হরিলুটে বিরানভূমি ‘সাদাপাথর’
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৩ আগস্ট ২০২৫, ১২:৫৭:৫২ অপরাহ্ন
আবিদুর রহমান, কোম্পানীগঞ্জ থেকে : সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে রোপওয়ে বাঙ্কার ও শাহ আরফিন টিলার পর এবার হরিলুট করে সাদাপাথর পর্যটন স্পটের সর্বনাশ করা হয়েছে। ফলে দেশের অন্যতম পর্যটন স্পটটি এখন বিরানভূমিতে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, সাদা পাথর এলাকা উন্মুক্ত। যত্রতত্র খোঁড়াখুঁড়ি করে চলছে পাথর লুট। হাজারো নৌকা নোঙর করে পাথর নিয়ে যাওয়ার হিড়িক পড়েছে। ছোট নৌকার লোডিং ক্যাপাসিটি কম, তাই কেউ কেউ এনেছে বড় নৌকা। লুটপাটে দফায় দফায় সাদা পাথর এলাকার চিত্র বদলে যাচ্ছে। পাথর লুটের এই মহা উৎসবে লুটেরা চক্র নির্বিঘ্ন। আর প্রশাসন নির্বিকার, উদাসীন। রাজনৈতিক দলগুলো আম জনতার মতোই নিরব দর্শকের ভূমিকায়।
জানা গেছে, গত বছরের ৫ আগস্ট থেকেই সাদা পাথর, রোপওয়ে বাঙ্কার ও শাহ আরেফিন টিলায় এই হরিলুট শুরু হয়। মাঝখানে কিছুদিন সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিলো। কিন্তু সেনাবাহিনী চলে যাওয়ার পর থেকে ফের শুরু হয় লুটপাট।
সর্বশেষ শুক্রবার (৮ আগস্ট) সকাল থেকে সাদা পাথর এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ফাঁড়ি এলাকা মাড়িয়ে জিরো পয়েন্ট দিয়ে পাথর লুট হয়। সরেজমিনে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহে সাদা পাথর এলাকায় কয়েক দফা পাহাড়ি ঢল নামে। ফলে সহজেই নৌকা ওঠে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত। প্রথমে দৃশ্যমান পাথরগুলো সরানো হয়েছে। পরে বালুর স্তর সরিয়ে পাথর লুটপাট হয়েছে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, দুই সপ্তাহে অন্তত শতকোটি টাকার পাথর লুট হয়েছে।

অবাধে পাথর নেয়ার কারণে পর্যটন এলাকার চেহারা এখন বিবর্ণ :
স্থানীয়রা জানান, কোম্পানীগঞ্জের ঐতিহাসিক স্থাপনা রোপওয়ে বাঙ্কার ও সাদা পাথর পর্যটন স্পটের পাথর গণলুট করার দায় নিশ্চয়ই সরকারের। এখানে সরকারের দিক থেকে নির্লিপ্ততা আছে, অবহেলা আছে। কিন্তু এসব রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকাও ছিলো রহস্যজনক ও প্রশ্নবিদ্ধ। হরিলুট বন্ধের ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের মধ্যে একধরনের ‘অসম্মত অবস্থান’ দেখা গেছে। ফলে এর দায় রাজনৈতিক নেতারা এড়াতে পারেন না।
পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সেবায় কাজ করছে ‘সাদা পাথর ফটোগ্রাফি সোসাইটি’ এবং ‘সাদা পাথর ফটোগ্রাফি ক্লাব’। ক্লাব দুটির সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, পাথর লুট গত বুধবার শেষ হয়েছে। এরপর থেকে আশপাশের এলাকা এমনকি সীমান্ত অতিক্রম করে পাথর লুট চলছে। এখন যন্ত্র দিয়ে বালু ও মাটি সরিয়ে পাথর লুট হচ্ছে। এতে করে পর্যটকদের জন্য সাদা পাথর এলাকা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। চোরাবালির সৃষ্টি হওয়ায় এলাকাটি মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
সাদাপাথর যাওয়ার ঘাট হিসেবে পরিচিত ধলাই নদতীরের ভোলাগঞ্জের ১০ নম্বর এলাকা। সেখানকার স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, পাহাড়ি ঢল নেমে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় পর্যটকরা সাদা পাথরে যাচ্ছেন না। এই সুযোগে চলছে লুটপাট। গত এক সপ্তাহে দিন ও রাতে হাজারখানেক বারকি নৌকা ব্যবহার করে পাথর লুট হয়েছে। অনেকটা মব স্টাইলে হওয়ায় ভয়ে পুলিশ প্রশাসনও ছিল সাক্ষী-গোপালের ভূমিকায়।
