বিশ্বনাথে চাঞ্চল্যকর স্কুলছাত্র হত্যা মামলায় যুক্তরাজ্য প্রবাসীসহ ৮ জনের ফাঁসি
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ৩১ জুলাই ২০২৫, ৫:৩১:১৮ অপরাহ্ন
রফিকুল ইসলাম জুবায়ের, বিশ্বনাথ (সিলেট) থেকে ॥ বিশ্বনাথে চাউলধনী হাওরপাড়ে প্রতিপক্ষের হাতে নির্মমভাবে হত্যার শিকার ১০ম শ্রেণীর ছাত্র সুমেল আহমদ শুকুর (১৭) হত্যা মামলার রায়ে একজন যুক্তরাজ্য প্রবাসীসহ ৮ জনের ফাঁসি, ৭ জনের যাবজ্জীবন ও মামলার চার্জশিটভুক্ত অবশিষ্ট ১৭ জনকে ২ বছর করে সশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছে। মামলায় মোট ৩২জন আসামীর মধ্যে একজন পলাতক থাকলেও প্রধান আসামীসহ বাকি সকলেই কারাবন্দী রয়েছে।
বুধবার দুপুরে সিলেটের অতিরিক্ত জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ৩য় আদালতের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দা আমিনা ফারহিন দৃষ্টান্তমূলক এই রায় ঘোষণা করেন। আদালতের এপিপি কামাল হোসেন গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে, স্কুল ছাত্র সুমেল আহমদ শুকুর হত্যার রায়ে সব কয়জন আসামীর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করায় বাদী পক্ষের লোকজন আদালত পাড়ায় মিষ্টি বিতরণ করেন। একমাত্র পুত্র হারানো বাবা কৃষক মানিক মিয়া আল্লাহ তায়ালার প্রতি শুকরিয়া জানাতে শোকরানা দোয়া মাহফিল সম্পন্ন করেছেন।
সিলেটের আদালত পাড়ার আলোচিত এই মামলায় যে ৮ জনের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় প্রদান করা হয়, তারা হচ্ছে, বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের মৃত আফতাব আলীর পুত্র সাইফুল আলম (৪০), নজরুল আলম (৩৭), সদরুল আলম (৩৯), একই ইউনিয়নের চৈতন নগর গ্রামের মনোহর আলীর পুত্র সিরাজ উদ্দিন (৪৩), ভাটিপাড়া গ্রামের ফিরোজ আলীর পুত্র জামাল মিয়া (৪৫), নেয়াগাঁও গ্রামের শফিক আলীর পুত্র শাহিন (৩৮), ঘাগুটিয়া গ্রামের মৃত আব্দুল জব্বারের পুত্র আব্দুল জলিল (৪৫) এবং সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার পশ্চিম গড়গড়ি গ্রামের মৃত মঈন উদ্দিনের পুত্র আকবর হোসেন (৩৬)।
আসামীদের ৭ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এরা হচ্ছে, বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের চৈতননগরের ইলিয়াছ আলী (৫২), আব্দুন নূর (৪৭), জয়নাল (৩৭) একই গ্রামের মনোহর আলীর পুত্র আশিক উদ্দিন (৪৬), মৃত আব্দুল লতিফের পুত্র আছকির আলী (৪৫), মৃত ইসকন্দর আলীর পুত্র ফরিদ মিয়া (৪২) ও শিশু মিয়ার পুত্র আকবর মিয়া (৪০)।
এছাড়া, মামলার চার্জশিটভুক্ত বাকী সকল আসামীর প্রত্যেককে দুই বছর করে সশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হয়েছে। এরা হচ্ছে, বিশ্বনাথ উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রামের আয়না মিয়ার পুত্র লুৎফুর রহমান (৪৫), মবনুরর মিয়া (৪৩), মৃত হাজী সোনা মিয়ার পুত্র মো. মখলিছ মিয়া (৬২), একই ইউনিয়নের চৈতননগর গ্রামের মৃত হারুনুর রশিদের পুত্র মামুনুর রশিদ (২৬), কাওছার রশিদ (২২), একই গ্রামের নেছাবর আলীর পুত্র দিলাফর আলী (৪৮), জমির আলীর পুত্র মুক্তার আলী (৩৮), মৃত আব্দুল লতিফের পুত্র আব্দুর রকিব (৪০), মখলিছ আলীর পুত্র পারভেজ (২৫), মৃত ছমরু মিয়ার পুত্র আজাদ মিয়া (৪৬), ওয়াহিদ (৩৫), আব্দুল আজাদের পুত্র জাবেদুল ইসলাম জাবেদ (২৪), শিশু মিয়ার পুত্র ফিরোজ আলী (৩৯), মনোহর আলীর পুত্র ফখর উদ্দিন (৪০), টিলা পাড়া গ্রামের তাহিদ আলীর পুত্র দিলোয়ার হোসেন (৩৮), ঘাগুটিয়া গ্রামের মৃত রইছ আলীর পুত্র আঙ্গুর আলী (৩৫) ও সুতারকান্দি গ্রামের মৃত বশির উদ্দিনের পুত্র শফিক উদ্দিন রাজন (৩২)।
প্রসঙ্গত, ২০২১ সালের ১ মে বিশ্বনাথ উপজেলার চৈতননগর গ্রামের নজির উদ্দিনের ফসলী জমি থেকে জোর করে পার্শ্ববর্তী সড়কে মাটি তুলতে যান যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাইফুল আলম। এ সময় তাকে বাধা দেন একই গ্রামের নজির উদ্দিন, তার চাচাতো ভাই মানিক মিয়া ও ভাতিজা ১০ম শ্রেণির ছাত্র সুমেল মিয়া। তখন দ’ুপক্ষের মধ্যে তূমুল ঝগড়া শুরু হয়। এক পর্যায়ে যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাইফুল আলম ও তার পক্ষের লোকজন প্রতিপক্ষের লোকজনের উপর আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করেন। এসময় গুলিতে ১০ম শ্রেণীর ছাত্র সুমেল আহমদ শুকুরের শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলি লাগে। গুলিবিদ্ধ হন সুমেলের বাবা, চাচাসহ আরো কয়েকজন। গুরুতর আহত অবস্থায় সুমেলকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর সুমেলের চাচা ইব্রাহিম আলী সিজিল বাদী হয়ে ২৭ জনের নামে বিশ্বনাথ থানায় হত্যা মামলা (নাম্বার ৪, তারিখ ০৩/০৫/২১ইং) দায়ের করেন। বিশ্বনাথ থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) রমাপ্রসাদ চক্রবর্তী দীর্ঘ তদন্ত শেষে ৩২ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন। মামলায় ২৩ জন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করেন। গত ১৩ জুলাই মামলাটির যুক্তিতর্ক শেষে ৩০ জুলাই রায় ঘোষণার দিন ধার্য করা হয়। ওইদিন আদালত ৩০ আসামীকে কারাগারে প্রেরণ করেন। মামলার ৩২ আসামীর মধ্যে এজাহার নামীয় আসামী মামুনুর রশীদ পলাতক রয়েছে এবং প্রধান আসামী সাইফুল আলম প্রায় পৌনে ৪ বছর ধরে কারাগারে রয়েছে।
এদিকে, মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বাদী ইব্রাহিম আলী সিজিল। তিনি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানিয়ে বলেন, এই রায় যেন দ্রুত কার্যকর করা হয়।




