পাউবোর পাঁচ’শ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পে পিডির নেতৃত্বে দুর্নীতি
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:৫৮:০৬ অপরাহ্ন
কাউসার চৌধুরী : সুনামগঞ্জে হাওরের ফসল রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ‘বন্যা ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন, জরুরি সহায়তা প্রকল্পে’ লুটপাট ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। খোদ প্রকল্প পরিচালক (পিডি) প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম এই মেগা প্রকল্পে দুর্নীতির নেতৃত্ব দেন। পিডিসহ পাউবোর কতিপয় কর্মকর্তা-ঠিকাদাররা হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল অর্থ। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার পরপরই পিডি শফিকুল ইসলামসহ পাউবোর দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ থাকায় সুনামগঞ্জের এক নির্বাহী ■ প্রকৌশলী, দিরাই-শাল্লার এসওসহ পাঁচ কর্মকর্তাকে করা হয়েছে শাস্তিমূলক বদলি। পাউবো সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের চার মাসের মধ্যেই ভেঙ্গে গেছে। পাউবোর মহাপরিচালক মো. এনায়েত উল্লাহ জানিয়েছেন, এ ঘটনায় ইতোমধ্যে পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পিডিসহ দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রকল্পের ভারপ্রাপ্ত পিডি তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাইছার আলমও এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, তাকে প্রকল্পের ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
পাচশ’ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প:
জানা গেছে, সুনামগঞ্জ জেলার হাওরের ফসল রক্ষায় সরকার ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এডিবি’র যৌথ অর্থায়নে পাঁচ’শ কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। যা বাস্তবায়ন করছে পাউবো। “বন্যা ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন, জরুরি সহায়তা প্রকল্প” নামের এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, রেগুলেটর বা সুইসগেইট নির্মাণ, ডুবন্ত বাঁধ সিসি ব্ক দ্বারা সুরক্ষিত করা এবং ফ্লাড ফিউজ নির্মাণ। এডিবির বরাদ্দ থেকে পাঁচশ’ কোটি টাকার কার্যাদেশ দেওয়া হয়। এর মধ্যে কেবল হাওরের ১৯ কিলোমিটার দৈর্ঘের স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করতে ব্যয় হবে প্রায় ২৫৬ কোটি টাকা। পাউবোর সিলেটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শফিকুল ইসলামকে এই মেগা প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক বা পিডির দায়িত্ব দেওয়া হয়। গেল শুকনো মৌসুমে প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যক্রম শুরু হলে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি শুরু হয়।
সংবাদপত্রে দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হলে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়েগঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। সম্প্রতি তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে বেশ কিছু সুপারিশও করা হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। ৫ জনকে শাস্তিমূলক বদলি তদন্তে পিডি প্রকৌশলী শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে ৫ কর্মকর্তা দুর্নীতি করেছেন বলে তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত থাকায় গত ১ সেপ্টেম্বর সোমবার পিডি প্রকৌশলী শফিকুল ইসলামকে সিলেট থেকে পাউবোর ড্যাম ও ব্যারেজ শাখায় বদলি করা হয়েছে। তার