‘লেবুর স্বর্গরাজ্য’ শ্রীমঙ্গলে লেবুর আকাশছোঁয়া দাম
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২:৩৩:৫১ অপরাহ্ন
শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) থেকে নিজস্ব সংবাদাদাতা: চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল বহুদিন ধরেই লেবু ও আনারসের জন্য দেশ জুড়ে সুনাম কুঁড়িয়েছে। পাহাড়, বনাঞ্চল ও বিস্তীর্ণ চা-বাগানে ঘেরা এই অঞ্চলের উঁচু জমিতে কাঠাল, আম, জাম, আনারসের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ লেবু উৎপাদিত হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এসব লেবুর কদর দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানির কথাও জানা যায়।
কিন্তু বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো, সেই ‘লেবুর স্বর্গরাজ্যে’ শ্রীমঙ্গলেই হঠাৎ করে লেবুর দাম আকাশছোঁয়া হয়ে উঠেছে। রমজানকে সামনে রেখে এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শ্রীমঙ্গলের বাজার ও আশপাশের লেবুর আড়ৎ ঘুরে দেখা যায়, লেবুর সরবরাহ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক কম। মাত্র এক মাস আগেও যেখানে প্রতি হালি লেবু ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হতো, বর্তমানে সাইজভেদে সেই দাম দাঁড়িয়েছে ৮০ থেকে ২০০ টাকায়। বড় সাইজের লেবু প্রায় ২০০ টাকা প্রতি হালি, মাঝারি সাইজ ১৫০ থেকে ১৭৫ টাকা, ছোট সাইজ ৮০ থেকে ১০০ টাকা।
খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য, পাইকারি আড়তেই লেবুর সংকট তীব্র। প্রতিটি লেবু কিনতে হচ্ছে ১৮ থেকে ৪৫ টাকা দরে। এর সঙ্গে পরিবহন, শ্রমিক ও বাজার খরচ যোগ হওয়ায় খুচরা পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকছে না।
এক বিক্রেতা জানান, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ প্রায় চার ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে। আগে প্রতিদিন যেখানে ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার পিস লেবু বিক্রি হতো, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ থেকে ২০ হাজার পিসে।
রমজান মাসে ইফতারে লেবুর শরবতের চাহিদা ঐতিহ্যগতভাবেই বেশি। কিন্তু এবারের উচ্চমূল্য অনেক পরিবারকে লেবু কেনা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য করছে।
ক্রেতাদের অভিযোগ লেবুর জন্য ১৫০ থেকে ২০০ টাকা খরচ করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়। ফলে অনেকে বিকল্প পানীয়ের দিকে ঝুঁকছেন।
স্থানীয় বাগান মালিকদের মতে, এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় লেবুর ফুল ঝরে গেছে এবং ফলন মারাত্মকভাবে কমেছে। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় উৎপাদন চার ভাগের এক ভাগেও পৌঁছায়নি। যেখানে ভরা মৌসুমে একটি গাছে ২৫০ থেকে ৩০০টি লেবু ধরে, সেখানে এখন অনেক গাছে ১০ থেকে ১৫টির বেশি লেবু নেই। ফলে বাজারে সরবরাহ কমে গিয়ে দামের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়েছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গলে প্রায় ১ হাজার ২৩৫ হেক্টর জমিতে লেবুর চাষ হয়। বৃষ্টির ঘাটতির কারণে উৎপাদন কমেছে। এ বিষয়টি প্রশাসনও স্বীকার করছে।
বাজারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে। মূল্য তালিকা না রাখায় কয়েকটি দোকানকে জরিমানাও করা হয়েছে। কৃত্রিম সংকট বা অতিরিক্ত মূল্য আদায় রোধে নিয়মিত অভিযান চালানোর কথাও জানানো হয়েছে।
পাহাড় ঘেরা উর্বর ভূখণ্ড, বিপুল উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা সব মিলিয়ে শ্রীমঙ্গল দীর্ঘদিন ধরেই লেবুর জন্য বিশেষ পরিচিত। অথচ সেই অঞ্চলেই আজ লেবুর উচ্চমূল্য মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক কারণে ফলন কমে যাওয়া, সরবরাহ ঘাটতি এবং মৌসুমি চাহিদা সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি।
রমজানের আগে বাজার স্বাভাবিক হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে ক্রেতাদের প্রত্যাশা লেবুর স্বর্গরাজ্যে লেবু আবারও সবার নাগালের মধ্যেই ফিরে আসবে।




