পট পরিবর্তনের পর সিলেটে সক্রিয় অপরাধী চক্র
আম্বরখানা-সুবিদবাজার এলাকা যেন ছিনতাই-অপহরণের ডেঞ্জার জোন
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৫:২১:০০ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী :
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরপরই সিলেটে একাধিক অপরাধী চক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে, এরা নিয়মিত একের পর এক ছিনতাই, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়ের মতো অপরাধ করে যাচ্ছে। বিশেষ করে হাউজিংএস্টেট এলাকায় দিনদুপুরে প্রকাশ্যে ছিনতাইয়ের পর নগর জুড়ে আতংক বিরাজ করছে।
অন্যদিকে সিলেটের সচেতনমহল দাবি করছেন আম্বরখানা-সুবিদবাজার এলাকায় ছিনতাইর ঘটনা নতুন নয়। প্রায় সপ্তাহেই কোন না কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। বিশেষ করে গত বছরের মধ্য সময়ে সুবিদবাজার ও আম্বরখানা এলাকার দুটি ঘটনা ব্যাপক আলোচিত ছিল। অনেকের কাছে আম্বরখানা-সুবিদবাজার এলাকা ছিনতাই-অপহরণের ‘ডেঞ্জার জোন’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। এদিকে, হাউজিং এস্টেটের ঘটনার পর গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে নগরীর বিভিন্ন স্থানে চেক পোস্ট বসিয়ে মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের কাগজপত্র চেক করছে পুলিশ।
গতকাল বুধবার সিলেটের হাউজিং এস্টেটে দিনেদুপুরে ছিনতাইয়ের ঘটনায় হতভম্ব এলাকাবাসী। স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আম্বরখানা থেকে সুবিদবাজার পর্যন্ত একাধিক অপরাধী চক্র গড়ে উঠেছে। এরা সংঘবদ্ধভাবে ছিনতাই-অপহরণ করে থাকে। গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে এভাবে একের পর এক অপরাধমুলক ঘটনা ঘটলেও প্রাণের ভয়ে কেউ মুখ খুলে কিছু বলছেন না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া হাউজিংএস্টেট এর ছিনতাইর ঘটনায় সিসিটিভির ফুটেজ পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতিরোধ করার পর একজন মোটরসাইকেল থেকে নেমে অটোরিকশার ভেতরে থাকা নারী যাত্রীর ব্যাগ ধরে টানাটানি করে। টানাহ্যাঁচড়ার পর ব্যাগটি নিজের আয়ত্বে নিয়ে মোটর সাইকেল আরোহীরা দ্রুত স্থান ত্যাগ করে। ঘটনার শিকার ওই নারীও পরক্ষণেই অটোরিকশা থেকে নেমে চিৎকার করতে থাকেন। ওই নারী ব্যাংক থেকে টাকা তুলে সিএনজি অটোরিকশায় করে বাসায় ফিরছিলেন। এ ঘটনায় ওই নারী এয়ারপোর্ট থানায় একটি জিডি করেছেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে গতরাত দশটায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে আটক কিংবা শনাক্তের কথা নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
এদিকে, আম্বরখানা সুবিদবাজার এলাকায় সংঘটিত গত বছরের দু’টি ছিনতাইর ঘটনা ব্যাপক আলোচিত ছিল। জানা যায়, ওই বছরের ৭ জুলাই এয়ারপোর্ট সড়ক থেকে দুই ছিনতাইকারীকে স্থানীয় লোকজন আটক করে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশে সোপর্দ করেন।
আটক ছিনতাইকারীরা হচ্ছে, জগন্নাথপুর উপজেলার রাণীগঞ্জের আব্দুল হকের পুত্র সাইফুল ইসলাম (২৫) ও সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের গৌরিনগরের জাহাঙ্গীর আলমের পুত্র লিমন আহমদ জয় (২৬)। এর মধ্যে সাইফুল ইসলাম নগরের সেনপাড়া আর লিমন নগরীর সুবিদবাজার এলাকায় বসবাস করছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল কামাল হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে জোরপূর্বক প্রাইভেট কারে তুলে এয়ারপোর্টের দিকে নিয়ে চলে যায়। প্রথমে ছিনতাইকারীরা অপহƒত কামালকে হাউজিং এস্টেটের ৮নং লেনে নামিয়ে দেবে বললেও পরবর্তীতে এয়ারপোর্টের দিকে নিয়ে যায় এবং তার সাথে থাকা স্মার্ট ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়।
