যুদ্ধদিনের গল্প
গাজার দিনলিপি
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ অক্টোবর ২০২৫, ৩:০৮:০৬ অপরাহ্ন
অনুবাদ : ফায়যুর রাহমান
গাজা সিটির এক তরুণ নার্স করিম। বয়স বিশের কোঠায়। ইসরায়েলের সাম্প্রতিক জোরপূর্বক উচ্ছেদ আদেশের আগে তিনি বাবা-মা ও ভাইদের সঙ্গে নিজের বাড়ির ধ্বংসস্তূপে বাস করতেন। ইতোমধ্যে এই যুদ্ধে তিনি ১৩ বার উচ্ছেদ হয়েছেন এবং রাফায় এক ইসরায়েলি হামলা থেকে বেঁচে গেছেন। গত এক মাস ধরে তিনি দ্য গার্ডিয়ান-এর জন্য ডায়রি লিখেছেন।

১৭ আগস্ট ২০২৫
দুই বছর পর আমি সব আশা হারিয়ে ফেলেছি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধ শেষ করবেন- এমন খবরে আমি আর বিশ্বাস করি না। বাবা বলছেন ওরা আবার উচ্ছেদ করার আগে শিগগিরই আমাদেরকে দক্ষিণে- দেইর আল-বালাহতে যেতে হবে। অন্য কোনো জাতি হলে জাতিসংঘ নড়েচড়ে বসত। কিন্তু আমাদের জন্য কিছুই নেই। এখন তারা আমাদেরকে দক্ষিণ সুদানে পাঠানোর কথা বলছে- একটা দেশ যেটা নিজেই গৃহযুদ্ধ আর শরণার্থীতে ভরা। আমরা ২০ বর্গকিলোমিটারেরও কম জায়গায় ২০ লাখ মানুষ আটকে আছি- ধীরে ধীরে মরার অপেক্ষায়। আর পৃথিবী কাঁধ ঝাঁকাবে। সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ার একবার বলেছিলেন : “আমরা হয়তো আরবদের আমাদের ছেলেদের হত্যা ক্ষমা করতে পারব, কিন্তু তাদের কারণে আমাদের ছেলেদের হত্যা করতে হয়েছে- এটা ক্ষমা করা কঠিন হবে।” এ কথাতেই সব বলা আছে। কখনও কখনও মনে হয় ইসরায়েলকে মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণা করা উচিত- হয়তো তখনই পৃথিবী বুঝবে আমরা কী পাগলামির মধ্যে বেঁচে আছি।
১৮ আগস্ট ২০২৫
এক বন্ধুর সঙ্গে দেইর আল-বালাহে যাওয়া ছিল এক ধরনের দুঃসাহসিক কাজ : গাড়িগুলো এমনভাবে বদলানো- যাতে বেশি মানুষ উঠতে পারে, ট্রেলার যেন লাইফবোটের মতো ঝুলছে। তুমি যা কিছু আছে তাই আঁকড়ে ধরো, কারণ না হলে রাস্তার মাঝে পড়ে হারিয়ে যেতে পারো।
আল-নাবুলসি স্কোয়ারের কাছে আমি আকাশে দেখলাম এক “হিজাম নারি”- অগ্নির ফিতা। ফাইটার জেটগুলো গাজা সিটির ওপর একটার পর একটা বিস্ফোরণের রেখা কেটে দিল; ছাইয়ের মেঘ উঠল আর নিচের সবকিছু মুছে গেল। আমি পাঁচ, ছয়টা রকেট গুনলাম- তারপর গোনা বন্ধ করলাম; গোনা অর্থহীন মনে হচ্ছিল। আমাকে পরিবারের জন্য আশ্রয় খুঁজতে হবে- একটা ফ্ল্যাট, একটা গ্যারেজ, যেকোনো ছোট্ট জায়গা। আমার মাথা ফসকে যাচ্ছে, সব ভুলে যাচ্ছি, পরিকল্পনাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে- অরাজকতা সব গিলে ফেলছে। আমার মধ্যে কেবল এক চাপা আতঙ্ক আর ফাঁপা আশা যে আমরা পরদিনও বেঁচে থাকব।

