বিয়ানীবাজারে দুপুরের আনন্দ-উল্লাস সন্ধ্যায় নামে বিষাদে
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৫ আগস্ট ২০২৫, ৩:১১:৪৩ অপরাহ্ন
বিয়ানীবাজার (সিলেট) থেকে সংবাদদাতা: জুলাই পেরিয়ে আগস্ট। আন্দোলন-সংঘর্ষ ও রাজনৈতিক পালাবদলে তখন উত্তাল দেশ। তীব্র আন্দোলনের মুখে দাঁড়িয়ে পতন হয়েছে তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের। ৫ আগস্ট দুপুরে তীব্র জল্পনা শুরু হয়, সেনাপ্রধানের কথায় স্পষ্ট হয় শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং দেশত্যাগের কথা। তারপরেই দেশের ছাত্র-জনতা ফেটে পড়ে খুশিতে-উচ্ছ্বাসে। ক্যালেন্ডারের হিসেবে দিন তখন আগস্ট ৫ হলেও সেই দিনটাকে সামাজিক মাধ্যমে লেখা হতে থাকে, ‘স্বাধীনতার দিন। ৩৬ জুলাই।’
২০২৪ সালের সমগ্র জুলাইজুড়ে চলেছে আন্দোলন, যার ব্যাপ্তি ৫ আগস্ট পর্যন্ত গড়িয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে ইতি ঘটে। এ আন্দোলনের মাঝে উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে প্রাণ গিয়েছে বহু শিক্ষার্থীর। সেই আন্দোলন কি শুধুই রাজধানী ঢাকাজুড়ে ছিল? নাহ, সারাদেশে আন্দোলন পাল্লা দিয়ে চলছিল। বাদ যায়নি দুটি পাতার একটি কুঁড়ির দেশ, সিলেটও। বিভিন্ন জেলা-উপজেলার ছাত্র-জনতা বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনের সাথে একাত্মতা পোষণ করে বিভাগীয় শহরে ঘোষিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে ছিল বেশ সক্রিয়।
যদিওবা অনেক জেলা-উপজেলায় আন্দোলনের কোন কর্মসূচি পালিত না হলেও বিজয়োল্লাসের ছোঁয়া লেগেছিল জেলা-উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায়।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের কোন কর্মসূচি পালিত হয়নি সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায়। গত বছরের আজকের এই দিনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিয়ানীবাজার পৌরশহরে শহীদ হয়েছিলেন তিন যুবক। ছাত্র- জনতার এই আন্দোলনে সাংবাদিক আবু তাহের মোহাম্মদ তুরাবসহ শহীদ হয়েছিলেন সর্বমোট ৫জন।
সারাদেশে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার খবরে মুহুর্মুহু আনন্দ মিছিলে পুরো শহর ছিলো ছাত্র-জনতার দখলে। ছাত্র-জনতার পাশাপাশি একে একে আনন্দ মিছিলে যোগ দেন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও। এসময় বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতার ক্ষোভের রোষানলে পড়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের অফিস। তবে বিকাল হতেই পালটে যায় দৃশ্যপট, বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতার মিছিলের পর একদল দুর্বৃত্ত বিয়ানীবাজার থানা ও উপজেলা চত্বরে হামলা চালায়। এসময় থানার ভেতর থেকে গুলি করা হলে থানার বাইরে থেকে রায়হান আহমদ ও ময়নুল ইসলামের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তীতে ওইদিনই মধ্যরাতে থানার অভ্যন্তরে তারেক আহমদের গুলিবিদ্ধ মরদেহ পাওয়া যায়। দুপুর থেকে শুরু আনন্দ-উল্লাস যেন সন্ধ্যা গড়াতেই বিষাদে পরিণত হয়। তিনজন নিহতের খবরে বিজয় সুখেও নেমে আসে শোকের আবহ। এ তিন হত্যার ঘটনায় পরবর্তীতে মামলা দায়ের হলেও এখনো মামলাগুলো দেখেনি আলোর মুখ, এনিয়ে শহীদ পরিবারগুলোতে রয়েছে উদ্বেগ, ক্ষোভআর হতাশা।
শহীদ রায়হানের ভাই সিয়াম আহমদ জানান, ভাই হারানো এক বছরেও মামলার নেই কোনো অগ্রগতি। আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্তসাপেক্ষে আমার ভাই হত্যাকারীদের শাস্তি। পরিবর্তিত বাংলাদেশে এক বছরেও বিচারের অগ্রগতি না হওয়ায় আমাদের পরিবারের সবার মধ্যেই রয়েছে হতাশা।
বিয়ানীবাজার থানার অভ্যন্তরে উদ্ধার হওয়া শহীদ তারেকের স্ত্রী ছামিয়া আক্তার বলেন, সিআইডিতে যাওয়ার পরও এখনো মামলার অগ্রগতি হয়নি, এনিয়ে আমাদের হতাশা রয়েছে। আমার স্বামীকে নিয়ে আমি অনেক গর্ব করি। আমার স্বামী দেশের জন্য শহীদ হয়েছেন। আমার ছেলে বড় হলে তার বাবার সম্পর্কে গর্ব করে যেনো সবাইকে বলতে পারবে এটাই প্রত্যাশা।
এই তিনজন ছাড়াও বিয়ানীবাজার উপজেলায় আরও দুইজন শহীদ হয়েছিলেন জুলাই আন্দোলনে।
জুলাই আন্দোলন চলাকালীন ১৮ জুলাই পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় দৈনিক নয়া দিগন্তের ব্যুরো প্রধান ও সিলেটের দৈনিক জালালাবাদের স্টাফ রিপোর্টার আবু তাহের মোহাম্মদ তুরাব পুলিশের গুলিতে শহীদ হন। এছাড়া ঢাকার নারায়ণগঞ্জে বসবাসরত বিয়ানীবাজার উপজেলার চারখাই ইউনিয়নের কাকুরা গ্রামের সোহেল আহমদ নামের আরেকজন মারা যান।




