একুশে ফেব্রুয়ারি ও শহীদদের চিরস্মরণীয় স্মৃতি
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৫:৫৬:১৪ অপরাহ্ন
আফতাব চৌধুরী :
মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান নির্বিশেষে পৃথিবীর সমস্ত বাংলাভাষাকে সাংস্কৃতিক অর্থে একটি জাতি হিসেবে যদি গণ্য করি, তা হলে এই জনগোষ্ঠীর সংহতি প্রকাশের সবচেয়ে বড় উপলক্ষ ২১ ফেব্রুয়ারি। এই সংহতির মূল নির্ভর হল তার ভাষা। সকল বাঙালির ভাষা, বাংলা।
মনে রাখতে হবে, সমস্ত ভাষার মতোই বাংলাভাষাও বহুরূপী। নাম বাংলা হলেও তা আসলে বহু ভাষারূপের একটি গুচ্ছ। তার একটা স্ট্যান্ডার্ড বা প্রমিত রূপ আছে, আছে নানা আঞ্চলিক বা উপভাষার রূপ, আছে নানা শ্রেণির নানান বৈচিত্র্য। এসব বৈচিত্র্য মূল্যবান, এবং ভাষা বিজ্ঞানীরা প্রমিত রূপের চেয়ে এগুলোর মর্যাদা কম মনে করেন না। কিন্তু একথা হয়তো সকলে খেয়াল করি না যে, ১৯৫২-এর একুশ ফেব্রুযারি ঢাকায়, বা ১৯৬১-এর ১১ মে তারিখে শিলচরে ‘মাতৃভাষা‘র মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য যে বাঙালিরা প্রাণ দিয়েছেন তাঁরা কোনো আঞ্চলিক বা শ্রেণিভাষার কথা ভাবেননি। ভাবেননি যে ঢাকাই বা কাছাড়ি বাংলার জন্য তাঁদের বহুমূল্য জীবন কেড়ে নিয়েছিল। ওইসব আঞ্চলিক ভাষাই তাঁদের যথার্থ ‘মাতৃভাষা প্রথম ভাষা’ হওয়া যার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন, ঐসব বাঙালিরা, সব বাংলার মুখপাত্র যে-ভাষারূপ সেই স্ট্যান্ডার্ড বা প্রমিত বাংলা, যে-বাংলা সব অঞ্চলের, সব শ্রেণির, সব জীবিকার বাঙালি লেখাপড়ায়, নানা আচারিক বা ‘ফর্মাল’ উপলক্ষে, একে অন্যের সঙ্গে মৌখিক আদান-প্রদানে ব্যবহার করে। চট্টগ্রামের বাঙালি পুরুলিয়ার বাঙালির সঙ্গে কাছাড়ের বাঙালি দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাঙালির সঙ্গে। লিখিত বাংলার রূপও আপাতত এটাই, এই প্রমিত বাংলা।
‘মাতৃভাষা’-র জন্য প্রাণ দেওয়া কথাটিতে ‘মাতৃভাষা’ শব্দটির অর্থ এই। তা সকলের জন্মের বা ঘরের ভাষা বা শ্রেণিভাষা আমাদের সীমাবদ্ধ অঞ্চলের কার্যকর ভাষা, তা ব্যবহার করার স্বাধীনতা সর্বত্রই আছে। কিন্তু সব বড় ভাষার ব্যাপ্তি ভূগোলে ছড়িয়ে থাকা ভাষার ক্ষেত্রেই সকলের ব্যবহার্য একটা সাধারণ ভাষারূপ গড়ে উঠে। তাই আমাদের ব্যবহার করতে হয়, না হলে আমার আঞ্চলিক ভাষা অন্যেরা বুঝতে নাও পারে,বা অন্যের আঞ্চলিক ভাষা আমি বুঝতে না পারি।
এই বাংলাভাষার ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবের কয়েকটি দিনকে আমরা চিহ্নিত করতে পারি। প্রথম দিনটি ১৯১৩ সালের ১৩ নভেম্বর, যে দিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামে এক ভারতীয় কবি নোবেল প্রাইজ পেলেন, যাঁর দৌলতে পৃথিবীর ভাষা ও সাহিত্যের মানচিত্রে বাংলা ভাষাও একটি গৌরবের পরিসর লাভ করলো। এরপর এল ১৯৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারি, যেদিন প্রথম বাঙালির রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে এই ভাষার জাতীয় বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হল, ভারতের ভূখন্ডে ১৯৬১-এর ১৯ মে শিলচরে শহীদদের প্রাণোৎসর্গ এই একই কাজ করল বলা চলে। এটা শুধু একটি ভাষাগোষ্ঠীর কাছে তার ভাষার বৈধতা বা ভালোবাসার প্রতিষ্ঠা নয়।
