স্ত্রীর নামে দেড় কোটি টাকার ফ্ল্যাট ধর্মপাশায় ডুপ্লেক্স বাড়ি
পুলিশ পরিদর্শক ওমর ফারুকের বিপুল অবৈধ সম্পদ
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ৩:৪৫:৪৪ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী :
মো. ওমর ফারুক। একজন পুলিশ পরিদর্শক (নিরস্ত্র)। ২০১১ সালে উপপরিদর্শক (দারোগা) পদে যোগদান করা এ পুলিশ সদস্য মাত্র ১৪ বছর চাকরি করে গড়ে তুলেছেন বিপুল অবৈধ সম্পদ। কলেজ শিক্ষক স্ত্রী উম্মুল খায়ের মাকসুরার নামে নগরের দরগাহ মহল্লায় কিনেছেন প্রায় দেড় কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। ধর্মপাশা উপজেলা সদরে নির্মাণ করেছেন ডুপ্লেক্স বাড়ি । এমনকি গ্রামের বাড়ি রাজনগর গ্রামেও কিনেছেন বহু জমি-জমা। আওয়ামী লীগ শাসনামলে নিজের প্রভাব প্রতিপত্তি আর দুর্নীতির মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়।
সিলেটের ডাক’র অনুসন্ধানে পুলিশ পরিদর্শক মো. ওমর ফারুকের অবৈধ সম্পদের এমন চিত্র বেরিয়ে এসেছে। দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত এই পুলিশ কর্মকর্তা বর্তমানে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থানার ওসি হিসেবে কর্মরত। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এই পুলিশ কর্মকর্তাকে গত মঙ্গলবার সিলেটের বিয়ানীবাজার থানার ওসি হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
যেভাবে বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের সন্ধান …..
জানা গেছে,সিলেটের গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর থানায় চাকরি করে ওসি ওমর ফারুক বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। এই পুলিশ কর্মকর্তার ব্যাপারে এমন তথ্য পেয়ে অনুসন্ধানে নামে সিলেটের ডাক। প্রায় এক মাসের অনুসন্ধানে তার অবৈধ সম্পদের বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে নিশ্চিত হওয়া যায়, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ১নং ওয়ার্ডের দরগাহ মহল্লায় (পায়রা-২৭/২) শাহজালাল টাওয়ারে তিনি স্ত্রী উম্মুল খায়ের মাসুরার নামে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট কিনেছেন। শাহজালাল টাওয়ারের অষ্টম তলায় ফ্ল্যাটটির অবস্থান (এ/৩)। দুই হাজার তিনশত স্কয়ার ফিটের ফ্ল্যাটটির প্রতি স্কয়ার ফিটের দাম ৫ হাজার টাকা করে এর সর্বমোট মূল্য এক কোটি ১৫ লাখ টাকা। আর এটির দলিল রেজিস্ট্রিসহ আনুষাঙ্গিক মিলে এর সর্বমোট মূল্য দাঁড়ায় দেড় কোটি টাকারও বেশি ।
গত কয়েক বছর ধরে পরিবারসহ ওসি ওমর ফারুক এই ফ্ল্যাটেই বসবাস করছেন। ওসি ওমর ফারুক শাহজালাল টাওয়ারের অষ্টম তলার ওই নিজস্ব ফ্ল্যাটে বসবাসের বিষয়টি টাওয়ারের নিরাপত্তায় নিয়োজিত লোকজনসহ সকলেই অবগত।
বিষয়টি নিশ্চিত হতে এ প্রতিবেদক গতকাল রোববার দুপুরে সরেজমিনে নগরের ১ নং ওয়ার্ডের দরগাহ মহল্লায় যান। টাওয়ারের সিকিউরিটি ইনচার্জ মনজুর আহমদের কাছে ওসি ওমর ফারুকের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি তার ফ্ল্যাট,পরিবারসহ বসবাসের নিশ্চিত করেন । মনজুর আহমদ জানান, ওসি স্যার পরিবারসহ দুই আড়াই বছর ধরে এখানে বসবাস করছেন। এটি তার ক্রয় করা ফ্ল্যাট।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহজালাল টাওয়ারের ডেভলপার ফয়জুল মাহমুদ রোববার দুপুরে সিলেটের ডাককে ওসির ফ্ল্যাটের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,গত ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে ফ্ল্যাটটি পুলিশ কর্মকর্তা তার স্ত্রীর নামে দলিল রেজিস্ট্রি করেন।
২২ লাখ টাকায় ফ্ল্যাট ডেকোরেশন
এদিকে ফ্ল্যাটটিকে নিজের মনের মতো করে রাজকীয় স্টাইলে সাজিয়েছেন ওমর ফারুক। এজন্য পেশাদার ডেকোরেশন কর্মীদেরও নিয়োজিত করেছিলেন । নগরীর মেন্দিবাগের ফজল ম্যানশনের প্রিন্টিরিয়ন হাউজের স্বত্বাধিকারী আব্দুল জলিল পলাশ এর কাজ করেন। যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, কোনোটি এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা স্কয়ার ফিট আবার কোনোটি এর চেয়ে কম বা বেশি এমন দামে করা হয়েছে। এতে সর্বমোট ১৪/১৫ লাখ টাকা খরচ হয়েছে বলে মনে হয়।
প্রায় এক বছর আগে ওসি স্যারের ফ্ল্যাটের কাজ করেছি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট করে মনে নেই কত টাকা লেগেছে। তবে তিনি তার মনমতো করে ডেকোরেশন করেছেন। তবে, ফ্ল্যাটটি রাজকীয় স্টাইলে সাজাতে ২২ লাখ টাকারও বেশি টাকা ব্যয় হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। ডেকোরেশনসহ শুধুমাত্র এই ফ্ল্যাটের মূল্য দুই কোটি টাকার কাছাকাছি চলে যাবে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
স্ত্রীর সর্বমোট আয় ২৪ লাখ টাকা …..
