অস্থির বিশ্বব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৫:৫৪:২৪ অপরাহ্ন
ইসমাইল আলী :
আমরা এক নতুন ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রত্যক্ষ করছি। নিয়ম ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্তম্ভ- জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং শুল্ক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত সাধারণ চুক্তি (জিএটিটি)- ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে রয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে, আমেরিকা ১৯৪৫ সালে তৈরি হওয়া বৈশ্বিক ব্যবস্থাকে (যা তারাই বানিয়েছে) আর রক্ষা করছে না। ট্রাম্প হুমকি দিচ্ছেন গ্রিনল্যান্ড দখলের, ইরান ও কিউবায় সরকার পরিবর্তনের, ন্যাটো থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহারের, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক, এবং জাতিসংঘকে পাশ কাটিয়ে একটি বিভেদমূলক ‘শান্তির বোর্ড’ তৈরির মাধ্যমে ইউরোপে আমেরিকার মিত্রদেরও হতবাক করেছেন।
যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন মনে করেন এই সিদ্ধান্তগুলো মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিমালায় একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তন। ট্রাম্প হ্যাজ অ্যাবন্ডনড দ্য ওয়ার্ল্ড (ঞৎঁসঢ় যধং ধনধহফড়হবফ ঃযব ড়িৎষফ) কলামে তিনি লিখেছেন যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস জলবায়ু চুক্তিসহ ৬৬টি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে বেরিয়ে এসেছে।
যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবে বিশ্ব বাণিজ্য উন্মুক্ততার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী, ট্রাম্প ২রা এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে একটি অভূতপূর্ব সংরক্ষণবাদী বাণিজ্য নীতি ঘোষণা করেছিলেন, যাকে ‘আমেরিকার মুক্তি দিবস’ হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেছেন। বৈদেশিক সাহায্য- যা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন কূটনীতির ভিত্তিপ্রস্তর- মানবিক সহায়তা এবং ভূ-রাজনৈতিক উভয় উদ্দেশ্যেই কাজ করে, তাও তীব্রভাবে আমেরিকা হ্রাস করেছে। সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট অনুমান করে যে এই কাটছাঁটের ফলে বিশ্বজুড়ে বছরে প্রায় দশ লক্ষ অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হতে পারে। ল্যানসেটের একটি সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যদি টঝঅ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না করে এবং গরিব দেশগুলোতে মানবিক সাহায্য না বাড়ায় তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে ১ কোটি ৪০ লক্ষ মানুষ জীবন হারাতে পারে।
ওয়াশিংটনের দিকনির্দেশনা স্পষ্ট : আমেরিকা ১৯৪৫-পরবর্তী বিশ্ব-ব্যবস্থা প্রতিস্থাপন করতে চায়। নতুন মডেলটি ঊনবিংশ শতাব্দীর মতো- সর্বজনীন নিয়মের উপর প্রভাবের ক্ষেত্র। স্টিফেন ওয়াল্ট, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক, যুক্তি দেন যে ট্রাম্প আমেরিকার শক্তিকে এমনভাবে ব্যবহার করছেন যাতে নিশ্চিত করা যায় যে- মিত্র বা প্রতিপক্ষ- যার সাথেই বাণিজ্য বা বৈদেশিক সম্পর্কের চুক্তি হোক না কেন, আমেরিকা লাভের সিংহভাগ পাবে।
বেন স্টিল (কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের আন্তর্জাতিক অর্থনীতির পরিচালক) একটি বিভক্ত বিশ্বের পূর্বাভাস দিচ্ছেন। আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে থাকা বিশাল অংশ, চীনের নেতৃত্বে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং একটি বিপজ্জনকভাবে প্রতিযোগিতামূলক ইউরোপ যেখানে রাশিয়া তার পূর্ব সীমান্তকে চ্যালেঞ্জ করে চলেছে।
আমেরিকাার এই পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতি এবং নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য কোনও বিমূর্ত উদ্বেগের বিষয় নয় বরং একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। এটি মোকাবিলার জন্য আমাদের একটি সতর্ক এবং সক্রিয় পররাষ্ট্রনীতি প্রয়োজন যা জাতীয় নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ নিশ্চিত করতে পারে।
জাতিসংঘসহ বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলি ঐতিহাসিকভাবে কূটনৈতিক মধ্যস্থতা, উন্নয়ন অর্থায়ন এবং পূর্বাভাসযোগ্য বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা হিসাবে কাজ করে আসছিলো। কিন্তু নীতির চেয়ে শক্তি যেভাবে বিশ্বব্যবসতাকে প্রভাবিত করছে আমাদের জন্য তা খুবই বিপজ্জনক। এমতাবস্থায় বাংলাদেশের দীর্ঘস্থায়ী কৌশল- ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বিদ্বেষ নয়’- টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠছে।
সতর্কতার (ধিৎহরহম ংরমহ) লক্ষণগুলি ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। আমেরিকা সম্ভাব্য উচ্চ শুল্কের ইঙ্গিত দিয়েছে যদি বাংলাদেশ চীনের সাথে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে থাকে এবং চীনের সহযোগিতায় ভারতের সীমান্তের কাছে প্রস্তাবিত ড্রোন কারখানা নির্মাণ করে। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানের কারণে, বৃহৎ শক্তিগুলি আমাদের সাথে বিশেষ সামরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত উভয়ই চীনকে একটি প্রধান ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে দেখে এবং বাংলাদেশ সেই কৌশলগত প্রতিযোগিতায় আটকা পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ‘আন্তর্জাতিক সংকট গ্রুপ’ (ওহঃবৎহধঃরড়হধষ পৎরংরং মৎড়ঁঢ়) বর্তমান সরকারের জন্য তিনটি বিশেষভাবে সংবেদনশীল চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে : তীব্রতর মার্কিন-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা মোকাবিলা, ভারতের সাথে সম্পর্ক পরিচালনা এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট সমাধান।