১৯ আগস্ট ২০২৫
গতকাল অবশেষে একটা গ্যারেজ পেলাম- মাসে ১,৫০০ শেকেল (প্রায় ৩৩৫ পাউন্ড)। এটিই সবচেয়ে সস্তা, কারণ ঘরবাড়ি ধ্বংস হওয়ায় চাহিদা তুঙ্গে। এই “গ্যারেজে” প্রায় কোনো ছাদই নেই। মালিক এমনকি ২,৫০০ শেকেল ভাড়ায় ছোট্ট এক ফ্ল্যাটও অফার করলেন- দুবাইয়েও এত ভাড়া নয়। যুদ্ধ আর সংকটে মানুষ আরও আগ্রাসী, আরও স্বার্থপর হয়ে ওঠে, অন্যের দুর্দশা থেকে লাভ তুলতে চায়। হয়তো এটাই “স্বাভাবিক”-বা অন্তত সেই আচরণ যা দুই বছরের জোরপূর্বক উচ্ছেদ, নির্বাসন, দুর্ভিক্ষের মধ্যে থাকা কারও কাছে প্রত্যাশিত- বিশেষ করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ছাদ খোলা কারাগারের ভেতরে।
তাই আমি নতুন বাড়ি সাজাতে শুরু করলাম- পরিষ্কার করা, গুছানো, বাসযোগ্য করার চেষ্টা। আমি নিজেকে এক সেকেন্ডও দিই না পুরোনো ঘরটার কথা ভাবার জন্য- গণহত্যার আগে আমার বক্স-স্প্রিং বিছানা, গেমিং ডেস্ক, এয়ার কন্ডিশনার, আমাদের বাড়ি- আমি নস্টালজিয়াকে জায়গা দিই না। আমি শুধু এগোই। সামনে, সামনে- কখনও পেছনে তাকাই না।
২৮ আগস্ট ২০২৫
এক সপ্তাহ হলো আমি বাবা-মার কাছে নেই। বাবার কথার পরও তারা আশা- বা অস্বীকার- আঁকড়ে ধরে আছেন, ভাবছেন কাতারি, আমেরিকান, মিশরীয় আর ইসরায়েলিদের টানাটানিতে গাজা সিটি খালি হবে না। তাই তারা যেতে চান না। দুই বছর ধরে বিশ্ব যা খুশি করেছে, আমরা ডুবতে ডুবতে সবচেয়ে ছোট আর স্পষ্ট মিথ্যা আঁকড়ে থাকি- যে খড়কুটো আমাদের শ্বাস নিতে দেয়। নির্মম সত্য হলো ইসরায়েলিরা তাদের লক্ষ্য কখনও আড়াল করেনি: “আমরা গাজা ধ্বংস করব।” করেছে। “আমরা তোমাদের পুনর্বাসন করব।” করেছে। “আমরা খাবার-পানি কেটে দেব।” দিয়েছে। “আমরা রাফায় ঢুকব।” ঢুকেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন না বলেছেন- তারপরও করেছে। এবার কী? গাজা সিটি, আমার বাড়ি। এটিও খালি হবে, রাফার মতো এক বিরানভূমি। আমি এখন কয়েকটা শান্ত দিন চুরি করছি-সংক্ষিপ্ত, ভঙ্গুর এক শান্তি, যা আমি অর্জন করেছি।

৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
আমার বাবা-মা অবশেষে আমার সঙ্গে। আমরা গ্যারেজটাকে বাড়ি বানিয়েছি- ঘর, সামান্য ব্যক্তিগত জায়গা। অবশ্য দেয়াল কেবল প্লাস্টিকের ত্রিপল। আমি এক মুহূর্তের জন্য অনলাইনে যেতে পেরেছি। এখন অবস্থা এই : আইডিএফ গাজা সিটির পশ্চিমাংশসহ পুরো শহরের জন্য জোরপূর্বক উচ্ছেদ আদেশ দিয়েছে। মানুষের আর শক্তি নেই, টাকা নেই, ইচ্ছাশক্তি নেই ঘর ছাড়ার- অনেকে বরং মরতে চায়।
আজ বিকেলে আমাদের প্রতিবেশী বলল ইসরায়েল এমনকি কাতারেও বোমা ফেলেছে। ওহ মাই গড। আর কোনো সীমা নেই। কাতার- যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মার্কিন ঘাঁটি- একটি মার্কিন মিত্রশক্তির হাতে আঘাতপ্রাপ্ত। আমি মনে করি এখন স্পষ্ট কী আসছে আর গাজার মানুষের জন্য এর মানে কী : শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত গণহত্যা। তাদের ‘কার্তে ব্ল্যাঞ্চ’ দেওয়া হয়েছে।
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
মায়ের জন্মদিন- অমানবিক পরিস্থিতিতে আরেকটি নীরব উদ্যাপন। পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হয়েছে, কিন্তু এ সেই জীবন নয় যা আমাদের হওয়া উচিত ছিল। আমার ফোন আমাকে ২০২২ সালের জন্মদিনের ছবি দেখাল : ঘরে বানানো কেক আর আমার প্রিয় নিউ ইয়র্ক চিজকেক। মনে পড়ল ২০২৩ সালের শেষে মাকে জর্জ অরওয়েলের ‘নাইনটিন এইটি ফোর’ বইটা দিয়েছিলাম- আমরা সেটা পুড়িয়ে রুটি বানিয়েছিলাম, কারণ গ্যাস বা কাঠ ছিল না। অরওয়েল এখন আমাদের দেখে কী ভাবতেন? আমি কল্পনা করি তিনি হয়তো আমাদের ক্ষমা করতেন। আমি গোপনে চোখ মুছলাম আর চলতে থাকলাম। দেইর আল-বালাহ আরও ভরে যাচ্ছে। মানুষ ক্লান্ত : মরতে চায় না, কিন্তু অনেকেই মনে করে তারা ইতিমধ্যেই মরে গেছে।
আমি মায়ের হাত ধরলাম, চুমু খেলাম আর ফিসফিস করে বললাম “শুভ জন্মদিন”। তিনি কয়েক দিন ধরে অসুস্থ। আমি তাঁকে চিঠি লিখলাম আর দুঃখ প্রকাশ করলাম যে, আমার কাছে কেক (যার দাম প্রায় ৭০ ডলার) বা ছোট্ট কোনো উপহার কেনার মতো এক পয়সাও নেই।

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
যুক্তরাজ্য আর অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে- এখন কেন, কী উদ্দেশ্যে? ইসরায়েল আমাদের বোমা মারছে, গণহত্যা চলছে। কিন্তু এখন আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিনি জনগণ হিসেবে মরতে পারি, আমাদের একটি রাষ্ট্র আছে। কত সুন্দর।
এত কষ্টের পর, এত দেশ যারা প্রায় দুই বছর ধরে অস্বীকার করেছে যে গাজায় একটি জনগোষ্ঠীকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে- হঠাৎ করে তারা কথা বলছে। অভিনেতা, গায়ক আর অন্যরা যোগ দিচ্ছে কারণ বিষয়টা এখন ‘মেইনস্ট্রিম’। আগে মানুষ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলত, “আহা না, আমি তো মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে যথেষ্ট জানি না, মন্তব্য করা আমার জন্য খুব সংবেদনশীল।” ভণ্ডামি।

২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫
একই নিষ্ঠুর রুটিন, দিন দিন- মানুষ ক্ষুধায়, দুর্বলতায়, থেমে না থাকা রকেটের আঘাতে মারা যাচ্ছে। আমাদের থেকে খুব দূরে নয় এমন এক লোক মারা গেল। প্রথমে ভাবলাম হয়তো আগের মতো কোনো হামলা- একটা রেইড, একটি ছোড়া গুলি। না। তিনি কেবল হঠাৎ পড়ে গেলেন। তার হৃদপিণ্ড থেমে গেল। আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারি না কত সাধারণ লাগল তার মৃত্যু, কী দ্রুত একটি জীবন মিলিয়ে গিয়ে শুধু ফাঁপা নীরবতা রেখে যায়। আমি হতবাক- যেন আমি এই ধরনের ক্ষতিতে অসাড় হয়ে গিয়েছিলাম আর হঠাৎ জেগে উঠলাম।

আমার দিন এখন বেঁচে থাকার মানচিত্র : পানি আনা, জ্বালানি খোঁজা, পেট না ভরানো রুটি বানানো। বাকি সামান্য সময়ে আমি বৃত্তির খোঁজ করি- একটি ছোট্ট আশা, হয়তো এটাই একমাত্র পথ, এই কারাগার থেকে বের হওয়ার। কিন্তু তারা ইংরেজি পরীক্ষা চায়; তারা জানে এখানে কোনো পরীক্ষাকেন্দ্র নেই। অনলাইন পরীক্ষা? অসম্ভব : নেই স্থিতিশীল ইন্টারনেট, নেই বৈধ পাসপোর্ট পরিচয় যাচাইয়ের জন্য। আমরা কারা, তা প্রমাণ করব কীভাবে, যখন পৃথিবী আমাদের কাগজপত্র আর সংযোগগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে?
আমি অস্থিমজ্জা পর্যন্ত ক্লান্ত।
#দ্য গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত।