কামালকে এয়ারপোর্ট হয়ে বাইশটিলার দিকে নিয়ে যাবার সময় প্রাইভেট কারে থেকে চিৎকার করতে থাকে কামাল। গ্র্যান্ড সিলেটের সামনে আসার পরে কামাল প্রাইভেট কারের জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে রাস্তায় পড়ে গেলে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে সাইফুল ও লিমনকে হাতে নাতে আটক করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় এয়ারপোর্ট থানায় কামাল বাদী হয়ে ৩০ জুলাই মামলা দায়ের করেন। মামলা নং-২০। ধারা ৩৯৪’ প্যানাল কোডের ১৮৬০ দণ্ডবিধি।
এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই বিধান দেব জানিয়েছেন, চার ছিনতাইকারীর বিরুদ্ধে গত ডিসেম্বর মাসে এই মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেয়া হয়েছে।
এর আগে ওই বছরেরই ২৭ জুলাই সন্ধ্যায় সুবিদবাজার পয়েন্ট থেকে জগন্নাথপুরের ব্যবসায়ী ছালিক আহমদকে ধারালো অস্ত্রের মুখে প্রকাশ্যে জোরপূর্বক একটি সিএনজি অটোরিকশায় তুলে অপহরণ করে ফাজিলচিশত গলির ভেতরে নিয়ে যায়। ছালিক অপহরণের বিষয়টি তখন আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিএনজি অটোরিকশার চালকরা কেবল ফেলফেল করে দেখছিলেন। গলির ভেতরে টানা একঘন্টা তাকে নির্যাতন করে তার পরিবারের সাথে কথা বলায়। অপহরণকারীরা সাফ বলে দেয়, টাকা না দিলে ছালিককে ছাড়া হবে না। জীবন রক্ষায় ছালিকের স্বজনরা একঘণ্টার মধ্যে বিকাশে করে এক লাখ টাকা অপহরণকারীদের দেয়া চারটি নম্বরে পাঠান। পরে ছালিককে ছেড়ে দেয়া হয় কিন্তু বলে দেয়া হয়, ঘটনাটি জনসমক্ষে প্রকাশ করলে তোমার প্রাণে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে।
এ ঘটনার পর ছালিক চারটি নম্বরের আদ্যপান্ত বের করেন। তখন এয়ারপোর্ট থানায় লিখিত অভিযোগ দেয়া হলেও তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিষয়টি আমলেই নেননি।
ব্যবসায়ী ছালিক আহমদ গতকাল বুধবার দৈনিক সিলেটের ডাককে জানান, প্রথমে প্রাণনাশের ভয়ে ঘটনাটি প্রকাশ করেননি। কিন্তু পরে এয়ারপোর্ট থানায় লিখিত এজাহার দিলেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
সাম্প্রতিক বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও হাউজিং এস্টেট ওয়ার্ডের একাধিকবারের কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদী সিলেটের ডাককে বলেন, টানা বিশ বছর এই এলাকার জনপ্রতিনিধি ছিলাম। কিন্তু কখনো এ রকম ঘটনা ঘটেনি। হাউজিং এস্টেটের সড়ক বলতে আমরা নিজের বাড়ীর আঙ্গিনার মতো মনে করি। কিন্তু আমাদের বাড়ির আঙ্গিনায় যদি এ রকম ঘটনা ঘটে তাহলে আর আমাদের নিরাপত্তা কোথায়।
তিনি বলেন, স্থানীয় লোকজনের মধ্যে আতংক তৈরি হয়েছে। পুলিশের টহল বাড়াতে হবে। ছিনতাই, চুরিসহ এসব ঘটনায় যে কেউ জড়িত থাকুক তাদেরকে অবিলম্বে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। ছিনতাইকারীদেরকে নিশ্চিহ্ন করতে আইনশৃংখলা বাহিনীকে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান।
এদিকে এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শাহ মোবাশ্বির আহমদ বলেন, হাউজিং এস্টেটে ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশ ইতোমধ্যে মাঠে নেমেছে। ছিনতাইকারীদের শনাক্ত করতে সবধরনের প্রযুক্তি দিয়ে পুলিশ কাজ করছে। তদন্তে সম্রাট নামের একজনের নাম এসেছে। কিন্তু কনফার্ম না হওয়ায় কিছু বলা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে সিলেট মহানগর পুলিশের মুখপাত্র (পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) এডিসি মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম সিলেটের ডাককে বলেন, ছিনতাইকারীসহ অপরাধ চক্রের বিষয়ে পুলিশ শনাক্ত করতে পেরেছে। কাদের নেতৃত্বে হচ্ছে, কারা শেল্টার দিচ্ছে সবই পুলিশ বের করেছে। হাউজিং এস্টেটের ঘটনায় ইতোমধ্যে শনাক্তের কাজ বেশ অগ্রগতি আছে। যেকোনো সময় একটা ফলাফল পাওয়া যাবে। অপরাধ নির্মূলে পুলিশ তৎপর রয়েছে। এদের নির্মূলে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।