সিলেটের জৈন্তিয়া ডিগ্রি কলেজের অনার্সের শিক্ষক হিসেবে ২০১৭ সালে ওসি ওমর ফারুকের স্ত্রী উম্মুল খায়ের মাসুরা যোগদান করেন। তবে এখনো তার এমপিও হয়নি।
শুরু থেকে তাকে ২২ হাজার টাকা মূল বেতন ও মূল বেতনের ১৬ পার্সেন্ট বাড়ি ভাড়াসহ তার সর্বসাকুল্যে মাসিক বেতন ২৫ হাজার ৫২০ টাকা। শুরু থেকে এ পর্যন্ত আট বছরে তার সর্বমোট বেতনের পরিমাণ দাঁড়ায় ২৪ লাখ ৪৯ হাজার ৯২০ টাকা। অথচ তিনি দেড় কোটি টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট কিনেছেন। একজন কলেজ শিক্ষক কিভাবে উচ্চ মূল্যের ফ্ল্যাটটি কিনেছেন সেটি বেরিয়ে এসেছে অনুসন্ধানে। যা রীতিমতো বিস্ময়কর। এ বিষয়ে জৈন্তিয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মো. শামস উদ্দিন আহমদ জানান শিক্ষক উম্মুল খায়ের মাসুরা আমাদের কলেজে ফুলটাইম শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। তার এমপিও হয়নি ; তবে তিনি নিয়মিত বেতন পান ।
চোরাচালানের হোতা ………
পুলিশ সূত্র জানায়, ২০১১ সালের ১ জুলাই উপপরিদর্শক (এসআই) পদে মো. ওমর ফারুক বাংলাদেশ পুলিশে মৌলভীবাজার জেলায় যোগদান করেন। এরপর থেকে তিনি বিভিন্ন পুলিশ ফাঁড়ি, গুরুত্বপূর্ণ থানায় চাকরি করেন। ২০১৯ সালের ১৮ নভেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত গোয়াইনঘাট থানার ওসি (তদন্ত) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর ২০২৩ সালের ২৭ জানুয়ারি থেকে একই বছরের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত জৈন্তাপুর থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সিলেট অঞ্চলের চোরাচালানের প্রধান রুট হিসেবে পরিচিত গোয়াইনঘাট-জৈন্তাপুর থানায় কর্মরত অবস্থায় তিনি চোরাকারবারিদের সাথে সখ্যতা তুলেন। সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবাধে গরু মহিষ, চিনি, শাড়ী, কসমেটিক, চা-পাতা ভারত থেকে নিয়ে আসা হয়। ওসির যোগসাজসেই এগুলো চলতো বলে এলাকায় জনশ্রুতি রয়েছে। সীমান্ত এলাকার ওসিরা সীমান্তের চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করেন গণমাধ্যমে এমন সংবাদ প্রচারিত হলে ২০২৩ সালের ৩০ আগস্ট তাকে জৈন্তাপুর থানা থেকে সিলেট জেলা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়। পরে সিলেট থেকে তাকে মৌলভীবাজার জেলায় বদলি করা হয়।
আছেন বহাল তবিয়তে ……..
এতোসব অভিযোগ আর রম রমা বাণিজ্য, চোরাচালানের সাথে সম্পৃক্ততার পরেও পুলিশ পরিদর্শক ওমর ফারুক বহাল তবিয়তে আছেন। অতীতের রেকর্ড মুছতে তিনি নতুন করে পরিচিত হতে চেষ্টা শুরু করেছেন। সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার রাজনগর গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মালেকের পুত্র ওমর ফারুক। তিনি কেবল সিলেটে ফ্ল্যাট কিনেই ক্ষান্ত হননি ; ধর্মপাশা উপজেলা সদরে “মালেক মঞ্জিল” নামের ডুপ্লেক্স বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এছাড়াও নিজ গ্রামেও জমিজমা কিনেছেন বলেও জানা গেছে।
ওসি ওমর ফারুকের বক্তব্য…..
নিজের নামে ফ্ল্যাট কেনার বিষয়ে জানতে চেয়ে উম্মুল খায়ের মাসুরার মোবাইল ফোনে গতকাল সন্ধ্যায় সিলেটের ডাক’র বার্তা কক্ষ থেকে একাধিকবার কল দেয়া হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
যোগাযোগ করা হলে কুলাউড়া থানার ওসি ওমর ফারুক স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাট কেনা, নিজের নামে অবৈধ সম্পদের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, শাহজালাল টাওয়ারে আমি ভাড়াটে হিসেবে বসবাস করছি। হয়তো বা কেউ আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। তবে, তাকে সুনির্দিষ্ট একাধিক প্রশ্ন করা হলে তিনি এর সদুত্তর দেননি।




