১৪৪ ধারা জারি
৪ দিনের উত্তেজনার পর নবীগঞ্জে ভয়াবহ সংঘর্ষে নিহত ২, আহত কয়েক শতাধিক
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৮ জুলাই ২০২৫, ৪:৪৪:৪০ অপরাহ্ন
রাকিল হোসেন, নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) থেকে নিজস্ব সংবাদদাতা : নবীগঞ্জ শহরে সম্প্রতি দফায় দফায় একাধিক সংঘর্ষের জের ধরে ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, বেসরকারী হাসপাতাল ও যানবাহনে ভাঙচুর, দোকানপাটে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ৪ দিনে অন্তত কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এতে ২ জন নিহত ও উভয় পক্ষের কয়েক শতাধিক লোক আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় শহরে ১৪৪ ধারা জারি করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। আজ মঙ্গলবার রাত ১২ টা পর্যন্ত এই ধারা বলবৎ থাকবে। এ সময়ের মধ্যে সকল ধরনের যানবাহন, মানুষের চলাচলসহ দোকানপাট বন্ধ থাকবে।
গতকাল সোমবার সকালে আনমনু ও তিমিরপুর গ্রামের লোকজন পূর্ব ঘোষণা দিয়ে নিজ নিজ এলাকায় পূর্ব প্রস্তুতিমূলক সভা করেন। এর পর বিকেল ৩টায় ঘোষণা দিয়ে উভয় গ্রামের শত শত মানুষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। সংঘর্ষটি এক পর্যায়ে নবীগঞ্জ শহরের আশপাশের আনমনু, নোয়াপাড়া, রাজাবাদ এক পক্ষ, অপর পক্ষে পূর্ব তিমিরপুর, পশ্চিম তিমিরপুর ও চরগাঁওয়ের নারী-পুরুষ দু’টি পক্ষ হয়ে কয়েক হাজার মানুষ সংঘর্ষে জড়ান।
সংঘর্ষ চলাকালে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে উভয় পক্ষে কয়েক শতাধিক নারী পুরুষ আহত হয়েছেন। এতে পূর্ব তিমিরপুর গ্রামের এম্বুলেন্স চালক ফারুক মিয়া (৪২) নামে একজন মারা গেছেন। রাতে মারা যান আনমনু গ্রামের বাসিন্দা লিমস মিয়া (২৫)।
এ সময় শহরের মধ্যে শতাধিক দোকান পাট ভাংচুর ও লুটপাট হয়েছে। সংঘর্ষ চলাকালে কয়েকটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন দেয়া হয়। বিশেষ করে ইউনাইডেট হসপিটাল ভাংচুর, মাছ বাজার, হোটেল হাসেমবাগে ভাংচুর লুটপাট হয়েছে।
এছাড়া, শহরের মধ্যবাজার, হাসপাতাল সড়কের প্রতিটি মার্কেট ও দোকানপাট ভাংচুর ও লুটপাট হয়েছে। এই অরাজকতা শহরের মধ্যে চলে প্রায় ৪ ঘণ্টাব্যাপী। পরে যৌথবাহিনী প্রাণান্ত চেষ্টা করে সংঘর্ষ থামায়।
স্থানীয়দের অভিমত, শহরজুড়ে এক ধরণের নৈরাজ্যকর অবস্থা তৈরি হয়েছে। গুজব ছড়িয়ে আনমনু ও তিমিরপুর গ্রামের মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনাকে উসকে দিয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করার পাঁয়তারা করছে একটি বিশেষ মহল। কারণ আনমনু গ্রাম হচ্ছে মৎস্যজীবি।
গত শুক্রবার রাতে সংঘাতের পর পুলিশ ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভিযান শহরের পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করলেও পরদিন শনিবার সকাল থেকে আবার উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আনমনু গ্রামের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নবীগঞ্জ শহর ও আনমনু পয়েন্টে জড়ো হতে থাকলে আতঙ্কে দোকানপাট বন্ধ করে দেন ব্যবসায়ীরা। এর জের ধরে শহরে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। রোববার সকালে ও রাতে সংঘর্ষ ও চোরাগুপ্তা হামলা হয়। এর জের ধরে গতকাল সোমবার সকালে উভয় গ্রামের লোকজন সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।
শহরে সংঘর্ষের সময় সুযোগ নিয়ে হামলা ও লুটপাট চালায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র। শামীম আহমদ নামে এক ব্যবসায়ী ও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বাজারে যখন আতঙ্কে নিরবতা নেমে আসে এবং কেউ থাকে না, তখন এই চক্রটি ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে ঢুকে হামলা ও লুটপাট চালায়।
গত ৪ দিনে বাজারের অন্তত ৫০টি দোকানে ভাঙচুর ও লুটের ঘটনা ঘটে।
ব্যাটারিচালিত মিশুক ভাঙচুর করে ব্যাটারি চুরি করা হয়েছে। এছাড়া, আরো কয়েকটি মিশুক ভাংচুর ও মোটর সাইকেলে আগুন দেয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, অনেকেই সর্বস্ব হারিয়ে পথে বসেছেন।
সংঘাত নিরসনে হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সুজাত মিয়া, জামায়াত মনোনীত এমপি প্রার্থী মোঃ শাহজাহান আলী, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সরফরাজ আহমদ চৌধুরী, গণঅধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা আবুল হোসেন জীবন প্রমুখ ব্যক্তিরা সালিশের উদ্যোগ নিয়েছেন। কিন্তু সালিশ না মেনে দু’পক্ষই সংঘর্ষে যায়। সন্ধ্যার পর উপজেলার বাংলাবাজারে মৎস্যজীবীদের মাছের বাজার গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়াও রামপুরের মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ শহরে মারামারিতে আসতে চাইলে মান্দারকান্দির অমৎসজীবীরা মারধর করেন। এ ছাড়া দুর্লভপুর গ্রামেও সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। উপজেলার বিভিন্ন গ্রামেও এ সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ার আংশকা করা যাচ্ছে।




