১০ মাসে ১১৩ জনের মৃত্যু, নিহতদের ৪০ ভাগের বয়স ১৮ বছরের নিচে
সিলেট অঞ্চলে মোটরসাইকেলে প্রাণহানি বাড়ছে যেসব কারণে
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ০৯ নভেম্বর ২০২৫, ৪:৪৯:২৬ অপরাহ্ন
মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম :
টিনএজার চালক, রেটিং প্রতিযোগিতা ও হেলমেট ব্যবহারে অনীহাসহ নানা কারণে সিলেট অঞ্চলে মোটর সাইকেলে প্রাণহানি বাড়ছে। এ বছরের ১০ মাসে এ অঞ্চলে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় ১১৩ জন চালক ও আরোহীর মৃত্যু হয়েছে। শতকরা ৪০ ভাগের বয়স ১৮ বছরে নিচে বলে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে।
সিলেট অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে ট্রাফিক পুলিশের দায়িত্ব পালনকারী, বর্তমানে মৌলভীবাজারের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর নিহার রঞ্জন সিংহ বলেন, প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের অধিকাংশ মোটর সাইকেলের চালক টিনএজার। বয়স হবার আগে তারা মোটর সাইকেল কিনে ফেলে। লার্ণার নেয়ার বয়স না হবার আগেই অনেক মা ছেলেদের আদর করে মোটরসাইকেল কিনে দেন। রয়েল এনফিল্ড, আর ওয়ান ফাইভের মতো মোটরসাইকেল মিলছে এ অঞ্চলে। রেটিং কম্পিটিশনের জন্য একটি রেটিং ক্লাবও রয়েছে। এদের অনেকেই সেইফটি ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করে না, হেলমেট ব্যবহারেও তাদের অনীহা। হিরোইজের জন্য অনেকে খুলে ফেলে লুকিং গ্লাস। লাইসেন্স না থাকলে মোটর সাইকেল রেজিস্ট্রেশনের বিধান থাকলেও অনেক শো রুম তা অনুসরণ করে না। রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যানারে অনেকে মোটরসাইকেলে শো ডাউন করে। উবারের নামেও অনেক উঠতি বয়সী চালক করছে ক্রাইম।
নগরীর টিলাগড় এলাকার একটি বেসরকারি স্কুলের সম্মুখে দেখা যায় প্রচুর মোটর সাইকেল। ছাত্ররা এসব মোটরসাইকেল ব্যবহার করে। অনেকের বয়স ১৮ বছরের নিচে। নিসচা সিলেট বিভাগীয় কমিটির সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মিশু জানান, এ বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলে মোট ২৯৭টি দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছে ৩০২ জনের। এর মধ্যে ১১৩ জনই মোটর সাইকেলের চালক ও আরোহী। দুর্ঘটনায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন পথচারীরা। মারা গেছেন ৬৬ জন। আর তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে সিএনজি অটোরিক্সা। এই সময়ে সড়কে আহত হয়েছেন ৭৪৫ জন। মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় নিহতদের ৪০ ভাগের বয়স ১৮ বছরের নিচে বলে জানান তিনি।
২০২৪ সালে এ বিভাগে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৭ জনের মৃত্যু হয়। ওই বছর এ বিভাগে দুর্ঘটনায় সবমিলিয়ে ৩৭৫ জনের মৃত্যু হয়। সিলেট বিভাগে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনা সম্পর্কে পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হওয়ায় প্রায় প্রতিটি ঘরে মোটর সাইকেল থাকে। প্রচুর অর্থ দিয়ে মোটর সাইকেল কিনলেও সামান্য টাকার হেলমেট কিনতে তাদের অনীহা। যার ফলে মোটর সাইকেল দুর্ঘটনা এ অঞ্চলে বেশি হচ্ছে। মোটরযান আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে কারও গাড়ি চালানোর অনুমতি নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একটি সূত্র জানায়, স্ট্যাটাস মেইনটেইনের জন্য সিলেটে অনেক কম বয়সী শিশু আরওয়ান ফাইভ এবং রয়েল এন ফিল্ডসহ দামী ব্র্যান্ডের মোটর সাইকেল কিনছে। মা-বাবার অজান্তে অনেক প্রবাসী স্বজন তাদেরকে মোটরসাইকেল কিনে দেন। ইংলিশ মিডিয়াম বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্মুখেও এসব মোটর সাইকেলের পসরা দেখা যায়। এদের অনেকে মোটরসাইকেলের লুকিং গ্লাস খুলে ফেলে এবং হেলমেট ব্যবহারেও তাদের অনীহা। রাস্তার লেনও তারা ফলো করে না।
সীমান্তবর্তী এলাকা (বর্ডার বেল্ট) হওয়ায় মোটর সাইকেল প্রাপ্তিও অনেকটা সহজলভ্য। সীমান্ত এলাকায় নম্বরপ্লেটবিহীন ৫ লাখ টাকার মোটর সাইকেল অনেকে এক থেকে দেড় লাখ টাকায় কিনে ফেলে।
