মন্তব্য প্রতিবেদন
সাদাপাথরের পর লুটেরাদের নজর কি চা বাগান ও বনভূমির উপর?
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ৩১ আগস্ট ২০২৫, ৭:২৬:০২ অপরাহ্ন
নজরুল ইসলাম বাসন, লন্ডন থেকে : সারাবিশ্বের বাংলাদেশীরা অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করেছেন সিলেট অঞ্চলে পাথর লুটের এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। এই পাথর লুট ও বালু লুট অব্যাহত থাকতো, যদি কিছু সাহসী মিডিয়া কর্মী মাঠে না নামতো। মিডিয়ায় এই পাথরকান্ড আসার পর অন্তবর্তীকালীন সরকারের টনক নড়ে। উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান দুঃখ করে বলেন, পাথর লুট ঠেকাতে পারলাম না! তার এই আক্ষেপ সম্ভবত উপরি মহলে পৌঁছেছিল, যার পরিপ্রেক্ষিতে বদলি হন ডিসি, ইউএনও এবং পুলিশের কর্মকর্তা। ডিসি সাহেব হন ওএসডি। দুদকও একটি তালিকা করে। গ্রেফতার হন কিছু তলদেশের নেতৃবৃন্দ। জেলা প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেয়া হয়। নতুন জেলা প্রশাসক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয় জাদরেল ডেপুটি সচিব সারওয়ার আলমকে। তাঁকে কোন পরিস্থিতিতে কেন তাকে এই গুরুদায়িত্ব দেয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট মহল তা ইতোমধ্যে জেনে যাওয়ার কথা।
লন্ডন থেকে সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে যতটুকু জেনেছি, র্যাবের ম্যাজিস্ট্রেট বলে সুপরিচিত সিলেটের বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম যোগ দেয়ার পরদিনই সাদাপাথর এলাকায় গেছেন পাথর লুন্ঠন কান্ড দেখতে। তিনি বলেছেন ‘আর যদি একটি পাথর সরানো হয়, তাহলে একেবারে ঝালাপালা করে দেবো।’ তিনি আরো একটি কথা বলেছেন, আমি সিলেটকে সুন্দর করতে চাই, এয়ারপোর্ট থেকে শহর পর্যন্ত গাছ লাগাতে চাই।
আমরা জেলা প্রশাসকের কথা বিশ্বাস করতে চাই। তার প্রতি আস্থা রাখতে চাই। অতীতে সিলেটে দুয়েকজন ডিসিকে আমরা দেখেছি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে তারা দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এর মধ্যে একজন মরহুম ডিসি ফয়েজ উল্লা। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময় তিনি সিলেটের ডিসি হিসাবে দায়িত্ব নেন। সিলেট শহরের ফুটপাত, জিন্দাবাজারের ওভারসিজ সেন্টার তার হাতে গড়া। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে পেছনে শক্তি ছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট তিনি উন্নয়ন কাজ করে গেছেন। তার জিয়াউর রহমান। বর্তমান জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলমের যা করার এখনই করতে হবে, মরহুম জেলা প্রশাসক ফয়েজ উল্লা যা করার শহীদ করেছিলেন। ১৯৭৭ থেকে ৭৮ পর্যন্ত। প্রেসিডেন্ট জিয়ার আমলেই দুর্নীতিগ্রস্ত একটি সিস্টেমে একজন ডিসির পক্ষে কাজ করা প্রায় অসম্ভব।
তারপরেও সিলেটের নবাগত জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম আশার বাণী শোনাচ্ছেন। এয়ারপোর্ট থেকে শহর পর্যন্ত গাছ লাগানোর কথা তিনি বলেছেন- তার এই উদ্যেগের সূত্র ধরে বলতে চাই আমি লন্ডন যাওয়ার আগে সিলেটে জাফলং চা বাগান এবং ছড়াগাঙ চা বাগানে সহকারী ম্যানেজার হিসাবে চাকুরি করেছি। আমার অনেক স্মৃতি ও আবেগ রয়েছে চা বাগানগুলোকে ঘিরে। যখন সিলেটে সাদাপাথর লুট হচ্ছিলো, তখনই আমার মনে হয়েছে যারা বালু পাথর লুট করছে, তাদের হাতে অরক্ষিত চা বাগান বনভূমি ও রক্ষা পাবে না। আমি এ কথা কেন বলছি, ওয়াকিবহাল মহলের জানা আছে। ইতোমধ্যে নীরবে চা বাগানগুলো অপ্রত্যক্ষভাবে