কে থামাবে সিলেট নগরীর বেপরোয়া অটোরিক্সা!
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ জুলাই ২০২৫, ৮:২১:৪৭ অপরাহ্ন
আহমাদ সেলিম : সিলেট নগরীতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা। মূল সড়কে অটোরিক্সার চলাচলে নাগরিক বিড়ম্বনার পাশাপাশি বিপদে পড়ছে অন্য যানবাহনগুলো। সেই সাথে প্রতিদিনই ঘটছে দুর্ঘটনা। তবে, এ ব্যাপারে ট্রাফিক পুলিশ কিংবা সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক)-এর জোরালো ভূমিকার অভাবে ক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ। অটোরিক্সার দৌরাত্মের পেছনে কিছু অসাধু ট্রাফিক পুলিশের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অবশ্য, ডিসি ট্রাফিক বিষয়টি অস্বীকার করেছেন।
সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ অনুযায়ী, ‘কোনো ব্যক্তি কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত অনুমতিপত্র ব্যতীত গণপরিবহণ চালাইতে বা চালাইবার অনুমতি প্রদান করিতে পারিবেন না।’ কিন্তু সিলেটে অটোরিক্সা চলাচল কোনো নীতিমালার মধ্যে পড়ছে না। পঙ্খিরাজের মতো তাদের গতিবিধি দেখলে উল্টো মনে ভয় জাগে, আতংকিত থাকতে হয় গন্তব্যে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত যাত্রীদের।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সিলেট নগরীর জিন্দাবাজার, ওসমানী মেডিকেল সড়ক, শাহী ঈদগাহ, আম্বরখানা, জেল রোড, বাগবাড়ি, মদিনা মার্কেট, বন্দরবাজার, আম্বরখানা, টিলাগড়, সুবিদবাজার, রেলস্টেশন-সব গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টেই তারা বিমান গতিতে ছুটছে। সময় বাঁচানোর জন্য অনেকে এ সকল রিক্সায় শিশুসন্তানসহ উঠছেন। অনেকে সময় বাঁচাতে গিয়ে জীবনকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন। এ রকম বেশ কয়েকটা ঘটনাও ঘটেছে গত কয়েক দিনের ব্যবধানে।
গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে তালতলা এলাকায় অটোরিক্সার ধাক্কায় এক শিশুর রক্ত ঝরেছে। শিশুটিকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছিলেন তার মা। হঠাৎ পেছন থেকে ধাক্কা দিলে শিশুর সাথে তার মা-ও আহত হন।
নগরবাসীর সাথে কথা বলে জানা গেছে, ব্যাটারিচালিত রিক্সা গত কয়েক বছর ধরেই সিলেট নগরীর ভেতর চলাচল করছে। শহরতলীর নির্দিষ্ট কিছু এলাকার মধ্যে তারা সীমাবদ্ধ ছিলো। তবে জুলাই বিপ্লবের পর থেকে তারা বেপরোয়া।
স্থানীয় সড়কগুলোর পাশাপাশি তারা মূল সড়ক দিয়েও হরহামেশা চলাচল করছে। অবস্থা এমন, তাদের ভিড়ে প্যাডেলচালিত রিক্সাগুলোও কমে যাচ্ছে। তার চেয়ে ভয়ংকর হচ্ছে, সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে তারা কোনো নিয়ম মানছে না। হুট করে উঠে আসছে মূল সড়কে। চলে উল্টো পথেও। অনেক চালক বেপরোয়া গতিতে অটোরিক্সা চালায়। ফলে প্রতিদিন নগরীর ভেতর ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। এছাড়া, সংশ্লিষ্ট কোন দপ্তরের কোন প্রশিক্ষণ না থাকায় অটোরিক্সা চালকদের আচরণও মারমুখী। অনেকক্ষেত্রে তারা যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করছে অতিরিক্ত ভাড়া। শাহী ঈদগাহ-জেল রোড রোডে সিএনজি অটোরিক্সার যাত্রী প্রতি ভাড়া ১৫ টাকা হলেও, অটোরিক্সা চালকরা সেখানে আদায় করছে ৪০-৫০ টাকা। এ নিয়ে যাত্রীদের সাথে চালকদের প্রায়শঃ বচসা হতে দেখা যায়। মূল সড়কে অটোরিক্সার বেপরোয়া চলাচলে বিপদে পড়ছে মোটরসাইকেল, কারসহ অন্য যানবাহনগুলো। হঠাৎ করো অটোরিক্সা আস্ফালনের জন্য ট্রাফিক বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, কদমতলী, আম্বরখানা, কুমারগাঁও এলাকায় দায়িত্বরত কতিপয় ট্রাফিক পুলিশ এদের নিয়ন্ত্রণ করছেন। ওই এলাকা দিয়ে যতগুলো টমটম কিংবা অটোরিক্সা চলাচল করছে, তাদের হিসেবেই চলছে।
