সাদাপাথর লুট ঠেকাতে প্রশাসন কি ব্যর্থ?
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১২ আগস্ট ২০২৫, ৩:১৭:৫৩ অপরাহ্ন
লবীব আহমদ :
দিনদুপুরে অবাধে লুটপাটের কারণে বিলীনের পথে সিলেটের সাদাপাথর। একসময় রাতের আধাঁরে মাঝেমধ্যে চুরি হলেও এখন দিনদুপুরে চলছে পাথর লুট। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিদিন লুট হচ্ছে কয়েক কোটি টাকার পাথর। প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়ে বালু-পাথর লুট করে নিয়ে গেলেও তাদের যেন কিছু করার নেই।
তারা বলছেন, প্রশাসনের ব্যর্থতা আর প্রকাশ্য মদদে এই লুটপাট হচ্ছে। সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্রের কাছাকাছি তিনটি বিজিবি ক্যাম্প ও একটি থানা থাকলেও লুট ঠেকাতে কি ভূমিকা রাখতে পারছে না? পরিবেশবাদীসহ সংশ্লিষ্ট অনেকের মন্তব্য, সাদাপাথর লুট ঠেকাতে প্রশাসন কি ব্যর্থ?
স্থানীয়রা জানান, গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই শুরু হয় এই লুটপাট। পরে স্থানীয় লোকজন ও সেনাবাহিনীর কারণে সাময়িক বন্ধ হলেও সুযোগ বুঝে চলে এই লুটপাট। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসন লোক দেখানো অভিযান চালালেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এক সপ্তাহ লুটপাট হলে অভিযান হয় একদিন আর ওই দিন সহ বাকি ৬ দিনই চলে এই লুটপাট। যেখানে পাথর কেনাবেচা হয় এবং যেদিক দিয়ে গাড়িতে করে পাথর যায়, সেদিকে অভিযান না হওয়াতে এই লুটপাট বন্ধ হচ্ছে না বলে দাবি করছেন এলাকাবাসী। আর এই কারণে এখন বিলীনের পথে রয়েছে সাদাপাথর।
সরেজমিনে সাদাপাথরে গিয়ে দেখা যায়, সাদাপাথরের প্রধান স্পটে পর্যটকরা এসে সাঁতার কাটছেন আর তাদের পাশেই বারকি ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা দিয়ে চলছে অবাধে পাথর লুট। যে যে রকম পারছে, সেরকম করে পাথর লুট করে নৌকায় তুলছে আর নিয়ে যাচ্ছে। প্রায় কয়েক শতাধিক নৌকা করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এই পাথর। যেন এটি তাদের বহন করার জন্য বৈধ কোনো জিনিস।
সেখানে আসা মামুন নামে এক পর্যটক জানান, আমি প্রতিবছরই সাদাপাথর ঘুরতে আসি। আজকে এসে যা দেখছি, মনে হচ্ছে না আর আসতে পারবো বলে।
সাদাপাথরে গিয়ে কথা হয় বেশ কয়েকজন শ্রমিকের সাথে। তখন তারা জানান, সেখানে প্রতিদিন প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার শ্রমিক পাথর নিতে আসেন। যাদের পাঁচ ভাগের এক ভাগ স্থানীয় লোক আর বাকিরা বহিরাগত। যারা ধলাই নদী তীরবর্তী এলাকায় ভাড়ায় থেকে প্রতিদিন নৌকা নিয়ে এসে পাথর লুট করেন। কাউসার নামের এক শ্রমিক জানান, ‘আমরা ২ জন প্রতিদিন প্রায় ৩ থেকে ৪ ট্রিপ(৪টি ছোট নৌকা বোঝাই পাথর) দেই। প্রতি ট্রিপে ২৫০০ টাকা থেকে ২৬০০ টাকা পাওয়া যায়। আগে বাংকার থেকে যখন পাথর নিতাম, তখন নৌকা প্রতি সাড়ে ৩ হাজার টাকা পেতাম। আর তখন বিজিবিকে নৌকাপ্রতি ৩০০ টাকা দিতে হতো। এখন কাউকে দিতে হয় না।
তবে স্থানীয় কিছু নেশাখোর সকালে আসে টাকা নেওয়ার জন্য। জোর করে অনেকের কাছ থেকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা নেয়। এখান থেকে এখন বেশি পাথর যাওয়ায় দাম কম পড়ছে। গত ৪/৫ মাস থেকেই এখানে পাথর উত্তোলন করি। তেমন কোনো সমস্যা হয় না। আগে বিজিবিকে নৌকাপ্রতি ৩০০ টাকা করে দিলে বাংকারে কেউ ডিস্টার্ব (সমস্যা) করতো না। এখন মাঝেমধ্যে বিজিবি ও পুলিশ এসে দৌঁড়ায়। এখানে ৪/৫ হাজার মানুষ। কতজনকে দৌঁড়াবে। আমরা তো আমাদের পরিবারকে চালাতে এখানে আসছি।’
