চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অনলাইন থেকে ওষুধ সংগ্রহ, বাড়ছে জীবনের ঝুঁকি
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৮ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৩৮:০৮ অপরাহ্ন
আহমাদ সেলিম :
রোগের চিকিৎসকের সাথে কোনো পরামর্শ না করে ইন্টারনেট ঘেটে ওষুধ খাওয়ার দিকে আসক্ত হচ্ছেন এক শ্রেণির মানুষ। ফলে অনেকে নিরাময়ের বিপরীতে উল্টো জীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। দীর্ঘসময় ওষুধ সেবন করে অনেকে হৃদরোগ, মস্তিস্কে রক্তক্ষরণসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। অনলাইন থেকে ওষুধ খেয়ে সিলেটে একজনের মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে।
অসুখ-বিসুখের সময় মন শক্ত না করে অনেকে ভেঙ্গে পড়েন। সহজে পরিত্রাণের পথ খুঁজেন। একটা সময় হাতে থাকা মোবাইলের মাধ্যমে অনলাইনে আসক্ত হয়ে পড়েন। ফেইসবুক, ইউটিউব ঘেটে, ওষুধ বিক্রেতাদের চমৎকার এবং আকর্ষণীয় কথার ফাঁদে পা ফেলেন। একপর্যায়ে তারা অনলাইনের মাধ্যমে ওষুধও অর্ডার করে বসেন। চিকিৎসকের সাথে কোনো পরামর্শ না করে সেই ওষুধ দিব্যি, মাসের পর মাস খেয়ে যাচ্ছেন। এতে হিতে বিপরীত হচ্ছে। অনেকে সেইসব ওষুধ সেবন করে জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এমনকি দীর্ঘদিন ওষুধ সেবনের ফলে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবরও পাওয়া গেছে। আর এই ভুলটা নারীর চেয়ে পুরুষরাই বেশী করে থাকেন।
ইন্টারনেটের মাধ্যমে সংগৃহীত ভুল ওষুধ সেবন করার ভয়ানক পরিণতির শিকার মানুষ অহরহ হচ্ছেন। তবে সেই খবর সব সময় বাইরে আসে না।
তেমনি একজন রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে সিলেট নগরীর ২৭ নম্বর ওয়ার্ডে। তিনি বন্দরবাজারের একজন ব্যবসায়ী ছিলেন। তথ্য প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে ওই ব্যবসায়ীর ঘনিষ্ট একজন জানিয়েছেন, গত এক সপ্তাহ আগে তিনি মারা গেছেন। মারা যাবার আগে তার হার্টের বাইপাস হয়েছিলো। তিনি দীর্ঘদিন অনলাইনের মাধ্যমে ওষুধ ক্রয় করে সেবন করে আসছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি আবারো হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
এরকম আরো কয়েকটি পরিবারের সাথে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। যারা অনলাইনে ওষুধ সংগ্রহ করে নিয়মিত খেয়ে এখন শয্যাশায়ী। তবে অনলাইনে দেশের অনেক নামিদামি চিকিৎসকের পরামর্শের পেইজও রয়েছে। সত্যিকার অর্থে যারা মানুষকে সুপরামর্শ, সচেতন করার কাজটি করে থাকেন। তবে মানুষ সেদিকে না গিয়ে হাতুড়ি চিকিৎসকের আকর্ষণীয় কথায় নিজের জীবনে সর্বনাশ ডেকে আনছেন।
ইন্টারনেটে রোগের লক্ষণ দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া ও ওষুধ খেয়ে অনেকে মৃত্যুর সম্মুখিন হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের ফার্মাকোলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক সুকান্ত মজুমদার। তিনি বলেন, ‘টাইপ-১ ডায়াবেটিক হলে ইনসুলিন নিতেই হয়। এরকম আরো অনেক অসুখ আছে, যার জন্য নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। কিন্তু অনলাইনে একটি চক্র এসকল ওষুধ একেবারে নির্মূল করার ভাষণ দেয়। সেই মধুর মিথ্যে শুনে অনেকে আগ্রহী হয়। তাদের দেয়া ভেজাল, বিপদজনক ওষুধ সেবনে অনেকে অভ্যস্ত হয়। এই অবস্থা থেকে ফেরাতে পারে একমাত্র সচেতনতা।’
সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের সাথে কথা বলে জানা গেছে, প্রতারকরাই বেশী ইন্টারনেটের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। তারা মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছেন। যারা এসব করছেন, তাদের কেউ চিকিৎসক নন। এদের কেউ কেউ অনলাইনভিত্তিক ওষুধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।
সেই চক্রটি চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে গড়ে তুলেছে অনুমোদনহীন ওষুধের বাণিজ্য। ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াই অনলাইনে নামকরা কোম্পানি থেকে শুরু করে অখ্যাত কোম্পানির বিভিন্ন ধরনের যৌন উত্তেজক নিষিদ্ধ ট্যাবলেট, মেয়াদোত্তীর্ণ ও নিম্নমানের ওষুধসহ ভেজাল ওষুধের জমজমাট বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। অর্ডার করলেই সহজে পৌঁছে দিচ্ছে তারা।
সিলেট নগরীর শিবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা ইকবাল। অনলাইনে প্রতারক চক্রের ওষুধের বিভিন্ন ক্ষতিকারক দিক নিয়ে কথা হলে তিনি জানান, তার এক নিকটআত্মীয় কাউকে না বলে অনলাইন থেকে ওষুধ সংগ্রহ করে নিয়মিত খেয়ে আসছিলেন। বর্তমানে ঢাকার একটি হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় তিনি চিকিৎসা নিচ্ছেন।
সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা হয় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সিলেট জেলা কার্যালয়ের ঔষধ তত্তা¡বধায়ক মো. শামীম হোসেন এর সাথে। তিনি বলেন, এগুলো প্রতারণা। অনলাইনে ওষুধ বিক্রি করতে হলেও বৈধ লাইসেন্স করার নিয়ম রয়েছে, নীতিমালা রয়েছে। যারা নীতিমালা মানছে না, তাদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে।



