সিলেট বিভাগীয় ইমাম সম্মেলনে অধ্যাপক আলী রীয়াজ
ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী করতে হবে
সিলেটের ডাক প্রকাশিত হয়েছে : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:১২:০৮ অপরাহ্ন
স্টাফ রিপোর্টার : প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী করতে হবে। তিনি বলেন, এই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বহু মানুষের আত্মদানের বিনিময়ে, চৌদ্দশো মানুষের রক্তের উপর দিয়ে। এই শহীদদের কাছে সরকারের দায় আছে। ফলে এই সরকার নৈতিকভাবে চাইবে যাতে রাষ্ট্রের সংস্কার ঘটে এবং ভবিষ্যতে কেউ যেন স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে।
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) নগরীর বিভাগীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্স পাঠে ‘গণভোটে উদ্বুদ্ধকরণের লক্ষ্যে সিলেট বিভাগীয় ইমাম সম্মেলনে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবীর সভাপতিতে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কামাল উদ্দিন, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মো. মুশফেকুর রহমান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) কমিশনার আব্দুল কুদ্দুছ চৌধুরী পিপিএম ও সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক আলী রীয়াজ আরও বলেন, শুধুমাত্র এক ব্যক্তি ইচ্ছার কারণে বিগত ষোল বছর এদেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। এক ব্যক্তি একক ইচ্ছায় যখন যা খুশি করেছে, সংবিধানকে কাটাছেঁড়া করেছে, মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত অপরাধীদের ক্ষমা করে জেল থেকে ছেড়ে দিয়েছে। ষোল বছর ধরে এক ব্যক্তি দেশ শাসন করেছে। শুধু শাসন নয়- গুম, খুন, হত্যা, কী হয় নাই এই দেশে!
তিনি বলেন, সংবিধানে রাষ্ট্রপতির নামে কোনো দন্ডিত ব্যক্তিকে ক্ষমা করার বিধান থাকলেও প্রকৃতপক্ষে সেটা প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা অনুযায়ী হয়। বিদ্যমান সংবিধানে এমন ব্যবস্থা রাখা হয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী চাইলে আপনার-আমার ভোটাধিকার কেড়ে নিতে পারেন। এর প্রমাণ হচ্ছে এদেশে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার অধীনে অন্তত তিনটি সুষ্ঠ-অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছিল, আপনি-আমি ভোট দিতে পেরেছিলাম। কিন্তু একজন্য ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর একক ইচ্ছায় সেটা বাতিল হয়ে গিয়েছিল। বিশ্বাস করুন- একজনের ইচ্ছায় এদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হয়েছে। সংসদে কমিটি করা হয়েছিল। সেই কমিটিতে কেবলমাত্র আওয়ামী লীগের সদস্যরা ছিল। বিএনপি তখন সংসদে থাকলেও সেই কমিটিতে অংশগ্রহণ করে নাই। সেই কমিটি ১০৪ জন লোকের সাথে কথা বলে ২৫টা বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বহাল থাকবে। কিন্তু একটি মিটিং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে করার পর সেই সিদ্ধান্তটা বদলে গেল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হলো। তিনটা নির্বাচনের প্রহসন হলো। ফলে এই দেশে আমরা ভোট দিতে পারি নাই।
তিনি সমবেত ইমামদের প্রশ্ন করেন- আপনারা কি এই ব্যবস্থা রাখতে চান? ইমামরা সমস্বরে আওয়াজ দেন- না। তিনি বলেন, তাহলে আমাদেরকে অবশ্যই সংবিধানে এমন ব্যবস্থা করতে হবে যাতে প্রধানমন্ত্রীর একক ইচ্ছায় কোনো অবস্থাতেই যেন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব না হয়। সেজন্যই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নয় মাস ধরে আলাপ-আলোচনা করে এই ব্যবস্থা করা হয়েছে যে, এখন থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে, এবং সেই ব্যবস্থায় প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন- সংসদে ক্ষমতাসীন দল, প্রধান বিরোধী দল ও দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দল মিলে কমিটি করে আলোপ-আলোচনা করে সকলের মতের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য একজন প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করা হবে। যাতে এক ব্যক্তির ইচ্ছায় কোনো অবস্থাতেই আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল না হয়, কিংবা শুধু ক্ষমতাসীন দলে ইচ্ছায় যেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নির্ধারণ করা না হয়।

তিনি বলেন, দেশটা যে এক ব্যক্তির হাতে চলে গিয়েছিল, তার আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ এই তিনটি নির্বাচন নিয়ে তদন্ত করে দেখা গেছে- রাজনৈতিক দলগুলো নাম না দেওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নাম অনুযায়ী রকিব সাহেবকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অবস্থাটা বুঝুন, একজন ব্যক্তি ঠিক করছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে হবেন, যেই নির্বাচনে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। এটাকে উপহাস বললেও ছোট করে বলা হয়।
তিনি প্রশ্ন করেন- আপনারা কি সেই এককেন্দ্রীকরণ রাখতে চান? সমস্বরে ইমামরা আওয়াজ দেন- না। তিনি বলেন, না চাইলে সকলকে আমাদের বুঝাতে হবে যে, এই ব্যবস্থা আমাদের কত ভয়াবহ জায়গায় নিয়ে গিয়েছিল। ফলে ষোল বছর ধরে এক ব্যক্তি দেশ শাসন করেছেন। শুধু শাসন করেছেন, তাই না- গুম, খুন, হত্যা, কী হয় নাই এই দেশে! তার দলের একজন নেতা হানিফ সাহেব বলেলেন যে, শেখ হাসিনা মৃত্যুবরণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকবেন।
তিনি বলেন, গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হলে বাংলাদেশের সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে লেখা থাকবে- কোনো ব্যক্তি একজীবনে দশ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। সেটা আমরা যদি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে চাই, তাহলে অবশ্যই এই কথাকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার নিশ্চয়তা বিধান করতে হ্যাঁ ভোটকে বিজয়ী করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন- গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হলে নাকি সংবিধানে বিসমিল্লাহ এবং আল্লাহর উপর আস্থা থাকবে না! আসলে জুলাই সনদে এরকম কোনো কথা নেই। কেউ যদি এটা বলে, তাকে প্রশ্ন করুন জুলাই সনদের ৩৯ পৃষ্ঠার কোন জায়গায় এটা লেখা আছে?