আরেক শ্রমিক মধ্যবয়সী সুমন মিয়া জানান, ‘সাদাপাথরে এক নৌকা পাথর তুলতে ১ ঘণ্টা লাগে। আর ভরতে ১০ মিনিট লাগে। পরে আমরা সেগুলো নৌকা করে ধলাই নদীর দুইপাশে নিয়েই বিক্রি করতে পারি। সেখানে প্রতি নৌকায় আড়াই, তিন হাজার টাকা পাওয়া যায়। বাংকারে কম মানুষ কাজ করার কারণে আমরা পাথর বিক্রি করে ভালো টাকা পেতাম। এখন সেটা কমে গেছে। এখন তেমন অভিযান হয় না, মাঝেমধ্যে বিজিবি এসে দৌঁড়ায়। আমরা ৪ জন একসাথে কাজ করি। এলাকা থেকে রোজ ৬০০ টাকায় বারকি নৌকা পাওয়া যায়। সেটা দিয়েই আমরা পাথর উত্তোলনের কাজ করি। তবে আমাদের ছেলেমেয়েরা খেলেও এই সাদাপাথর শেষ হবে না।’
অন্যদিকে, ধলাই নদীর দুই ধারে প্রতিদিন সাদাপাথর ও বাংকার থেকে নৌকা করে আসা পাথর বিক্রি হয়। ধলাই নদীর পূর্বপাড়ের কালাইরাগ, দয়ার বাজার ও কালীবাড়ি এরিয়ায় এবং পশ্চিম পাড়ে দশ নম্বর ঘাট, ব্যাটারি ঘাট, দশ নম্বর নৌকা ঘাট ও আশপাশে বিক্রি হয় এই সাদাপাথর। এখানে নদীর ধারে পাথর কিনে পরে সেটা অন্যত্র বিক্রি করা হয়।
জানা যায়, স্থানীয় ও বহিরাগত যারা ব্যবসায়ী আছেন, তারা নৌকা থেকে পাথর কিনেন। কোয়ারি চালু থাকলে যেখানে বেশি দামে পাথর কিনতে হতো, সেখানে এখন কমদামেই পাথর কেনা যায়। আর নদী থেকে পাথর উত্তোলনে আইনি ঝুঁকি থাকলেও নৌকা থেকে পাথর কিনে বিক্রিতে কোনো আইনি ঝুঁকি নেই। যার কারণে পাথর কিনে ইচ্ছেমতো মজুত করে রাখা যায় এবং সারাদেশে পরিবহনের মাধ্যমে বিক্রিও করা যায়।
অপরদিকে, সাদাপাথর নৌকা থেকে কিনে সেটা নিজের নির্দিষ্ট জায়গায় রাখেন ব্যবসায়ীরা। পরে সেটা ট্রাকের মাধ্যমে সারাদেশে যায়। তবে বেশিরভাগই প্রথমে ধোপাগোল যায়। সেখান থেকে দেশের বিভিন্নপ্রান্তে পাথর যায়। আবার কোম্পানীগঞ্জ থেকে সরাসরি ট্রাকে পাথর ঢাকার কাঁচপুরে ও গাবতলীতে যায়। এই পাথর ভোলাগঞ্জ থেকে সড়কপথে নিতে হলে উপজেলার ভোলাগঞ্জ, টুকেরবাজার হয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সামনে দিয়ে যেতে হয়। যেখানে উপজেলা পরিষদের গেইটের অল্প বামে বা এম সাইফুর রহমান ডিগ্রি কলেজের সামনে পুলিশ চেকপোস্ট থাকে। সেটার সামনে দিয়েই এমনকি পুলিশের সামনে দিয়েই যায় এই সাদাপাথর।
সাদাপাথরের কাছাকাছি ৩টি বিজিবির ক্যাম্প রয়েছে। কিন্তু কালাসাদেক বিওপির অস্থায়ী ক্যাম্প (সাদাপাথর নৌকা ঘাট) ও কালাইরাগ হাজির ঘাঁট পয়েন্টে তাদের চোখের সামনে দিয়ে অবাধে সাদাপাথর লুটপাট চলছে। এমনকি পাথর কোয়ারি বিওপির সামনাসামনিও এসব লুটপাট অব্যাহত রয়েছে। যখন নদীতে বেশি নৌকা দিয়ে পাথর যায়, আর এলাকার মানুষজন বেশি এটি নিয়ে কথা বলেন, তখন প্রশাসন যায় নদীতে অভিযানে। অভিযানে গিয়ে কয়েকটি কাঠের নৌকা ভেঙে পাথরখেকোদের তাড়িয়ে দিয়ে যায়। পরে ৪/৫ মিনিটের মধ্যে আবার যেইসেই লুটপাট চলে। দিনে বারকি নৌকা ও ইঞ্জিচালিত নৌকা দিয়ে পাথর লুটপাট হলেও রাত হলেই শুরু হয় বড় বড় নৌকা ও স্টিল বডি দিয়ে পাথর লুট। এসব নৌকা যদি কখনো রাতের আঁধারে পাথর নিতে গিয়ে ধলাই সেতুতে একটি ধাক্কা দেয়, তাহলে সেটি ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিমত।
এসব অভিযোগের বিষয়ে কালাসাদেক বিওপির ক্যাম্প কমান্ডারকে ফোন দিলে তিনি ‘এসব ফাও কথা বাদ দেন’ বলেই কল কেটে দেন।