সার্বিক পরিস্থিতিতে সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া পুলিশের পক্ষে একা কিছু করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উজায়ের আল মাহমুদ আদনান। তিনি বলেন, ‘সাদা পাথর লুটের ঘটনার খবর পেলেই ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে স্পেশাল টাস্কফোর্সের টিম অভিযান চালায়। আমরা পুলিশ দিয়ে সহযোগিতা করছি। এর বাইরে কী আর করার আছে।’
হরিলুটের পর সাদাপাথর দেখতে আসা পর্যটকদের কন্ঠেও প্রকাশ পেয়েছে ক্ষোভ। মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকার মিরপুর থেকে সাদা পাথর ঘুরতে আসেন পর্যটক আহসান হাবিব রানা (৫০)। তিনি বলেন, এখানে বছরে তিন-চারবার আসা হয়। পরিবার এবং বন্ধুমহলকে নিয়ে আসা হয়েছে। এবার সমন্ধিকের পরিবারের সাথে এসেছি। যতবার আসি স্পটের কিছু পরিবর্তন দেখতে পাই। এবার দেখছি স্তূপাকারে থাকা বড় বড় পাথরসব উধাও হয়ে গেছে। ফলে জায়গাটির সৌন্দর্য কমে গেছে।

আগের পাথর দেখতে না পেয়ে ক্ষোভ ঝেড়েছেন :
কুমিল্লা থেকে আসা নারী পর্যটক নুরুন্নাহার (৩৮)। এজন্য তিনি সরাসরি দুষলেন সরকারকে। তিনি বলেন, প্রথমবার ২০২২ সালে পরিবারসহ এসেছিলেন। অসাধারণ ভিউ ছিলো জায়গাটার৷ কিন্তু এবার তার ছিটেফোঁটা নেই। থাকবেই বা কেমনে! দেশে কোনো সরকার থাকলে তো!
গণলুটের কারণে সাদাপাথরে পর্যটক আসা কমে যাওয়ায় বেচা বিক্রি কমে গেছে বলে জানান কসমেটিকস দোকানি নবী হোসেন। তিনি বলেন, আমার বাড়ি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পাড়ুয়া নোয়াগাঁওয়ে। ‘তিন বছর হয় সাদাপাথরে কসমেটিকস এর দোকান দিয়েছি। আগে দৈনিক ১০ হাজার টাকার বেচাবিক্রি হত। এখন তিন থেকে চার হাজার টাকা হয়। গত এক সপ্তাহ ধরে বিক্রি কমেছে। সাদাপাথরে দোকানের সংখ্যাও কমে গেছে। স্পটে আড়াইশোর মতো দোকান ছিল। এখন বিশটির মতো আছে।’
সাদাপাথরে আসা পর্যটকদের ঘোড়ায় চড়িয়ে উপার্জন করেন হাসান মিয়া। তার দেয়া তথ্য মতে, ‘এখানে আগে পঁচিশটি ঘোড়া ছিলো। এখন ছয়-সাতটি আছে। একেকজন দৈনিক পনেরো শ টাকা ইনকাম করতে পারতেন। এখন পাঁচশো টাকা ইনকাম করতে কষ্ট হয়।’
প্রসঙ্গত, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উজানে বিশাল বিস্তৃর্ণ এক নদ ধলাই। ওপারে ভারতের মেঘালয়। মাঝখানে নো ম্যানস্ ল্যান্ড। উজানের হঠাৎ ঢল এখানে বয়ে আনে পাথর। ঢল ফুরোলে নদীতল ছেয়ে থাকে অগুনতি পাথরে। সূত্র বলছে, এক সময় এই পাথরই ছিল কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মানুষের জীবিকা নির্বাহের মুল উৎস। সরকারি সিদ্ধান্তে পাথর উত্তোলন বন্ধ আছে প্রায় পাঁচ-সাত বছর ধরে। এতে কর্মসংস্থান হারান লক্ষাধিক মানুষ। এমন প্রেক্ষাপটে এখানে গড়ে ওঠে পর্যটন স্পট। পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎসমুখের সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়। এর সৌন্দর্য ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশের পর্যটকদের কাছে। সাদা রঙের পাথরের ওপর দিয়ে স্বচ্ছ জলের স্রোতের অপরূপ সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে পর্যটকরাই এর নাম দেন ‘সাদাপাথর’।
স্থানীয়রা জানান, তিন দশক আগেও অবহেলিত জনপদ ছিল কোম্পানীগঞ্জ। ধলাইর এই বালু-পাথরে সমৃদ্ধ হয়েছে এই জনপদ। নিম্ন সোপান ভূমির নদীতলে জমে থাকা প্লাইস্টোমিন ও হলোসিন যুগের এসব পাথর গঠন বিচারে কঠিন, সুগঠিত এবং উচ্চ মান সম্পন্ন। ছোট-বড় নানা মাপের, নানা রঙের এসব আগ্নেয় এবং রূপান্তরিত শিলায় তৈরি। উন্নয়নশীল বাংলাদেশের অবকাঠামো নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে ধলাই নদীর এই পাথর।