স্থলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাইছার আলম এই প্রকল্পের পিডি এবং সিলেটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়। এর আগে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. শাহজাহানকে দিরাই থেকে পাউবোর কোয়ালিটি কন্ট্রোল এন্ড অ্যাসুরেন্স সেল (ওয়েস্ট রিজিয়ন), দিরাই পাউবোর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এটিএম মোনায়েম হোসেনকে পটুয়াখালীর পানি বিজ্ঞান শাখায় ও শাল্লার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রিপন আলীকে মুন্সীগঞ্জের ভাগ্যকুলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় পানি বিজ্ঞান পরিমাপ শাখায় বদলি করা হয়। সুনামগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদুল হকের বদলির আদেশ কয়েক দিনের মধ্যেই জারি করা হচ্ছে।
দু’জনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা:
সূত্র জানায়, দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় সিলেটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পিডি শফিকুল ইসলাম ও সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী এমদাদুল হকের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বিভাগীয় মামলা করেছে পাউবো। বিভাগীয় মামলায় দোষী সাব্যস্ত হলে লঘু শাস্তি ছাড়াও সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে চাকরিচ্যুতেরও বিধান রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চেয়ে প্রকৌশলী শফিকুল ইসলামের ব্যক্তিগত সেলফোনে একাধিকবার কল দেয়া হলে তিনি কল রিসিভ করেননি।
প্রকৌশলী-ঠিকাদার মিলে দুর্নীতি :
জানা গেছে, মেগা প্রকল্পে চলমান অবস্থায় গেল শুকনো মৌসুমে ৩৬ প্রকল্পে বাস্তব কাজের চেয়ে দ্বিগুণ কাজ দেখিয়ে দ্বিগুণ বিল পরিশোধ করা হয়। আর পিডিসহ কর্মকর্তারা এভাবেই ঠিকাদারদের নিয়ে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট করেন। প্রকৌশলী-ঠিকাদার মিলে কেমন দুর্নীতি করা হয়েছে তার একটা ধারণা পাওয়া যায় আজাদ চেয়ারম্যানের ঘটনায়। পাউবো কর্মকর্তারা আওয়ামী লীগ নেতা ও তাহিরপুরের ইউপি চেয়ারম্যান আজাদ হোসেনকে দিরাই ও শাল্লার কাজ দিতে দরপত্র প্রতিযোগিতায় গোপন সমঝোতা করেন। এই প্রকল্পের আওতায় দিরাই ও শাল্লা উপজেলায় ৪টি প্রকল্পে প্রায় ৮০ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন করছেন আজাদ হোসেন। দুর্নীতির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জনকারী আজাদ চেয়ারম্যান বাংলাদেশ স্থলবন্দর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক।
ডিএমপির ডিবির হাতে রাজধানী থেকে গ্রেফতার হয়ে আজাদ এখন শ্রীঘরে। পরিচয় গোপন রেখে মোটা অঙ্কের কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেয়া আজাদকে পুরোদস্তর সহযোগিতা করেন পাউবোর সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী ইমদাদুল হক। এ কাজের দরপত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নোনা ট্রেডার্স এককভাবে দুটিতে এবং নোনা ও আহাদ যৌথভাবে দুটি কাজে অংশ নেয়। এই চারটি প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৭৬ কোটি টাকা। এসব কাজে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র অংশগ্রহণ হয়নি। মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে একক দরদাতাকে সমঝোতার ভিত্তিতে দেওয়া হয় কার্যাদেশ। কাগজপত্রে নোনা ট্রেডার্স অংশ নিলেও কাজটি বাস্তবায়ন করছে আজাদ হোসেন। এই ফ্যাসিস্ট আজাদের হয়ে পুরো কাজ মনিটরিং করেন ভজন তালুকদার নামের আরেক আওয়ামী লীগ নেতা। এই আজাদ ঠিকাদার ভজন তালুকদারের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে অন্তত ৮০ কোটি টাকা পাঠিয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর থেকেই এই ভজন তালুকদার গা ঢাকা দিয়েছে। সুনামগঞ্জের কোথাও তার দেখা মিলছে না। তবে সূত্র বলছে, পাউবো থেকে অর্থ হাতিয়ে নিতে ভজন রাজধানী ঢাকায় নোনা ট্রেডার্সসহ বিভিন্ন দপ্তরে হন্য হয়ে ঘুরছে। এ বিষয়ে জানতে চেয়ে ভজন তালুকদারের সেলফোনে কয়েকদফা কল দেয়া হলে সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে দুর্নীতির চিত্র…
