নবনির্মিত ভবনে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল স্থানান্তরের পরিকল্পনা
বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ১২ নভেম্বর ২০২৫, ১:১৭:৩৪ অপরাহ্ন
নূর আহমদ :
আবু সিনা ছাত্রাবাস ভেঙে নির্মিত ২৫০ শয্যার সিলেট জেলা হাসপাতাল ভবনে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল স্থানান্তরের প্রস্তাব করেছে সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগ। মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এই প্রস্তাব পাস হলে শিগগিরই সেখানে হাসপাতালটির স্থানান্তর কার্যক্রম শুরু হবে। এখন প্রশ্ন উঠেছে- দীর্ঘদিন থেকে বাস্তবায়নের অপেক্ষাধীন সিলেট ১শ’ শয্যা বিশিষ্ট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ শিশু হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যার জেলা সদর হাসপাতাল প্রকল্পের কি হবে? ওই প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত না করে অন্য হাসপাতাল স্থানান্তর করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যার জেলা হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।
প্রায় ৮৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নগরীর চৌহাট্টায় শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের পাশে আগের আবুসিনা ছাত্রাবাসের স্থানে সিলেট জেলা হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। তবে আবুসিনা ছাত্রাবাস প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উল্লেখ করে হাসপাতাল নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন সিলেটের সংস্কৃতিকর্মীরা। এতে কাজ শুরু হতে কিছুটা বিলম্ব হয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ৬ দশমিক ৯৮ একর জায়গার ওপর হাসপাতাল নির্মাণকাজ উদ্বোধন করেন গণ আন্দোলনে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হাসপাতালটির অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্ব পায় পদ্মা অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে কাজ শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। নির্মাণ কাজ শেষ হয় ২০২৪ সালের শুরুর দিকে। গণপূর্ত অধিদপ্তর হাসপাতালের ভবন নির্মাণ করে বসে থাকলেও কার্যত হস্তান্তরের কর্তৃপক্ষ পাচ্ছে না।
অভিযোগ উঠেছে, ‘সাধারণত একজন তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করে হাসপাতালটি পরিচালনা বা তদারকি করার কথা। কিন্তু, এই হাসপাতাল নির্মাণে কোন তত্বাবধায়ক নিয়োগ করা হয়নি। আর এতেই সৃষ্টি হয় জটিলতা। এখন ভবন নির্মাণ হলেও হাসপাতালটির পরিচালনার দায়িত্ব নেয়ার কর্তৃপক্ষ পাওয়া যাচ্ছে না।
এই পরিস্থিতিতে সিলেটের নবাগত জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলম চলতি বছরের অক্টোবরে নতুন হাসপাতলটি চালুর ব্যাপারে উদ্যোগী হন। এর অংশ হিসেবে নগরীর চৌহাট্টায় শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালটি ২৫০ শয্যার সিলেট জেলা হাসপাতালের জন্য নবনির্মিত ভবনটিতে স্থানান্তরের প্রস্তাব করা হয়।
সূত্র জানায়, এর অংশ হিসেবে সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে এ বিষয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সিলেটের জেলা প্রশাসকও একাধিক অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। অন্য দিকে, সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, নির্মিত ভবনটির প্রতি মাসে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ বিল আসছে। দিন দিন এর পরিমাণ বাড়ছে। এ বিল পরিশোধ করার চাপ কমাতে গিয়েই শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালটি স্থানান্তরের চেষ্টা চলছে।
অপরদিকে, সিলেট বিভাগের পরিচালক (স্বাস্থ্য) এর কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালটি স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেটিকে ১শ’ শয্যা বিশিষ্ট বিশেষায়িত শহীদ শামছুদ্দিন আহমদ শিশু হাসপাতাল হিসেবে কার্যক্রম চালুর অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ২০১৭ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর (স্মারক নং ৪৫.০০.০০০০.১৫৫.১৮.০০৩.১৭-৮৮৪) এই স্মারকে উল্লেখ করা হয়, ২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি সিলেট সরকারি আলীয়া মাদ্রাসা মাঠে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী সিলেট সদরে অবস্থিত শহীদ শামছুদ্দিন আহমদ হাসপাতালকে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ শিশু হাসপাতাল হিসেবে কার্যত্রম চালুর প্রশাসনিক অনুমোদন প্রদান করা হলো।
কিন্তু এই অনুমোদনের প্রায় ৭ বছর হয়ে গেলেও এটি কার্যকর হয়নি। এছাড়া, চলমান হাসপাতালটি নবনির্মিত ২৫০ শয্যা হাসপাতালের ভবনে স্থানান্তর যদি হয়ে যায়, পুরাতন ভবনে ১০০ শয্যা বিশিষ্ট শিশু হাসপাতাল চালু হবে কিনা, এই বিষয়েও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসাপাতাল নতুন ভবনে কার্যক্রম শুরু করলে পুরাতন ভবনটি বেদখল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, ভেঙে ফেলা আবু সিনা ছাত্রাবাসটি ছিল শহীদ শামছুদ্দিন আহমদ হাসপাতালটির পুরনো ভবন। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা সেখানে উঠে বসবাস শুরু করে। একইভাবে বর্তমান শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালটি স্থানান্তর হলে রেখে যাওয়া ভবনে কর্মচারীদের একটি পক্ষ উঠে যাওয়ার অপচেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
