনয়ন দেয়া হয়। প্রথমবারের মতো এ আসনের প্রার্থী হয়ে ফলাফলে বাজিমাত করেন তিনি। মন্ত্রী পদ লাভ করায় তাঁর নির্বাচনী এলাকার লোকজনসহ তার সমর্থকরা উৎফুল্ল। বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভা গতকাল মঙ্গলবার শপথ গ্রহণ করেন।