এইসব আত্মদান বুঝিয়ে দেয় যে, ভাষা মানুষের কতটা মৌলিক সম্পদ, ভাষা বিপন্ন হলে, কিংবা আধিপত্যের দ্বারা অপমানিত হলে, সচেতন মানুষ কীভাবে প্রাণ পর্যন্ত তুচ্ছ করে তার মর্যাদা রক্ষায় এগিয়ে আসতে দ্বিধা করে না। ‘সচেতন’ কথাটা স্মরণীয়, কারণ ‘অসচেতন’ মানুষ, নিজের ভাষার মূল্য সম্বন্ধে যথেষ্ট সজ্ঞান নয় এমন অনেকের মানুষের গোষ্ঠী আগে নিজের ভাষাকে পরিত্যাগ করেছে।
এখনও বাণিজ্যবৃদ্ধির কারণে অন্য ভাষাকে বেশি আদর করে নিজের ভাষাকে অবহেলা করার মধ্যে এক ধরনের অসচেতনতা লক্ষ্য করা যায়। বাংলাভাষার মর্যাদা ও মহিমা প্রতিষ্ঠার আর একটি দিন হল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যেদিন বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিবিরোধী স্বৈরাচারী পাকিস্তানি শক্তির হাত থেকে মুক্তিকামী বাঙালি জয় ছিনিয়ে নেয়, এবং বাংলাকে প্রথম একটি সাধারণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেরও জাতীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
এর আগে ঊনবিংশ শতাব্দীতে ত্রিপুরা রাজ্যে বাংলা সরকারী প্রশাসনের ভাষা হয়েছিল, যা দেখে বিদ্যাসাগর উচ্ছ্বসিত বোধ করেছিলেন, কিন্তু তা বাংলাভাষাকে পৃথিবীর স্বাধীন রাষ্ট্রের মানচিত্রে স্থাপন করেনি। আর শেষ যে তারিখটি বাংলাভাষাকে পৃথিবীর আর সব ভাষার চেয়েও আলাদা করে, অন্য এক মহিমায় চিহ্নিত করেছে, তা হল ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর যেদিন পারিনগরে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর সাধারণ সম্মেলনের শেষ দিনে ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিনটিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে উদযাপনের সুপারিশ গৃহীত হল। অন্যত্র (‘ভাষাপ্রেম ভাষাবিরোধ’, ২০৩-২১০ পৃঃ দ্র) আমরা এই উজ্জ্বল মুহূর্তের পিছনে কানাডাবাসী দুই বাংলাদেশী, নাগরিক আবদুস সালাম ও রফিকুল ইসলামের একনিষ্ঠ ও নাছোড় বান্দা প্রয়াস এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সমর্থনের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করেছি।
ইউনেস্কোর প্রস্তাবের প্রথম দু‘টি অনুচ্ছেদ তুলেই দিই-
The UNESCO General Conference in its closing session on 17 November, 1999, adopted the following resolution proclaiming international Mother Language Day to be observed on 21 February every year as proposed by Bangladesh.
proposed Modification An international Mother Language Day will be proclaimed with a view to pursuing the organisation`s work in favour of linguistic and cultural diversity and multilingualism in all fields of competence and that the proposed international Mother Language Day be observed on 21 February every year in the Member States and at UNESCO Headquarters.