অপরদিকে, ২৫০ শয্যার সিলেট জেলা হাসপাতালের জন্য নির্মিত ভবনটিতে সবধরনের অবকাঠামোগত সুবিধা বিদ্যমান। শুধু জনবল নিয়োগ হয়নি বলে কার্যক্রম শুরু হচ্ছে না।
দেখা গেছে, হাসপাতাল ভবনের বেজমেন্টে রয়েছে কার পার্কিং; প্রথম তলায় টিকিট কাউন্টার, ওয়েটিং রুম; দ্বিতীয় তলায় আউটডোর, রিপোর্ট ডেলিভারি ও কনসালট্যান্ট চেম্বার; তৃতীয় তলায় ডায়াগনস্টিক; চতুর্থ তলায় কার্ডিয়াক ও জেনারেল ওটি, আইসিসিইউ, সিসিইউ; পঞ্চম তলায় গাইনি বিভাগ, অপথালমোলজি, অর্র্থোপেডিক্স ও ইএনটি বিভাগ এবং ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম তলায় ওয়ার্ড ও কেবিন। সেই ভবনটিতেই বর্তমানে শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতাল স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
সিলেট বিভাগের পরিচালক (স্বাস্থ্য) এর কার্যালয় সূত্র আরো জানিয়েছে, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ নির্মাণ শাখা ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিচালক স্বাস্থ্য বিভাগ সিলেট, সিলেটের সিভিল সার্জন, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল স্থানান্তরের ব্যাপারে সমন্বয় সাধন পূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেয়া হয়। সেই আলোকেই হাসপাতালটি স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়।
অপরদিকে, সিলেট ১শ’ শয্যা বিশিষ্ট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ শিশু হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যার সিলেট জেলা সদর হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়নের কোন সুরাহা না করে শহীদ শামসুদ্দিন হাসাপাতালকে স্থানান্তর করাটা ঠিক হবে না বলে মনে করছেন সিলেটের বিশিষ্টজনেরা।
এ ব্যাপারে বিভাগীয় গণপূর্ত অফিস সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী আবু জাফরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ও শিশু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মো. জিয়াউর রহমান চৌধুরী বলেন, সিলেট একটি বিভাগীয় শহর। বিভাগের বৃহৎ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান ওসমানী হাসাপাতালে বিপুল সংখ্যক শিশু ভর্তি হন। ওই হাসপাতালে শিশু রোগীদের সংকুলান দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একই অবস্থা বেসরকারি হাসাপাতাল ক্লিনিকগুলোতেও। সেই পরিস্থিতিতে সিলেটে বিশেষায়িত হাসাপাতাল এর চাহিদা ব্যাপক। তিনি বলেন, দ্রুততম সময়ে সিলেট শিশু হাসাপাতাল এর কার্যক্রম শুরু করা জরুরি।
সিলেটের সিভিল সার্জন ডা: মো: নাসির উদ্দিন বলেন, ২০১৭ সালে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালকে শিশু হাসপাতাল হিসেবে পরিচালনার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নির্দেশনা দেয়। তবে জনবল বা চলবে কিভাবে এর বিস্তারিত আসেনি। বর্তমান হাসপাতাল এর ব্যাপারে কোন সুরাহা না হলে শিশু হাসপাতাল চালুর ব্যপারে পদক্ষেপ নেয়া যাচ্ছে না। শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল এর বিকল্প ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সিলেট জেলা সদর হাসপাতাল চালু হলে; পরে হয়তো একটা উপায় বের হবে।
সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এর সহকারী পরিচালক ডা: মো: বদরুল আমীন বলেন, শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল স্থানান্তরের বিষয়ে একটি কমিটি করে দেয়া হয়েছে। তারা এ নিয়ে কাজ করছে। ওই কমিটি হাসপাতাল চালুর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সাথে সমন্বয় করছে।
পরিচালক সিলেট বিভাগ (স্বাস্থ্য) ডা: মো: আনিসুর রহমান বলেন, একটি হাসপাতাল পরিচালনার জন্য সাধারণত একজন তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করে হাসপাতালটি পরিচালনা বা তদারকি করার কথা। সেটা করা হয়নি। এখনো নামমাত্র আমাদের সহকারী পরিচালককে সহতত্ত্বাবধায়ক করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে জনবল নিয়োগ বা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার ব্যপারে নির্দেশনা আসেনি।
তিনি বলেন, বিভাগীয় সমন্বয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল স্থানান্তরের একটি প্রস্তাবনা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি আমরা। কিন্তু, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ওসমানী হাসাপাতাল কর্তৃপক্ষেরও সায় থাকতে হবে। কার্যত এখনো বলা যাচ্ছে না- এই ২৫০ শয্যা হাসপাতাল বা শিশু হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়নের ভবিষ্যৎ কি?
সিলেটের জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলম বলেন, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট সিলেট জেলা সদর হাসপাতালটি দ্রুত সময়ে চালুর ব্যপারে আশাবাদী ছিলাম। কিন্তু, দিন দিন পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। নতুন ভবনে অনেক সুযোগ সুবিধা নেই । আবার দুটিকে একীভূত করার বিষয়টিও কঠিন কাজ। আমরা দুটি বিষয় মাথায় রেখে এগোচ্ছি।
১শ’ শয্যা বিশিষ্ট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ শিশু হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যার সিলেট জেলা সদর হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়নের ব্যাপারে জেলা প্রশাসক বলেন, ২৫০ শয্যার সিলেট জেলা সদর হাসপাতাল প্রকল্প আজ না হয় কাল হবে। তবে ১শ শয্যা বিশিষ্ট শহীদ শামসুদ্দিন শিশু হাসপাতাল প্রকল্পের বিষয়টি সম্পর্কে আমি খুব একটা অবহিত নই। ওটা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা ভালো বলতে পারবেন।