প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ উঠার পরে অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) ড. আ.ন.ম বজলুর রশীদকে প্রধান করে ৬ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, “হাওর রক্ষায় বন্যা ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন জরুরি সহায়তা প্রকল্পের (এফআরইএপি) আওতায় চলমান কাজের গুণগত মান শতভাগ নিশ্চিত করা হয়নি। ব্লক ঢালাইয়ের জন্য প্ল্যাটফর্ম যথাযথভাবে প্রস্তুত করা হয়নি। এ কারণে ব্লকের সৌন্দর্য মসৃণ হয়নি। প্রকল্পের সাইটে রক্ষিত পাথর দেখে তদন্ত কমিটির সদস্যরা ধারণা করেন-সেগুলো নিম্নমানের। বাঁধের পাশের গর্তগুলো ভরাট করা হয়নি। ফলে বর্ষায় বাঁধের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সাইট তদারকিতে কার্য সহকারী, উপসহকারী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালকের যথেষ্ট গাফিলতি পরিলক্ষিত হয়েছে। ঠিকাদারকে বিল দেওয়ার ক্ষেত্রেও উপসহকারী প্রকৌশলী, উপবিভাগীয় প্রকৌশলী, নির্বাহী প্রকৌশলী এবং প্রকল্প পরিচালক যথাযথভাবে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করেননি। বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন জায়গায় প্যাকেজ গ্রহণ করায় এবং পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় কাজের সাইট নিবিড়ভাবে তদারকি করা হচ্ছে না। প্রতিবেদনের শেষ পর্যায়ে বলা হয়, “শাল্লা ও দিরাই উপজেলায় তদন্ত কমিটি কর্তৃক পরিদর্শিত ৫টি প্যাকেজের সিসি ব্লকের অতিরিক্ত বিল দেওয়ায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে”।
নির্মাণের ৪ মাসেই বাঁধ ভেঙে গেছে। এদিকে, সরেজমিনে দেখা যায় দিরাই উপজেলার চাপতির হাওরের বৈশাখী বাঁধে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়। বাঁধের উপরিভাগসহ দু’প্রান্তে মাটির উপর কার্পেট বিছানার পরে এতে ব্লক দেয়ার কথা থাকলেও কেবল কালনী নদীর তীর অংশে বসানো হয়েছে মানহীন কার্পেট ও ব্লক। উপরিভাগ এবং চাপতির হাওর অংশে কোনো ব্লকের কাজই করা হয়নি। এবার পুরোদমে বর্ষা কিংবা হাওরে প্রবল ঢেউ না থাকলেও সড়ক থেকে ব্লকগুলো নদী আর হাওরে চলে যাচ্ছে। চাতল ব্লুইসগেইটের পাশের সড়ক এবার ভেঙে গেছে। তৈরি হয়েছে বিশাল খাল। স্থানীয় কৃষক রুবেল আহমদ জানান, প্রায় প্রতি বছর এই বাঁধ ভেঙে বৃহৎ চাপতির হাওরের ইরি বোরো ফসল তলিয়ে যায়। সেই বৈশাখীতে স্থায়ী বাঁধ দিয়ে আমাদের ফসল রক্ষার জন্যে সরকার এই পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও শুধুমাত্র পাউবোর দুর্নীতির কারনে স্থায়ী বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। প্রথমেই নদীর তীর কেটে দুর্বল করা হয়েছে বাঁধের ভিতও। অথচ আমরা প্রতিবাদ করলেও পাউবো কিংবা ঠিকাদার কেউ এতে কর্নপাত করেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাউবোর পওর-১ বিভাগে ৯ দশমিক ৪৫ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ ও ৮টি ফ্লাড ফিউজ নির্মাণে মোট ১২১ কোটি টাকা ব্যয় হবে। পণ্ডর-২ বিভাগে প্রায় ৮ দশমিক ৯৬ কিলোমিটার বাঁধ ও ৭টি ফ্লাড ফিউজ নির্মাণে ১৩৫ কোটি টাকা ব্যয় হবে।