যে কারণে পাথর লুটপাট বন্ধ হয় না:
সাদাপাথর লুট ঠেকাতে প্রশাসনের স্থায়ী কোনো ভূমিকা না থাকার কারণে লুটপাট বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিমত স্থানীয়দের। স্থানীয় বাসিন্দা অ্যাডভোকেট ফরহাদ খন্দকার বলেন, ‘সাদাপাথর লুটপাট করে কয়েক হাজার মানুষ। সাদাপাথর রক্ষায় প্রশাসন নিষ্ক্রিয়। সেখানে প্রশাসন ১৫ দিনে, ২০ দিনে একবার অভিযান দেয়। অভিযান দিয়ে তারা হাইলাইট করে যে আমরা অভিযান দিলাম। একবার অভিযান দিয়ে আরেকবার দিতে গিয়ে দেখা যায় তারা বিভিন্ন বাহিনীর সাথে সমন্বয় করতে করতেই আরো ১৫ দিন চলে যায়। আর এই ১৫ দিনে ধরেন ১৫ কোটি টাকার পাথর লুট হয়ে যায়। প্রশাসনকেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ’
স্থানীয় অন্য বাসিন্দারা জানান, প্রশাসন শুধু নদীতে অভিযান দেয়। যারা পাথর ক্রয় করে মজুত করে রাখে বা অন্যত্র বিক্রি করে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযান হয় না। যার কারণে সাদাপাথর কেনাবেচা চলতেই থাকে।
গতকাল সোমবার বিকেলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আজিজুন্নাহার বলেন, ‘আমরা ডিসি অফিসে কথা বলছি, আমরা খুব দ্রুত হয়তো বা এই সপ্তাহের মধ্যে আশা করছি আবার ক্রাশারগুলোতে অভিযান চালাব। আগের বার আমরা অনেকটা শক্ত অভিযানে ছিলাম। পরবর্তীতে পরিবহন শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। এরপর থেকেই এই লুটপাট হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সোমবারও তারা সাদাপাথরে সাড়ে ৪ ঘণ্টা অভিযান চালিয়েছেন। গত মঙ্গলবার থেকে সোমবার পর্যন্ত মোট ৪ দফা অভিযান চালানো হয়েছে। লুটপাট কেন বন্ধ হচ্ছে না এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মোবাইল কোর্ট তো ২৪ ঘণ্টা চালানো যায় না। তাই বন্ধ করা যাচ্ছে না পাথর চুরি। তবে, তারা এ ব্যাপারে সতর্ক আছেন।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সিলেটের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা আখতার বলেন, ‘প্রশাসনকে আমি সাদাপাথর রক্ষার্থে ব্যর্থ বলবো না। ব্যর্থ তারা তখনই হতো, যখন চেষ্টা করতো। সাদাপাথর রক্ষার্থে তো তারা কখনো কোনো চেষ্টাই করেনি। প্রশাসনের উদাসীনতাই সাদাপাথরের জন্য কাল হয়েছে। অথচ একবছর আগেও সাদাপাথরে কেউ হাত দেওয়ার সাহস পায়নি।’
পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেটের পরিচালক মো. ফেরদৌস আনোয়ার জানান, ‘আসলে সাদাপাথর ইসিএ-ভুক্ত এলাকা না হওয়ায় আমরা সেখানে গিয়ে কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারছি না। তবুও আমরা স্থানীয় প্রশাসনকে অভিযানে সহযোগিতা করছি।’
সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ জানান, ‘সাদাপাথর রক্ষার্থে আমরাতো নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। কিন্তু কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না।’আগে এটি রক্ষা করতে পারলেও এখন কেন পারছেন না প্রশ্ন করলে একই উত্তর দেন যে, ‘আমরা নিয়মিত অভিযান দিচ্ছি।’ সাদাপাথরে গতকাল জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান চালিয়েছেন বলে জানান তিনি।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পর্যটন) ফাতেমা রহিম বীনার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি তথ্য অধিকারে আবেদন করে তার বক্তব্য নিতে বলেন।




