ভাষা যেখানে সংস্কৃতির জীবনরেখা
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৫:৫০:৩৪ অপরাহ্ন
অন্জন কুমার রায় :
ভাষা যখন সাহিত্য, সংস্কৃতি ও নান্দিকতায় সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে তখন তা যোগাযোগের মাধ্যম ছাড়াও ঐতিহাসিক শক্তিতে পরিণত হয়। বাংলা ভাষা সেভাবেই সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে ঐতিহ্য নির্মাণ করেছে যা প্রাচীন চর্যাপদ থেকে আধুনিক উত্তর-ঔপনিবেশিক চেতনা পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলার লোকসংস্কৃতি, ধর্মীয় বহুত্ববাদ, নদী মাতৃক জীবন, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতা সবই বাংলা ভাষার রূপকল্পে প্রতিফলিত হয়েছে। মধ্যযুগের মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব পদাবলী কিংবা লালনগীতি যে সামাজিক ও ধর্মীয় সমন্বয় স্থাপন করেছে তা বাংলা ভাষা বহুস্বরের সাংস্কৃতিক মিলনভূমি। তাই বলা যায়, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পরস্পরকে নির্মাণ করে বাংলা সংস্কৃতিকে দিয়েছে স্বতন্ত্ররূপ। অন্যদিকে ভাষা যখন কাহিনি, প্রতীক ও উপমার মাধ্যমে জাতির কল্পিত সম্প্রদায় (ওসধমরহবফ ঈড়সসঁহরঃু) গড়ে তোলে তখন তা রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণে মৌলিক ভূমিকা পালন করে। বাংলা ভাষা সে অর্থে উপন্যাস, কবিতা ও নাটকের মাধ্যমে কার্যকর জাতিসত্তা নির্মাণ করেছে। বাংলা ভাষা শুধু আঞ্চলিক অনুভূতির বাহক নয় বরং বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
একটি ভাষার সমৃদ্ধি এর রূপান্তর ক্ষমতার উপর নির্ভর করে। বাংলা ভাষা ধারাবাহিকভাবে সেই রূপান্তর সাধন করেছে। প্রতিটি যুগে ভাষা নতুনভাবে অভিযোজিত হয়েছে। মধ্যযুগে ধর্মীয় ভক্তি, ঔপনিবেশিক যুগে জাতীয়তাবাদ, স্বাধীনতা-পরবর্তী কালে গণতান্ত্রিক চেতনা এবং সমকালীন সময়ে বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ- সকল ক্ষেত্রেই বাংলা ভাষা নিজেকে পুনর্গঠন করেছে। তবে, ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ বাংলা সাহিত্যে গুরুত্ব বহন করে। যেখানে বাংলা ভাষা একটি প্রতিরোধী সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবে ঔপনিবেশিক ভাষার আধিপত্যের বিরুদ্ধে নিজস্ব সাহিত্যিক পরিসর নির্মাণ করেছে। ভাষা ও সাহিত্যের এই বিবর্তনে বাংলা ভাষা একটি জীবন্ত সাংস্কৃতিক পরিসরে রূপ নিয়েছে।
ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশে বাংলা ভাষা একটি ‘কগনিটিভ কালচারাল আর্কাইভ’ হিসেবে কাজ করে। যেখানে সমাজের ঐতিহাসিক স্মৃতি, ধর্মীয় আচার, লোকবিশ্বাস ও জীবনদর্শন সঞ্চিত থাকে। পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার ছোঁয়া গভীর অস্তিত্ববাদী ও শৈল্পিক ভাষাবোধের জন্ম দেয়। এছাড়াও লোকসাহিত্য, পালাগান, যাত্রা, বাউল ও মরমিয়া ধারায় ভাষার সৃজনশীল প্রয়োগে বাংলা ভাষা সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি হিসেবে প্রতিফলিত হয়। ভাষার এই সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার অন্যতম প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হল বাংলা একাডেমি। যা ভাষা ও সাহিত্যের গবেষণা, অভিধান প্রণয়ন, গ্রন্থ প্রকাশ ও সাংস্কৃতিক উৎসবের মাধ্যমে ভাষার ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও বিকাশে অবদান রাখছে। এছাড়াও, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলা ভাষার সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে যখন ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এই স্বীকৃতি বাংলা ভাষা বিশ্বমানবতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। কাজেই, ভাষা একটি ‘সেমিওটিক সিস্টেম’ যা সংস্কৃতির প্রতীক, মূল্যবোধ ও অর্থকে বহন করে। বাংলা ভাষা সেই সেমিওটিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাঙালির খাদ্য সংস্কৃতি, পোশাক, উৎসব, সংগীত, নাটক ও চলচ্চিত্রের ভেতর সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণ করেছে।
আধুনিক ডিজিটাল যুগেও বাংলা ভাষা নতুন মাধ্যমে অভিযোজিত হয়ে অনলাইন সাহিত্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ই-বইয়ের মাধ্যমে সংস্কৃতির নতুন ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করেছে। অনলাইন বাংলা কনটেন্টের বিস্তার ভাষার ব্যবহারিক ক্ষেত্রকে প্রসারিত করছে এবং নতুন প্রজন্মের সাংস্কৃতিক অংশগ্রহণকে ত্বরান্বিত করছে। ফলে বাংলা ভাষার অবদান কেবল অতীতের ঐতিহ্যে সীমাবদ্ধে না থেকে বর্তমান ও ভবিষ্যতের সাংস্কৃতিক রূপান্তরেও তা কার্যকর। মূলত, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ বাংলা ভাষা একটি বহুমাত্রিক জ্ঞানভাণ্ডার যা ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, নন্দনতত্ত্ব ও মানবিক মূল্যবোধকে একসূত্রে গেঁথে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক সভ্যতার ভিত্তি নির্মাণ করেছে।
বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির আন্তঃসম্পর্কে ভাষা হল ভিত্তি, সাহিত্য হল তার নান্দনিক রূপ আর সংস্কৃতি হল সেই ভাষা ও সাহিত্য থেকে উৎসারিত জীবনযাত্রা, মূল্যবোধ ও আচরণের সমষ্টি। আধুনিক যুগে বাংলা ভাষা যে বুদ্ধিবৃত্তিক নবজাগরণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে তার কারণ বাংলা ভাষার সাহিত্য সম্ভার। ঊনিশ শতকের বঙ্গীয় নবজাগরণে বাংলা ভাষা আত্মপরিচয়ের নতুন ধারণা দেয় এবং সমাজ সংস্কার আন্দোলনের ভাষা হয়ে উঠে।
ভাষাবিদদের মতে, ভাষা কোনো নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নয়, এটি সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। তাই বাংলা ভাষায় উপনিবেশিক ইতিহাসের ছাপ রয়েছে যা সাহিত্যকে উপাদান জোগায় এবং সংস্কৃতিকে অর্থবহ করে তোলে। এই প্রক্রিয়ায় ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনকে এক নতুন মাত্রা এনে দেয়। যেখানে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাব, মননশীলতা এবং মানবতাবাদী মূল্যবোধ বাংলা সাহিত্যকে আধুনিক করে তোলে। আর সেই আধুনিকতা বাঙালি সংস্কৃতির আত্মপরিচয় নির্মাণে সহায়ক হয়। বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এই মেলবন্ধন লোকসাহিত্য, পালাগান, জারি-সারি, বাউলগান এবং প্রবাদ-প্রবচনের মধ্যে শৈল্পিক ধারা আমাদের সাহিত্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এগুলো সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় গড়ে ওঠা সাহিত্য যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করে।
উপনিবেশ-পরবর্তী ভাষা রাজনীতির আলোচনায় দেখা যায় যে ভাষা একটি ক্ষমতার ক্ষেত্র, যেখানে ভাষার আধিপত্য সাংস্কৃতিক আধিপত্যকে নির্ধারণ করে। ফলে বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্য রক্ষার সংগ্রাম ছিল একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সংগ্রাম। এই সংগ্রামে সাহিত্য ছিল সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। কারণ সাহিত্য মানুষের আবেগ, স্মৃতি ও স্বপ্নকে ভাষার মাধ্যমে সংগঠিত করে যা রাজনৈতিক আন্দোলনকে সাংস্কৃতিক শক্তি দেয়। ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্য যে জাতীয়তাবাদ ও চেতনা, গণমানুষের বেদনা ও সংগ্রামকে ধারণ করেছে, তা বাংলা সংস্কৃতিকে একটি মুক্তিকামী ও মানবিক রূপ দিয়েছে। ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে ইতিহাসের বিকল্প দলিল যেখানে ভাষার প্রতিটি উচ্চারণ সাংস্কৃতিক স্মৃতিকে ধারণ করে। মূলত ভাষা হল প্রতীকী কাঠামো, সাহিত্য হল সেই কাঠামোর সৃজনশীল বিন্যাস এবং সংস্কৃতি হল সেই বিন্যাসের সামাজিক প্রয়োগ।
বাংলা ভাষার উৎপত্তি প্রাকৃত ও অপভ্রংশ থেকে হলেও সাহিত্যই তাকে সামাজিক স্বীকৃতি ও সাংস্কৃতিক শক্তি দিয়েছে। কারণ, ভাষা ও সাহিত্য আলাদা কোনো সত্তা নয় বরং পরস্পরের ভেতর প্রবাহিত এক ঐতিহাসিক সম্পর্ক। যে সম্পর্কের শিকড় বাংলা ভাষার জন্মলগ্ন থেকে বিস্তৃত। সেক্ষেত্রে বাংলা সাহিত্য নতুন বিষয়বস্তু ও শৈলী নির্মাণ করে সংস্কৃতিকে গতিশীল ও বহুমাত্রিক সত্তায় পরিণত করে। যা আমরা ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে দেখতে পাই। ১৯৫২ সালে ভাষার অধিকার আদায়ে কবিতা, গান ও গল্প মানুষের আবেগকে সংগঠিত করে। একুশের গান বা শহীদদের নিয়ে লেখা কবিতা প্রমাণ করে সাহিত্য ভাষাকে রক্তমাখা ইতিহাসের অংশ বানাতে পারে। এই সময় বাংলা ভাষা প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক আত্মত্যাগের প্রতীকে রূপ নেয় এবং সাহিত্যের মাধ্যমেই সেই চেতনা সঞ্চারিত হয়।
সার্বিকভাবে, বাংলা ভাষা ও বাংলা সাহিত্য একে অপরের বিকল্প নয় বরং সহযাত্রী। ভাষা সাহিত্যকে প্রকাশের শরীর দেয় আর সাহিত্য ভাষাকে আত্মা দেয়। ইতিহাস, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতিটি বাঁকে এই দুইয়ের মেলবন্ধনই বাঙালির পরিচয় নির্মাণ করেছে। রবীন্দ্রনাথের নোবেল থেকে একুশের চেতনা, মধ্যযুগের পদাবলি থেকে আধুনিক কবিতা সবকিছু মিলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আলাদা করে বুঝা অসম্ভব। কারণ এদের মিলনেই জন্ম নেয় বাঙালির চিন্তা, চেতনা ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব।
লেখক : ব্যাংকার, কলামিস্ট।