প্রাক্তন কূটনীতিক হুমায়ুন কবির সতর্ক করে বলেছেন যে বাংলাদেশ আরও জটিল ভূ-রাজনৈতিক পর্যায়ে প্রবেশ করতে চলেছে। উন্নয়নের অংশীদাররা ক্রমবর্ধমানভাবে কিছু বিষয়ে প্রতিশ্রুতি এবং সরাসরি সমর্থন আশা করবে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের (ঞযব নঁংরহবংং ঝঃধহফধৎফ) নির্বাহী সম্পাদক শাখাওয়াত লিটনের সাথে কথা বলতে গিয়ে তিনি আরো বলেছেন যে বাংলাদেশের কূটনীতির পরবর্তী ৫০ বছর গত ৫৪ বছরের তুলনায় মৌলিকভাবে আলাদা হবে। শেখ হাসিনার ১৭ বছরের শাসনের অবসান- যে সময়ে পশ্চিমারা মূলত ভারতের চশমা দিয়ে বাংলাদেশকে দেখেছিল- আমাদের পররাষ্ট্র নীতির ক্যালকুলাসে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অবকাঠামো, কৃষি এবং স্বাস্থ্য খাতে তারা ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। তবে, আমাদের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তাই উভয়ের সাথেই শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা অপরিহার্য। প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর স্বার্থ সাবধানতার সাথে মোকাবেলা করে আমাদের নিজস্ব এজেন্ডা এগিয়ে নিতে হবে। এমতাবস্থায় অবশ্যই বৃহৎশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়া এড়াতে হবে। ইতিহাস দেখায় যে এই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় আটকে পড়া দেশগুলি- সিরিয়া, সোমালিয়া এবং আফগানিস্তান- ধ্বংসাত্মক পরিণতি ভোগ করে।
এদিকে, আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে আমাদের বৈরী সম্পর্ক বিদ্যমান। বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাব উদ্বেগজনকভাবে উচ্চ। অনেকেই মনে করেন, নয়াদিল্লি কেবল শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনকে দীর্ঘায়িত করেনি বরং বাংলাদেশকে একটি অনুগত প্রদেশ হিসেবে বিবেচনা করে।
তাই বিবিসির প্রতিবেদন যথাযথভাবে প্রশ্ন করেছে: নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অধীনে কি এই ভাঙা সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করা যাবে? যেহেতু তার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সাথে ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে শিতল এবং অনেক গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সমস্যা অমীমাংসিত রয়েছে সেকারণে এটি সহজ হবে না। সম্পর্ক উন্নত করতে হলে, নয়াদিল্লিকে বাংলাদেশের জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। কেবল শেখ হাসিনার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা আওয়ামী লীগের সাথে জোটবদ্ধতার উপর নির্ভর করে নয়। ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি যদিও ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাদের বিদেশনীতি মূলত চাণক্যের বিখ্যাত উক্তির প্রতিধ্বনি: ‘প্রতিটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রই শত্রু, এবং শত্রুর শত্রুই বন্ধু।’
তারপরও, ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি এবং এশিয়ায় আমাদের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। ভারতের সাথে আমাদের ৪,০৯৬ কিলোমিটার (২,৫৪৫ মাইল) সীমান্ত রয়েছে, যা গভীর নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক এবং সাংস্কৃতিক সংযোগ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। আমার কলাম ‘দ্য লজিক অফ বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া টাইজ (ঞযব ষড়মরপ ড়ভ নধহমষধফবংয-ওহফরধ ঃরবং) যা লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের সাউথ এশিয়া ব্লগে প্রকাশিত হয়েছিল। সেখানে আমি বিশেষভাবে তুলে ধরেছি কিভাবে উভয় দেশই সংঘর্ষের চেয়ে সহযোগিতামুলক সম্পর্কের মাধ্যমে লাভবান হতে পারে। তবে ভারত বাংলাদেশকে অবশ্যই একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সম্মান দিতে হবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে একটি হচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন। এই ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষয় এবং গতানুগতিক কূটনীতির সীমাবদ্ধতাকেও তুলে ধরে। এই প্রেক্ষাপটে, মার্কিন কংগ্রেসের প্রভাবশালী সদস্য, যুক্তরাজ্যের চ্যাথাম হাউসের (ঈযধঃযধস যড়ঁংব) মতো শীর্ষস্থানীয় থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক এবং বিবিসি, সিএনএন এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো আন্তর্জাতিক মিডিয়াকে সম্পৃক্ত করা হলে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে সাহায্য করতে পারে।
জাতিসংঘসহ বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলির কর্তৃত্বের দুর্বলতা, মুক্ত বাণিজ্য থেকে পশ্চাদপসরণ, বিদেশী সাহায্যে গভীর কাটছাঁট, এবং ট্রান্সআটলান্টিক সম্পর্কের ফাটল বাংলাদেশের মতো ছোট দেশগুলির জন্য উদ্বেগের বিষয়। আমেরিকার সার্থপর পররাষ্ট্রনীতি, ইউরোপীয়দের নিজস্ব নিরাপত্তা উদ্বেগ, চীন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হওয়া, এবং ভারতের দাদাগিরি মনোভাবের কারণে বাংলাদেশকে বাস্তবতার আলোকে তার বহিরাগত অংশীদারিত্ব পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। কোন বিশেষ শক্তির বলয়ে নয়। বরং তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি হবে বহুমুখী এবং বৈচিত্র্যময়। দেশের সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত করাই হবে এর প্রধান চালিকা শক্তি। যেমনটি আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলছেন- ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।
লেখক : লন্ডন প্রবাসী কলামিস্ট।


