৩৬ বছর পর নারী নেতৃত্বহীন ভোট
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২:৩৮:০৩ অপরাহ্ন
অনলাইন ডেস্ক : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মহাকাব্যিক পরিবর্তনের সাক্ষী হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত, মাঝখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর বাদ দিলে প্রায় ৩৪ বছর দেশ পরিচালনার দায়িত্ব ছিল দুই নেত্রীর কাঁধে। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী রাজনৈতিক মেরুকরণ নিশ্চিত করেছে যে, দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ এক নতুন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে।
দীর্ঘ এক অধ্যায়ের প্রস্থান :
১৯৯১ থেকে ২০২৪— এই দীর্ঘ সময়কে বলা হতো ‘দুই নেত্রীর শাসনের যুগ’। তবে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের অভ্যুত্থান এই ধারাবাহিকতায় ছেদ টেনেছে। গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন শেখ হাসিনা। বর্তমানে তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে দীর্ঘ ১৫ বছর শাসন করা দলটির প্রত্যাবর্তনের পথ আপাতত রুদ্ধ। অন্যদিকে, রাজনীতির প্রতিকূল পরিবেশ এবং বয়স বিবেচনায় আগামীতে শেখ হাসিনাকে ‘রাজনীতি’ ও ‘সরকারে’ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনাও খুব কম।
সম্প্রতি একটি বিদেশি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় জানান, তার মা রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার পরিকল্পনা আগেই করে রেখেছিলেন। এটাই তার শেষ মেয়াদ হওয়ার কথা ছিল। তিনি অবসর নিতে চেয়েছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়াকে ‘এক অর্থে শেখ হাসিনা যুগের অবসান’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অন্যদিকে, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের নায়ক এবং সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজধানীর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে একটি বড় রাজনৈতিক যুগের সমাপ্তি ঘটেছে। বর্তমানে বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে আছেন তার পুত্র তারেক রহমান।
তারেক রহমান বনাম জোটের লড়াই :
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ক্ষমতার লড়াইয়ে থাকা প্রধান শক্তিগুলোর কোনোটিতেই এখন শীর্ষ পদে কোনো নারী নেতৃত্ব নেই। বিএনপির হাল ধরেছেন দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করলে তিনিই যে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, তা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। এটি হবে তারেক রহমানের জন্য প্রথম নির্বাচন।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত ১১ দলীয় জোট এখন রাজপথের অন্যতম প্রধান শক্তি। এই জোট থেকে সরকারপ্রধানের পদে যাকে বেছে নেওয়া হোক না কেন, তিনি একজন পুরুষই হবেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
৩৬ বছর পর নতুন ইতিহাস :
১৯৯০ সালে স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন বেগম খালেদা জিয়া। এরশাদ আমলের কাজী জাফর আহমদ ছিলেন বাংলাদেশের সর্বশেষ পুরুষ প্রধানমন্ত্রী (১৯৮৯-১৯৯০)। এরপর দীর্ঘ ৩৬ বছর পর (জাতীয় নির্বাচনের হিসেবে) কোনো পুরুষ নেতা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন, যা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা।
স্মৃতিতে নারী নেতৃত্বের যুগ :
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে প্রথম নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরবর্তীতে ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনীতি আবর্তিত হয় দুই নেত্রীকে কেন্দ্র করে।
১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে তিনি ১৯৯৬ সালে স্বল্প সময়ের জন্য এবং ২০০১ সালেও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। অন্যদিকে, শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় আসেন এবং পরে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা চার মেয়াদে ক্ষমতায় থেকে দেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
যদিও বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও সমালোচিত। দশম জাতীয় সংসদকে বলা হয় ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন’, একাদশ জাতীয় সংসদকে ‘রাতের ভোটের নির্বাচন’; সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ‘ডামি ভোটের নির্বাচন’ বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘গত তিন দশকে বাংলাদেশে নারী নেতৃত্ব যে শক্ত ভিত্তি পেয়েছিল, তা এখন প্রাকৃতিক এবং রাজনৈতিক কারণেই পরিবর্তনের মুখে। শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যু— এই দুই বাস্তবতায় ক্ষমতার কেন্দ্রে পুরুষ নেতৃত্বের অভিষেক এখন কেবল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।’