রিকাবীবাজারে কথা হয় নাসের হামিদ নামে এক চিকিৎসকের সাথে। স্টেডিয়ামে ওই চিকিৎসকের চেম্বার রয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে মানুষ।’ বলেন, ‘কিছুদিন আগে রিকাবীবাজার এলাকার আমার মোটরসাইকেলে এসে ধাক্কা দেয় অটোরিক্সা। এতে নিজে আহত হই। তিনি বলেন, ‘ঈদের পরে শাহী ঈদগাহস্থ নূরে-আলা কমিউনিটি সেন্টারের পাশে গুরুতর আহত হন একজন নারী। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই নারী মারা যাবার খবর শুনেছি।’
গত বুধবার দুপুরে জিন্দাবাজার ব্লু-ওয়াটার শপিং সিটির সম্মুখে মানুষের জটলা। কাছে গিয়ে দেখা গেলো, রীতিমতো হাতাহাতি চলছে। কথা হলে মোটরসাইকেলের চালক হিমন বলেন, ‘আমার আড়াই লক্ষ টাকার গাড়ি। দাঁড়িয়ে থাকার পরও পেছন থেকে হঠাৎ ধাক্কা দিলো।’
বনকলাপাড়া এলাকার বাসিন্দা কলেজ শিক্ষক শহিদুল ইসলাম বলেন, যে সকল রিক্সা রাতের বেলা শহরতলীতে চলাচল করতে ভয় পেতো; তারা দিনদুপুরে শহরের মূল সড়কে উঠে এলো কাদের ইশারায়?
লামাবাজার এলাকায় কার চালক শাহিন বলেন, অটোরিক্সা চালকদের বেশীরভাগ বয়সে তরুণ। কম সময়ে বেশী লাভের আশায় তারা পাগলের মতো গাড়ি চালাচ্ছে। অথচ তাদেরও জীবন রয়েছে, পরিবার রয়েছে। মূল সড়ক থেকে এসকল রিক্সা সরানোর দাবি জানান তিনি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার ঈদেই ৩২% দুর্ঘটনা ঘটেছে ব্যাটারিচালিত রিক্সায়। এমন পরিস্থিতিতে ২০১৪, ২০১৭ ও ২০২১ সালে ৩ দফা হাই কোর্ট ব্যাটারিচালিত রিক্সা বন্ধ ও আমদানি নিষিদ্ধ করলেও এসবের সংখ্যা না কমে বরং বাড়তে থাকে। সবশেষ গত বছর নভেম্বরে হাই কোর্ট আবারো তিন দিনের মধ্যে ব্যাটারি রিক্সা চলাচল বন্ধের নির্দেশ দেন। তবে চালকদের বিক্ষোভের মুখে পিছু হটে সরকার।
সিসিকের লাইসেন্স শাখার প্রধান রুবেল আহমেদ নানু জানান, ‘শুধু সিটি কর্পোরেশনের ভেতর কয়েক হাজার ব্যাটারিচালিত রিক্সা রয়েছে। যাদের কারো লাইসেন্স নেই। তারা পুরোটা অবৈধভাবে বিচরণ করছে।’
সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজা-ই-রাফিন সরকার বলছেন, ‘এদের দৌরাত্ম বন্ধ করতে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। প্রশাসনকে এগিয়ে আসতে হবে।’ আল-হামরা বিপণীবিতানের ব্যবসায়ী নেতা ইর্শাদ আলী বলেন, ‘পুরো শহর ভরে যাচ্ছে অটোরিক্সায়। তাদের গতি দেখলে মনে হয় রিক্সা নয়, ব্যাটারিচালিত বিমান চলছে।’ নগরীর ভেতর অটোরিক্সার অবাধ বিচরণ এবং কতিপয় ট্রাফিক পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রেক্ষিতে ডিসি (ট্রাফিক) মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছি। তবে আমাদের ব্যবস্থাই ওদেরকে বন্ধ রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। মানুষকেও সচেতন হতে হবে।
মানুষ তাদের মেনে নিচ্ছে কি না, সেটিও একটি বিষয়। তবে তারা যাতে মূল সড়কে না আসে, দুর্ঘটনা না ঘটে-এর জন্য আমরা সোচ্চার।’ অপর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে যে দূষণ প্রবাহিত হচ্ছে, এর বাইরে ট্রাফিক পুলিশ নয়। আমরা তাদের বিরুদ্ধেও তদন্ত চালাচ্ছি। প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নিবো।’ তবে অটোরিক্সা চালকদের অনেকের দাবি, কিছু অনভিজ্ঞ চালক আছেন, যারা বেপরোয়া। তাদের কারণে অন্য চালকদেরও অভিযোগের মুখে পড়তে হয়।