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ড. সৈয়দ শাহ এমরান। বিশিষ্ট আবৃত্তিকার আমিনুল ইসলাম চৌধুরী লিটনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন জাতীয় ইমাম সমিতি সিলেট জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ এহসান উদ্দিন ও সিলেট মহানগর ইমাম সমিতির সভাপতি মাওলানা হাবিব আহমদ শিহাব।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, বিগত ৫৪ বছর ধরে আমরা ভুল ট্রেনে চলছি। চলতে চলতে কখনো সামরিক শাসন, কখনো স্বৈরশাসন এবং সর্বশেষ ভয়ংকর ফ্যাসিবাদী শাসন। এর সবগুলার কারণ হলো- সংবিধানকে ঠিকটাক বানানো হয়নি। সংবিধানে স্বৈরশাসন এবং ফ্যাসিবাদী শাসন- এগুলো নিয়ে আসার বন্দোবস্ত আছে। সেজন্য জুলাই অভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছেন, তারা জীবন দিয়েছেন এই সংবিধান ও ব্যবস্থা পাল্টানো জন্য। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের জন্য। জুলাই শহীদদের দিয়ে যাওয়া দায়িত্বের আলোকে অন্তর্বর্তী সরকার এই সংবিধান, এই রাষ্ট্রব্যবস্থা, এই আইনি কাঠামোকে সংশোধন করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন ও অনেকগুলো সংস্কার কমিশনের মাধ্যমে জ্ঞানীগুণীদের মতামতের ভিত্তিতে জুলাই সনদ তৈরি হয়েছে। এতে সকল রাজনৈতিক দলের নেতারা এক জায়গায় বসে স্বাক্ষর করে তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছেন। সবার স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এটাকে জাতির স্থায়ী দলিল ও ভবিষ্যতের পথরেখা হিসেবে তৈরি করেছেন। এটা বাস্তবায়ন করা গেলে বিগত ৫৪ বছর ধরে আমরা ভুল ট্রেনে চলছি, সেটা বের হওয়া সম্ভব হবে এবং ইনসাফ ও সাম্যের দেশ তৈরি হবে। মানুষের মর্যাদার দেশ তৈরি হবে। এটা বাস্তবায়ন করতে হবে গণভোটে হ্যাঁ জয়ী করার মাধ্যমে। না ভোটের অর্থ হলো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ খোলা রাখা।
সভাপতির বক্তব্যে সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার খান মো. রেজা-উন-নবী বলেন, ইতিহাসে আমরা দেখি চৌদ্দশো বছর আগে একটি আইয়ামে জাহেলিয়াত ছিল। আর চৌদ্দশো বছর পরে কিছুদিন আগেও একটা জাহেলিয়াত ছিল- যার নাম আওয়ামী জাহেলিয়াত। দুই জাহেলিয়াতের মধ্যে একটা মিল ছিল।
তিনি বলেন, ইসলাম এসে আইয়ামে জাহেলিয়াতকে দূর করেছিল। তাই যেখানে মুসলিম থাকবে সেখানে কোনো অন্ধকার থাকতে পারে না, যেখানে ইসলাম আছে সেখানে কোনো ফ্যাসিবাদ থাকতে পারে না। সেজন্য ঐক্যবদ্ধভাবে আল্লাহর রজ্জুকে আকড়ে ধরতে হবে, কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন হওয়া যাবে না। আল্লাহর রাসুল (সা.) যেভাবে আইয়ামে জাহেলিয়াতের অন্ধকারকে ছিন্ন করেছিলেন, আমরাও সেভাবে নব্য জাহেলিয়াতের সকল অন্ধকারকে গণভোটে হ্যাঁ’র মাধ্যমে ছিন্ন করে দিতে হবে। এখানে হ্যাঁ ভোট দিলে নব্য ফ্যাসিজম আর মাথা তুলতে পারবে না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কামাল উদ্দিন বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন আলেমওলামা ও ইমামরা। আগামী দিনে এই পথ বন্ধ করতে হলে গণভোটে হ্যা’র পক্ষে প্রচারণা চালাতে হবে।
সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মো. মুশফেকুর রহমান ইমামদের উদ্দেশ্যে বলেন, গণভোটে হ্যাঁ’র পক্ষে প্রচারণা চালালে যদি কোনো ইমামকে কেউ বাধা প্রদান করে, তাহলে সাথে সাথে নিজ নিজ জেলার পুলিশ সুপারকে অবহিত করবেন। মনে রাখবেন, ইমাম-মুয়াজ্জেনরা এদেশে ভেসে আসে নাই। তারা এই মাটির সন্তান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত করেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মউশিক প্রকল্প শিক্ষক ক্বারী মাওলানা শফিকুর রহমান। অনুষ্ঠানে সিলেট বিভাগের চার জেলার ইমাম ও খতিবরা অংশ নেন।