এরপরে কয়েকটি অনুচ্ছেদে ইউনেস্কো এই প্রস্তাব গ্রহণের পিছনে তাদের যুক্তি ব্যাখ্যা করে। প্রথমত, মানুষের ভাষা ইউনেস্কোর লক্ষগুলোর একেবারে কেন্দ্রে অবস্থিত, কারণ ভাষাই মানুষের মূর্ত ও অমূর্ত ঐতিহ্য রক্ষার সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। দ্বিতীয়ত, মাতৃভাষা রক্ষা ও বিস্তারের সমস্ত প্রয়াস শুধু যে বহুভাষিকতা এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার বিস্তারকে উৎসাহিত করবে তাই নয়, তার উপরেও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা বিষয়ে সচেতন করবে এবং সকলের মধ্যে সহিষ্ণুতা, সংহতি ও আদান প্রদানের প্রেরণা দেবে। এই সঙ্গে এ কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে যে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোতে এবং ইউনেস্কোর মূল কার্যালয়ে ‘আন্তর্জাতিক’ মাতৃভাষা দিবস- এর উদযাপন মাতৃভাষার উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি সাধনের এক বিশেষ কার্যকর পন্থা হিসেবে গৃহিত হবে।
এই ঘোষণার সূত্রে মাতৃভাষার জন্য ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ তারিখে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব আত্মোৎসর্গকে ইউনেস্কো স্মরণ করছে। তাই প্রস্তাব করা হচ্ছে যে- ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখটি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে সারা পৃথিবীতে স্বীকৃত হোক, এবং তা উদযাপনের মধ্য দিয়ে ১৯৫২-এর শহীদদের আত্মদানের স্মৃতি চিরস্মরণীয় হয়ে থাক।
উপরে বাংলাভাষায় বিশ্বগত মর্যাদা নির্মাণে যে কয়েকটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের কথা বলা হল, তার সঙ্গে আরও মুহূর্তের যোগ হতেই পারে। এই তালিকা নিঁখুত না অসম্পূর্ণ, সেটা বড় কথা নয়। আসল কথা হল, বেশ কয়েকটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক, এবং প্রত্যকটিই গভীরভাবে মানবিক, ঘটনাক্রমের মধ্য দিয়ে বাংলাভাষা এখন এমন এক মর্যাদার অধিকারী হয়েছে যে মর্যাদা পৃথিবীর সাত হাজার ভাষার অন্য কোনো ভাষার নেই, এমনকি দুনিয়ার সবচেয়ে আধিপত্যকারী ভাষা ইংরেজি, বা সবচেয়ে বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ভাষা চীনারও নেই। বেশ কয়েকজন শহীদের প্রাণের বিনিময়ে এই অনন্য সাধারণ মর্যাদা অর্জন করেছে এই ভাষা।
আমার অন্য একটি লেখা থেকে এই প্রাণোৎসর্গের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে দিই- ২১ ফেব্রুয়ারি তিনটে থেকে সোয়া তিনটের মধ্যে হঠাৎই মেডিক্যাল হোস্টেল গেটের মধ্যে ঢুকে দু‘বার গুলি ছোড়ে পুলিশ। ১২ নম্বর রোডের সামনে পড়ে যান আবুল, বরকত তার হাঁটুতে গুলি লেগেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রফিকউদ্দিনের মাথার খুলি উড়ে যায়, হাসপাতালে নার্সরা তার অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। দু-দফায় মোট ২৮ রাউন্ড গুলি ছোড়ে পুলিশ। রাত্রে মৃত্যু হয় আরও দু’জনের-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল জব্বার আর বাদামতলির কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের ছেলে রফিক উদ্দিনের। আহত আব্দুস সালাম ৭ এপ্রিল