বেহাত হচ্ছে। এ ব্যাপারে লিখতে গেলে নেতিবাচক অনেক কিছু লিখতে হবে। তাই সেদিকে না গিয়ে আমরা সাদাপাথর রক্ষার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে চা বাগান সংরক্ষণের জন্যে সরকার, টি বোর্ড ও জেলা প্রশাসনকে পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করতে পারি। চা বাগানের সাবেক একজন ম্যানেজার ও চা শিল্পের সাথে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত প্ল্যান্টার জনাব জাভেদ তালহাকে এ ব্যাপারে তার অভিমত তুলে ধরার জন্যে অনুরোধ করেছিলাম। তিনি তার একটি নীতিপত্র আমার কাছে পাঠিয়েছেন, নীচে তার সুপারিশ সম্বলিত নীতিপত্র হুবুহু তুলে ধরলাম।
নীতিপত্র: বাংলাদেশের চা শিল্পের পুনরুজ্জীবন, টেকসই উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির রূপরেখা নির্বাহী সারাংশ বাংলাদেশের ১৫০ বছরেরও বেশি পুরনো চা শিল্প অর্থনীতি ও সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত, যেখানেলক্ষাধিক মানুষ কর্মরত এবং যা রপ্তানিতেও অবদান রাখে। গত ৫৫ বছরে উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নকে হুমকির মুখে ফেলছে কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা। বারবার মালিকানা পরিবর্তন (ইস্পাহানি, এম, আহমেদ ও ডানকান ছাড়া), বাজারমূল্যের অসামঞ্জস্য যেখানে উৎপাদকরা প্রতি কাপ থেকে মাত্র ৬০৭০ পয়সা পান, এবং শ্রম ব্যয় (মোট খরচের ৬০৬৫%) শিল্পকে অস্থিতিশীল করছে। বাস্তবসম্মত জাতীয় চা নীতি, পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও বহুমুখীকরণ ছাড়া এই শিল্প আরও অবনতির ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখা, ন্যায্য মুনাফা নিশ্চিত করা এবং পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিকল্প ফসলের মাধ্যমে
আয়ে উৎস বাড়াতে এই নীতিপত্রে সংস্কারের প্রস্তাব দেওয়া হলো।
প্রধান চ্যালেঞ্জ মালিকানা অস্থিতিশীলতা: অধিকাংশ বাগান বারবার লিজ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে, যা স্বল্পমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি ও দায়বদ্ধতা কমিয়েছে।
১ মূল্য শৃঙ্খলের বৈষম্য উৎপাদকরা বাজার মূল্যের অল্প অংশ পান; মধ্যস্বত্বভোগী ও খুচরা বিক্রেতারা অধিকাংশ মুনাফা নিয়ে যায়। ২ উচ্চ শ্রম ব্যয় মজুরি ও কল্যাণে ৬০৬৫% খরচ হওয়ায় আর্থিক টেকসইতা হুমকির মুখে। ৩ দুর্বল আধুনিকায়ন। চাষাবাদ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনে পুরোনো পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীলতা। ৪ নীতিগত ঘাটতি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় চা নীতি নেই; বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের দ্বন্দ্ব। ৫ বহুমুখীকরণের অভাব: শুধুমাত্র চায়ের ওপর নির্ভরতা, যা দাম ওঠানামা ও জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকি বাড়ায়।
নীতি সুপারিশ: ১. জাতীয় চা নীতি প্রণয়ন, ২উৎপাদনশীলতা, টেকসই উন্নয়ন ও প্রতিযোগিতা মাথায় রেখে বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন। ৩. চা-কে কৌশলগত কৃষি সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। ৪ প্রতিবেশী চা উৎপাদনকারী দেশের সেরা অনুশীলন থেকে শিক্ষা গ্রহণ। প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক সংস্কার: ৩ টি বোর্ডে অভিজ্ঞ পেশাজীবী ও আমলাদের সমন্বয় করে পুনর্গঠন। ৪. এনটিসির ব্যবস্থাপনায় পেশাদার নিয়োগ (হেডহান্টিংয়ের মাধ্যমে)। ৫ শিল্প নিয়ন্ত্রণ কৃষি মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তর অথবা শক্তিশালী আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা। ৬. ন্যায্য মূল্য বণ্টন ও বিপণন, ৭. শ্রীমঙ্গলে একটি চা বিপণন ও বিজনেস সেন্টার স্থাপন। ৮. ভ্যালু-অ্যাডেড পণ্য: ব্র্যান্ডেড চা, বিশেষ চা, ভেষজ ও রেডি-টু-ড্রিংক পানীয়। ৯. নিলাম পদ্ধতির সংস্কার করে উৎপাদকদের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা। ১০. ‘বাংলাদেশ টি’ ব্র্যান্ডের অধীনে সরাসরি রপ্তানি চ্যানেল তৈরি। ১১. শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ, ১২. শ্রীমঙ্গলে একটি চা প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন। ১৩. সিলেট অঞ্চলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে গবেষণা, বিপণন ও উদ্যোক্তা কর্মসূচিতে অংশীদারিত্ব। ১৪. শ্রমিক কল্যাণ ও কমিউনিটি উন্নয়নে এনজিওদের সাথে সহযোগিতা। ১৫. বহুমুখীকরণ ও টেকসইতা, ১৬. বাগানের ভেতর সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু করে খরচ কমানো ও আয় বৃদ্ধি। ১৭. চা পর্যটন, ইকো-রিসোর্ট, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এলাকা ও সংরক্ষণ প্রকল্প গড়ে তোলা। ১৯. অনাবাদি জমিতে ফলমূল, কফি ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের ফসল চাষ উৎসাহিত করা। ২০ চা বাগানের স্বকীয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ।
এ ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া প্রবাসি সাবেক উপসচিব বিনিয়োগ বোর্ড কর্মকর্তা ড. ইমদাদুল হক আমাকে একটি মেসেজ দিয়েছেন, তার কিছু অংশ এখানে তুলে ধরছি:
“চা শিল্পকে বাঁচাতে হলে একটি massive/comprehensive plan, competitive idea ও প্রচুর ভর্তুকি (subsidz) দরকার। সরকার পাটকে বাঁচানোর জন্য আলাদা পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয় করেছে। আমার মতে চা-কে বাঁচানোর জন্য একে পাটের সঙ্গে যুক্ত করে অবিলম্বে একত্রিত চা ও পাট মন্ত্রণালয় তৈরী করা উচিত। জেনে আশ্চর্য হবেন যে, পাকিস্তান আমলে নতুন অনেকগুলো চাবাগান তৈরি করা হয়েছিল। বাংলাদেশ আমলে উল্টা ধ্বংস হয়েছে। পাকিস্তান আমলের চারটি প্রধান পণ্য তুলা, চা, পাট ও গম নিয়ে জাতীয় প্রতীক (emblem) তৈরী করা হয়েছিল। পাকিস্তান সরকার এখনও তাদের জাতীয় প্রতীক এভাবেই রেখেছে। কিন্তু আমরা অতি পন্ডিত বাঙালীরা এসবের ধারে কাছেও নেই। কয়েকজন সচেতন tea-planter ও high-ranking সিলেটী কিছু কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি delegation তৈরী করে পাট মন্ত্রী ও সচিবের সংগে অবিলম্বে দেখা করা প্রয়োজন।”
উপরোক্ত সুপারিশমালার আলোকে সরকারকে পাট মন্ত্রণালয়, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, কৃষি ও বাণিজ্য মন্ত্রনালয়, টি বোর্ড ও জেলা প্রশাসন চা শিল্পের সাথে অভিজ্ঞ ব্যাক্তিবর্গ নিয়ে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ বা টাস্ক ফোর্স গঠন করে কনসালটেশনের মাধ্যমে চা শিল্প রক্ষার জন্যে চা এর জন্যে একটি রাষ্ট্রীয় নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারেন। যেহেতু চা বাগানের ভূমির মালিক রাষ্ট্র, তাই চা শ্রমিকদের কর্মসংস্থানে ও মুনাফায় অংশীদারিত্ব এখানে নিশ্চিত করতে হবে। এখানে সরকারকে ভারতের টাটা কোম্পানির উদাহরণ অনুসরণ করার অনুরোধ করতে পারি। তারা চা শ্রমিককে অংশীদারিত্ব প্রদান করে চা বাগানকে লোকসানের হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে।
লেখক: অতিথি সম্পাদক, দৈনিক সিলেটের ডাক।




