‘জুলাই বিপ্লবী’ পরিচয়ে সরকারি সুযোগ গ্রহণ ; ছাত্রলীগ নেতাসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে তদন্ত ও শাস্তি দাবি
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৬ জুলাই ২০২৫, ৮:০৬:২৫ অপরাহ্ন
জকিগঞ্জ (সিলেট) প্রতিনিধি : সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলায় ‘জুলাই বিপ্লব’-এ আহত দাবি করে সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণকারী এক ছাত্রলীগ নেতাসহ অন্তত আটজনকে ভুয়া পরিচয়দাতা হিসেবে চিহ্নিত করে তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও শিক্ষার্থীরা। গত রোববার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দেন ১৮ জন সচেতন ব্যক্তি। অভিযোগপত্রে তাদের আহত হওয়ার কোনো বাস্তব প্রমাণ ছাড়াই এসব ব্যক্তি মিথ্যা তথ্য দিয়ে সরকারি তালিকায় নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়।
অভিযোগকারীরা বলেন, এসব ব্যক্তি আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণ না করেও পুরনো আঘাত, জন্মগত রোগ বা পারিবারিক ঘটনার চিকিৎসা নথি ব্যবহার করে নিজেদের ‘আহত জুলাই বিপ্লবী’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এতে প্রকৃত আহতরা যেমন বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি অপব্যবহার হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পদের। অভিযোগের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে জকিগঞ্জ থানা, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোতেও।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জকিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “একটি অভিযোগ পেয়েছি যাচাই-বাছাই করে সত্যতা পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অভিযোগে বলা হয়, প্রকৃত আহতদের বাইরে ছাত্রলীগের এক নেতাসহ কিছু ব্যক্তি খেলার সময় বা পারিবারিক ঘটনার আঘাত, এমনকি জন্মগত সমস্যা জনিত চিকিৎসার কাগজ ও আন্দোলনে অংশ না নিয়েই মিথ্যা তথ্য দিয়ে ‘আহত জুলাই বিপ্লবী’ হিসেবে নিজেদের নাম তালিকাভুক্ত করে সরকারের সহায়তা গ্রহণ করছেন। এতে প্রকৃত আহতদের প্রাপ্য অধিকার যেমন ক্ষুন্ন হচ্ছে, তেমনি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার হচ্ছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
অভিযোগে জুলাই বিপ্লবের ভুয়া বিপ্লবী উল্লেখ করে যে ৮ জনের নামোল্লেখ করা হয়, তারা হলেন- জকিগঞ্জ পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক আনন্দপুর গ্রামের আব্দুল জলিলের ছেলে জুবের আহমদ, গন্ধদত্ত গ্রামের আব্দুল করিমের ছেলে ওয়াসিম আকরাম শাহান, মাইজকান্দি গ্রামের আতাউর রহমানের ছেলে মো. মাজেদুর রহমান জুনেদ, মাইজকান্দি গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে এহসানুল ইসলাম ও তার আপন ভাই আদনান ইসলাম, মাইজকান্দি গ্রামের সালেহ আহমদের ছেলে সাইদুজ্জামান, মুমিনপুর সইদাবাদ গ্রামের শফিকুল হকের ছেলে রুমেল আহমদ, খলাছড়া গ্রামের আব্দুস সালামের ছেলে শাহাব উদ্দিন বাবলু।
অভিযোগে দাবি করা হয়, পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক জুবের আহমদ মূলত খেলার সময় পায়ে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছিলো। পরে গণঅভ্যুত্থানে নিজেকে আহত দাবি করে আগের চিকিৎসার কাগজপত্র ব্যবহার করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে গেজেটভুক্ত হয়ে সরকারি সুবিধা গ্রহণ করে। তার গেজেট নম্বর: ৩৭৭ ও মেডিকেল কেইস নম্বর: ৩৭৪৩১। গন্ধদত্ত গ্রামের ওয়াসিম আকরাম শাহান আন্দোলনে অংশ নিলেও আহত হয়নি; কিন্তু জেলার দায়িত্বশীল আত্মীয়ের প্রভাব ব্যবহার করে গেজেটভুক্ত হয়ে যায়। তার গেজেট নম্বর: ৩০৪, মেডিকেল কেইস নম্বর: ৩১৮৯৪। মাইজকান্দি গ্রামের মো. মাজেদুর রহমান জুনেদ জন্মগতভাবে শ্রবণ সমস্যায় ভুগলেও আন্দোলনে আহত হওয়ার মিথ্যা তথ্য দিয়ে আত্মীয় চিকিৎসকের সহায়তায় গেজেটভুক্ত হয়েছে। তার গেজেট নম্বর: ৩৭৩ ও মেডিকেল কেইস নম্বর: ৩৭২৭৮। মাইজকান্দি গ্রামের এহসানুল ইসলাম ও তার আপন ভাই আদনান ইসলাম আন্দোলনে অংশ নিলেও আহত হয়নি; চিকিৎসক আত্মীয়ের সহায়তায় ভূয়া চিকিৎসার কাগজপত্র তৈরি করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে গেজেটভুক্ত হয়। তাদের দু’জনের গেজেট নম্বর: ৩৬৬, ৩৬৬ ও মেডিকেল কেইস নম্বর: ৩৭১৭৯, ৩৭১৭৯। মাইজকান্দি গ্রামের সাইদুজ্জামান আন্দোলনে অংশ নেয়নি; আন্দোলন চলাকালে সে তার বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি উঠিয়েছিলো; পরে এক আত্মীয়ের সহায়তায় নকল কাগজে গেজেটভুক্ত হয়। তার গেজেট নম্বর: ৩৬৫ ও মেডিকেল কেইস নম্বর: ৩৭১৫৯। মুমিনপুর সইদাবাদ গ্রামের রুমেল আহমদ পারিবারিক মারামারিতে আহত হয়েছিলো। পরে নিজেকে আন্দোলনে আহত দাবি করে হাসপাতালের কাগজপত্র দিয়ে গেজেটভুক্ত হয়েছে। তার গেজেট নম্বর: ৯৩ ও মেডিকেল কেইস নম্বর: ৬৪৮। খলাছড়া গ্রামের শাহাব উদ্দিন বাবলু আন্দোলনে অংশগ্রহণ করলেও আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি; তবুও রাজনৈতিক আত্মীয়ের সহায়তায় চিকিৎসার ভুয়া কাগজ তৈরি করে তালিকায় নাম সংযুক্ত করে। তার গেজেট নম্বর:২৮৮ ও মেডিকেল কেইস নম্বর: ২৯০৮০।
অভিযোগকারীরা আরও উল্লেখ করেন, “ জুলাই বিপ্লবের প্রকৃত আহতদের যেন ন্যায্য সম্মান ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। যারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে সরকারি সুবিধা নিচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
অভিযোগে স্বাক্ষরকারী জকিগঞ্জ পৌরসভা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শিব্বির আহমদ রনি জানান, ‘৪ আগস্ট তিনি জকিগঞ্জে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অথচ তিনি গেজেটে স্থান পাননি। গেজেটে যাদের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তাদের মধ্যে অনেককেই তিনি সেদিন আন্দোলনে দেখেন নি। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘এ রকম একটি অভিযোগ পেয়েছি। যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অভিযোগকারীদের মধ্যে অনেকেও বলছেন তারা এ অভিযোগের বিষয়টি জানেন না। তাদের নাম ব্যবহার করা হয়েছে। সব বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’