তারিখে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই মারা যান। প্রায় দুশো ছাত্র ও অন্যান্য মানুষ আহত হয়েছিলেন সেদিন। কিন্তু পরদিন, ২২ ফেব্রুয়ারি দিনটিতেও প্রাণ দেন রিকশাচালক আওয়াল, কিশোর অহিউল্লাহ এবং আরও অজ্ঞাত পরিচয় মানুষ। বরকত এবং শফিউর রহমান ছাড়া আর কারও কবরের সন্ধান পাওয়া যায়নি। পুলিশ কারও লাশ ফিরিয়ে দেয়নি। আত্মীয়দের তাদের শহীদত্বের সমস্ত স্মারক নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল।
বলা বাহুল্য, বাহান্নর শহীদদের এই রক্তের সঙ্গে এসে মিশেছে উনিশশো একষট্টির শিলচরের এগারোজন শহীদের রক্ত, একই ভাষার সম্মান রক্ষার জন্য উৎসর্গীকৃত। ইউনেস্কোর তালিকায় তারা থাকুক বা না- থাকুক আমাদের বাঙালিদের কাছে তারা একই ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় একই ভালোবাসায় ক্রম রক্ষা করে মৃত্যুহীন হয়ে আছে। এই মৃত্যুহীনতা আমরা যারা বেঁচে থাকি তাদের উপর একটা দায় চাপিয়ে দিয়েছে বললে অত্যুক্তি হয় না।
বরকত, সালাম, জব্বার থেকে শিলচরের কল্পনা ভট্টাচার্য, কিংবা মণিপুরি মেয়ে সুদেফা যেন আমাদের চারপাশে এসে দাঁড়ায়, তাদের নিঃশব্দ তর্জনী তুলে বলতে থাকে, আমরা তো শুধু ভালোবাসা নয়, সব ভালোবাসার যা তীব্র নির্যাস, সেই প্রাণ দিলাম আমাদের এই ভাষার জন্য, তোমরা কি দিচ্ছ? প্রাণ না হয় সবাই দিতে পারে না, সবসময় তার দরকারও হয় না। কিন্তু তোমরা কি অন্তত ভালোবাসাটুকু দিচ্ছ? এই প্রশ্নগুলো একা বাঙালির কাছে নয়, এই প্রশ্নগুলো যুথবদ্ধ বাঙালির কাছে।
২১ ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রত্যেককে এই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমরা কে কি উত্তর নিয়ে প্রস্তুত তারই যেন পরীক্ষা করে। আমাদের মধ্যে এমনও একটি গোষ্ঠী হয়তো তৈরি হচ্ছে যার সদস্যরা মনে মনে বলে, আর কী! আমাদের ছেলেপুলেদের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে না? ইংরেজি শেখাতে হবে না, স্যুট-টাই পড়ে ‘সাহেবি চাকরি করতে পাঠাতে সম্ভব হলে সাহেবদের দেশে পাঠাতে হবে না? বাংলা নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে?
আবার কেউ হয়তো উত্তর দেয়, ‘আহা, ইংরেজি শিখব না কেন? ইংরেজি শিখব, ফরাসি শিখব, জাপানি, চীনা শিখব কিন্তু বাংলাটাও ভালো করে শিখব। শুধু শহীদদের কথা ভেবে নয়, আমার বাঙালি আত্মপরিচয়ের কথা ভেবে। ইউনেস্কো যে বহু ভাষা বহু সংস্কৃতির কথা বলেছে আমার ভাষা আমার সংস্কৃতি তার মধ্যে নিজের গরিমায় উজ্জ্বল তা বিশ্ব সংস্কৃতিরই এই গৌরবময় অংশ। সারা পৃথিবীর মানুষ বাংলা সাহিত্যের স্বাদ নিতে চায়, আর আমরা এই ভাষাকে ছেড়ে যাব? যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক, আমি তোমায় ছাড়ব না মা।’
অন্য ভাষা শিখব, কিন্তু আমার ভাষার বিনিময়ে নয়। অন্য ভাষার আধিপত্য মানব না, আবার আমার ভাষা যাতে অন্য ভাষার উপর আধিপত্য না-করে তাও দেখব। নিজের ভাষাকে ভালোবাসা মানে ঘরকুনো হওয়া নয়, দ্বীপে আটকে থাকা নয়। অন্য ভাষাকে দখল করেও নিজের ভাষাকে ভালোবাসা যায়।’ কোন উত্তরটা আমাদের? ২১ ফেব্রুয়ারি তাই শোনবার জন্য প্রতিবছর আমাদের সামনে এসে হাজির হয়।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।