মোটরসাইকেলেও যাত্রী পরিবহন করা হয় ৩ জন করে। সম্প্রতি সিলেট নগরীর দর্শনদেউড়ি এলাকা থেকে আরওয়ানফাইভ মোটরসাইকেলসহ এক যুবককে গ্রেফতার করে সিলেট মেট্রোপলিটন ডিবি পুলিশ। সিলেট নগরীর মোটর সাইকেল রাইডার আব্দুল আজিজ ওরফে উমেদ আহমদ মনে করেন, প্রফেশনাল মোটরসাইকেল রাইডাররা নিয়মিত হেলমেট ব্যবহার করলেও নন প্রফেশনাল মোটরসাইকেল রাইডারদের মধ্যে হেলমেট ব্যবহারের প্রবণতা কম। যে কারণে মোট দুর্ঘটনার শতকরা ১০ ভাগ প্রফেশনাল রাইডার এবং বাকি ৯০ ভাগ নন প্রফেশনাল রাইডাররা দুর্ঘটনার শিকার হন। রাইড শেয়ারিং যারা ব্যবহার করেন, তাদের বেশীরভাগ উচ্চ রক্তচাপ কিংবা চর্মরোগের অজুহাতে হেলমেট ব্যবহারে অনীহা প্রকাশ করেন।
মহাসড়কে নন রাইডাররা বেপরোয়া গতিতে মোটর সাইকেল ড্রাইভ করে। তারা অনেক সময় বাস কিংবা ট্রাকের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। ব্যালেন্স রাখতে না পারার কারণে মহাসড়কে বেশী দুর্ঘটনার শিকার হয় মোটরসাইকেল। রাস্তায় বেরোনোর আগে মোটরসাইকেলের ব্রেক, ক্লাস ও মবিল চেক করার পাশাপাশি গতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে দুর্ঘটনা অনেকাংশে রোধ করা যাবে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সহকারী পরিচালক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, সারাদেশে মোট যানবাহনের অর্ধেক হচ্ছে মোটর সাইকেল। তাদের অধিকাংশ প্রশিক্ষিত না। অনেকে হেলমেটও ব্যবহার করে না। মোটর সাইকেল চালকরা গাড়ির সামনে হঠাৎ করে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। কাজেই, মোটর সাইকেল কেনার সময় হেলমেট কেনার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করতে হবে। ভালো হেলমেট ব্যবহারের মাধ্যমে এটা প্রতিরোধ হতে পারে। ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের সময়ও বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) এর উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মাহফুজুর রহমান বলেন, সিলেট নগরীতে বর্তমানে ১০টি চেক পোস্টে মোটর সাইকেলের কাগজপত্র ও হেলমেট চেকিং করা হচ্ছে। যারা নিয়ম মানছে না তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হচ্ছে। এ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। হাইওয়ে পুলিশ, সিলেট রিজিওনের একটি সূত্র জানায়, মহাসড়কে স্টার্টিং পয়েন্টে তারা মোটরসাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। অনেকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। অনেকক্ষেত্রে হেলমেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদেরকে কাউন্সেলিং করা হয়। অপর এক প্রশ্নের জবাবে ওই সূত্র জানায়, মহাসড়কের মধ্যভাগে মোটরসাইকেল চালকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালালে তারা পুলিশের ধাওয়া খেয়ে অন্য যানবাহনের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। যে কারণে বিপদের ঝুঁকি থাকে বেশী। তিনি এ ব্যাপারে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে প্রচার-প্রচারণা চালানোর তাগিদ দেন।
এ ব্যাপারে পেট্রোল পাম্প মালিকদেরকেও সচেতন করার পরামর্শ তার। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) সিলেট-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আমির হোসেন জানান, মহাসড়কে অনেক সময় মোটর সাইকেল ট্রাকের নিচে ‘ব্লাইন্ড স্পটে’ ঢুকে পড়ে-যা মহাসড়কে মোটর সাইকেল চলাচলে বড় ঝুঁকি। সওজের প্রতিনিধি দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা চালান বলে জানান তিনি।
ট্রাফিক ইন্সপেক্টর নেহার রঞ্জন সিংহ জানান, মোটর সাইকেল দুর্ঘটনারোধে ড্রাইভিং লাইসেন্স চেকিংয়ের পাশাপাশি বাবা-মাকে সচেতন করতে হবে। বাবা-মা যাতে কম বয়সী ছেলেদের কোনভাবেই মোটরসাইকেল কিনে না দেন-সেই মোটিভেশন চালাতে হবে। সিলেট নগরীতে কারা মোটর সাইকেল চালাচ্ছে-তাদের জন্য একটি অ্যাপস ডেভেলপ করার তাগিদ দেন তিনি।




