ভাষার মাসে হারিয়ে যাওয়া ভাষা
খারিয়া ভাষায় কথা বলেন মাত্র দুজন আদিবাসী
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৫:৩৪:২৩ অপরাহ্ন
আবুল ফজল মো: আব্দুল হাই, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) থেকে : ভাষার মাসে ভাষা নিয়ে আলোচনা হলেও ভাষা রক্ষায় উদ্যোগ কম দেখা যায়। সিলেট বিভাগের চা বাগান ও পাহাড়ি এলাকায় ক্ষুদ্র-নৃ জনগোষ্ঠী ভাষা অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। তাদের মধ্যে খারিয়া জনগোষ্ঠীর খারিয়া ভাষা প্রায় বিলুপ্তির পথে। খারিয়া ভাষায় কথা বলা লোক রয়েছেন মাত্র দুই জন। সিলেট অঞ্চলের কিছু চা বাগানে ছড়িয়ে থাকা খারিয়া সম্প্রদায়ের ৪১টি পল্লীতে আনুমানিক ৫ হাজার ৭০০ জনের মধ্যে খারিয়া ভাষাভাষীর সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এখন কেবলমাত্র ২ জন বয়স্ক নারী (শ্রীমঙ্গল উপজেলার বর্মাছড়া বাগানে) এই ভাষায় সাবলীল কথা বলতে পারেন।
খারিয়া জনগণ অথবা খারিয়ারা পূর্ব-মধ্য ভারতের একটি অস্ট্রো-এশিয়াটিক আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী। তারা মূলত খারিয়া ভাষায় কথা বলেন। যা’ অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষাগুলির অন্তর্ভুক্ত। খারিয়া জাতিকে প্রধানত তিনটি উপগোষ্ঠীতে বিভক্ত করা হয় ।
পাহাড়ি খারিয়া, দেলকি খারিয়া এবং দুধ খারিয়া। এদের মধ্যে দুধ খারিয়া গোষ্ঠী সবচেয়ে শিক্ষিত। খারিয়া ভাষা মূলত ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যে প্রচলিত। এর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গ এবং ওড়িশা (উড়িষ্যা) রাজ্যের কিছু অংশেও খারিয়া ভাষাভাষী জনগণ বাস করে। বর্তমানে দেশে খারিয়া ভাষায় কথা বলতে পারেন মাত্র ২ জন ।
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার বর্মাছড়া চা বাগানের বয়স্ক দুই বোন ক্রিস্টিনা কেরকেট্টা (৭৫) ও ভেরোনিকা কেরকেট্টা (৮০) খারিয়া ভাষায় স্বাবলীল কথা বলতে পারেন। তাঁদের মৃত্যুর পর বাংলাদেশে আর কোনো জীবিত খারিয়া ভাষা কথা বলার লোক থাকবে না । ফলে এই ভাষা এখান থেকে পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশংকা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতনমহল।
জানা যায়, খারিয়া ভাষায় কোনো শিক্ষা ব্যবস্থা, পাঠ্যবই বা সরকারি স্বীকৃতি নেই। শিশুরা বাংলায় পড়াশোনা করে । ফলে খারিয়া ভাষার প্রতি আগ্রহ কমে গেছে।এ দেশে খারিয়া ভাষার কোনো নির্দিষ্ট বর্ণমালা বা লিখিত রূপ নেই , যা ভাষাটি সংরক্ষণে একটি বড় বাধা বলে মনে করেন এই ভাষার জনগোষ্ঠি।
স্থানীয়রা জানান, খারিয়া ভাষাভাষীদের মূল সাংস্কৃতিক শিকড় ভারতের ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশায়। বাংলাদেশে বসবাসরত খারিয়া সম্প্রদায় মূলত চা শ্রমিক হিসেবে আসা অভিবাসী। ফলে তাদের সাংস্কৃতিক চর্চা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ।বাংলাদেশে খারিয়া সম্প্রদায় আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত নয় । ফলে সরকারি সহায়তা বা ভাষা সংরক্ষণের কোনো প্রকল্প তাদের জন্য নেই বলে জানান তারা। সিলেট অঞ্চলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা নিয়ে ২০১৮ সালে গবেষণা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপকমাশরুর ইমতিয়াজ ।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ ‘খাড়িয়া ভাষা অনেক আগে থেকেই সংকটে আছে। তাদের বর্ণমালা নেই। ব্যাকরণ নেই। ব্যবহারও নেই। ফলে নতুন প্রজন্ম এই ভাষা শেখা বা বলায় আগ্রহ পাচ্ছে না।’ ২০১৭ সালে খারিয়া সম্প্রদায়ের কিছু যুবকের উদ্যোগে শিশুদের মাতৃভাষা শেখানোর জন্য শ্রীমঙ্গলে চালু করা হয় ‘বীর শহীদ তেলেঙ্গা খারিয়া ল্যাঙ্গুয়েজ লার্নিং সেন্টার’, তবে সেই উদ্যোগে তেমন ফল মেলেনি।
এবিষয়ে উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত খারিয়া যুবক পিয়াস নানুয়ার বলেন, ‘এই ভাষা শেখানোর জন্য লোক পাওয়া যায় না। এ ছাড়া ব্যবহার না থাকায় নতুন প্রজন্মও এই ভাষা শিখতে আগ্রহী নয়।’
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক (ভাষা, গবেষণা ও পরিকল্পনা) মো. শাফীউল মুজ নবীন বলেন, ‘দেশের কয়েকটি নৃগোষ্ঠীর ভাষাই বিলুপ্তির পথে। এই ভাষাগুলো পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণের জন্য আমরা একটি প্রকল্প তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। এটি অনুমোদন পেলে আমরা কাজ শুরু করব।’
শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: ইসলাম উদ্দিন ভাষা রক্ষায় তাদের পক্ষ থেকে সর্বাত্নক সহযোগিতা করা হবে বলে জানান।



